ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

গ্রহের গান

গ্রহের গান
×

দীপেন ভট্টাচার্য

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

কেপলারের দুই হাজার বছর আগে গ্রিক গণিতবিদ ও দার্শনিক পিথাগোরাস বলেছিলেন, সংখ্যার অনুপাত থেকে শ্রুতিমধুর সুরের জন্ম এবং মহাবিশ্ব নিজেই এই আনুপাতিক গাণিতিক কম্পাঙ্ক অনুসরণ করে। তিনি বা তাঁর ছাত্ররা লক্ষ্য করেছিলেন, একটা টানা তারকে ঠিক অর্ধেক করলে যে সুর বের হয়, সেটা মূল সুরের চেয়ে একটা অকটেভ (অষ্টক : সা রে গা মা পা ধা নি সা) ওপরে– অর্থাৎ দ্বিগুণ কম্পাঙ্কে। সা যদি ২৪০ হার্টজে হয়, তবে পরের সা হবে ৪৮০ হার্টজে।
প্লেটো তাঁর Timaeus গ্রন্থে এই ধারণাকে দার্শনিক রূপ দিতে চাইলেন। সংগীতে সাতটি সুর, আকাশে চলমান বস্তুও সাতটি– পাঁচটি দৃশ্যমান গ্রহ, সূর্য ও চাঁদ। এই সমাপতন তাঁর কাছে কাকতালীয় মনে হয়নি। দুই হাজার বছর পরে কেপলার সেই প্লেটোনিক স্বপ্ন থেকে অনুপ্রেরণা নিলেন। তাঁর মনে হলো, গ্রহগুলোর গতির মধ্যেও লুকিয়ে আছে এক ধরনের সুর বা হারমোনি। তিনি প্রতিটি গ্রহের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গতিবেগের অনুপাত বের করলেন এবং সেগুলো সুরের ব্যবধানের সঙ্গে মেলাতে চাইলেন। ১৬০৯ সালে টাইকো ব্রাহের মৃত্যুর পর ব্রাহের বছরের পর বছরের পর্যবেক্ষণের তথ্য বিশ্লেষণ করে  কেপলার আবিষ্কার করেছিলেন যে গ্রহগুলো বৃত্তাকার নয়, উপবৃত্তাকার কক্ষপথে চলে এবং সূর্য সেই উপবৃত্তের একটি ফোকাসে অবস্থিত। এটাকে আমরা এখন কেপলারের প্রথম সূত্র বলি। মঙ্গলের কক্ষপথ বৃত্তাকার ধরে হিসাব করলে টাইকোর তথ্যের সঙ্গে আট আর্ক-মিনিটের ফাঁক থেকে যাচ্ছিল। তুলনা করার জন্য উল্লেখ করি পূর্ণচন্দ্রের কৌণিক ব্যাস হলো ত্রিশ আর্ক-মিনিট। ওই সময়ে আট আর্ক-মিনিট গলদ ধরার মতন পৃথিবীতে দুটো মানুষই ছিলেন– ব্রাহে আর কেপলার। কেপলার এটাকে ত্রুটি বলে ভাবলেন না, বরং বললেন মঙ্গলের কক্ষপথ যদি উপবৃত্তাকার হয় তবে টাইকোর তথ্যের সঙ্গে মিলে যায়। কেপলার টাইকো ব্রাহের দীর্ঘ ২০ বছরের মঙ্গল পর্যবেক্ষণের তথ্য হাতে পেয়েছিলেন। এই হাতে পাওয়াটা সহজ হয়নি। টাইকো ব্রাহে মঙ্গলের পর্যবেক্ষণ করেছিলেন মূলত ১৫৭৬ থেকে ১৫৯৭ সাল পর্যন্ত, ডেনমার্কের ভেন (Hven) দ্বীপের উরানিবর্গ মানমন্দির থেকে। শুধু মঙ্গল নয়, টাইকো সব গ্রহের এবং প্রায় ৭৭৭টি নক্ষত্রের অবস্থান রেকর্ড করেছিলেন। মঙ্গলের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা হলো মঙ্গলের কক্ষকাল ৬৮৭ দিন, তাই ২০ বছরে মঙ্গল তার কক্ষপথ প্রায় দশবারের বেশি সম্পূর্ণ করেছে– অর্থাৎ কক্ষপথের প্রতিটি অংশ বহুবার পর্যবেক্ষণে ছিল। টাইকোর এইসব পর্যবেক্ষণের ত্রুটি ছিল মাত্র এক বা দুই আর্কমিনিট। 
টাইকো ব্রাহে ১৬০১ সালে প্রাগে মারা যান– রুডলফের দরবারে। মৃত্যুর আগে কেপলারকে তাঁর সহকারী হিসেবে নিয়েছিলেন, মৃত্যুর মাত্র দেড় বছর আগে, ১৫৯৯ সালে। টাইকো চাননি এই তথ্য অন্যের হাতে যাক, তিনি চেয়েছিলেন নিজেই প্রকাশ করবেন। কিন্তু হঠাৎ মৃত্যুতে সব তথ্য কেপলারের হাতে এলো। এই তথ্য পাওয়া নিয়ে ব্রাহের পরিবারের সঙ্গে কেপলারের আইনি বিরোধও হয়েছিল। পরে একটা সমঝোতার ভিত্তিতে কেপলারের হাতে সেই পর্যবেক্ষণের তথ্য এলো। টাইকোর ২০ বছরের পরিশ্রম আর কেপলারের পাঁচ বছরের গণনা মিলে তৈরি হলো আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার ভিত্তি।
ফিরে যাই সেই সংগীতের কথায়। কেপলারের দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী, একটি গ্রহ যখন সূর্যের সবচেয়ে কাছে আসে, এই বিন্দুকে বলে অনুসূর। তখন সেটির গতিবেগ হয় সর্বোচ্চ। আর সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরে, অপসূর বিন্দুতে, গতিবেগ হয় সর্বনিম্ন। গ্রহটির কক্ষপথ যত বেশি উপবৃত্তাকার হবে, এই দুই গতিবেগের পার্থক্য তত বেশি হবে। বুধের কক্ষপথ সবচেয়ে বেশি উপবৃত্তাকার। তাই তার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গতিবেগের পার্থক্যও সবচেয়ে বেশি। কেপলার এই বিস্তৃত ব্যবধানটিকে একটি পূর্ণ অকটেভের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন– সংগীতে যেখানে একটি স্বরের কম্পাঙ্ক অন্যটির দ্বিগুণ। যদিও প্রকৃত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মান সেই নিখুঁত ২:১ অনুপাতের সঙ্গে মেলে না। তাঁর কাছে এই আনুমানিক মিলই ছিল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
শুক্রের ক্ষেত্রে ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। শুক্রের কক্ষপথ প্রায় নিখুঁত বৃত্তাকার– সৌরজগতের সব গ্রহের মধ্যে সবচেয়ে কম উপবৃত্তাকার। তাই তার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গতিবেগের পার্থক্য নগণ্য, অনুপাত প্রায় ১:১। কেপলার বললেন, শুক্র যেন একটাই সুর ধরে আছে, কোনো পরিবর্তন নেই– একটানা এক নোট। পৃথিবীর ক্ষেত্রে কেপলার তাঁর অনুসূর ও অপসূরের গতির ব্যবধানকে ১৬:১৫ অনুপাতের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন– সংগীতে যা একটি ক্ষুদ্র অর্ধস্বরের (semitone) ব্যবধান। বাস্তব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মান এই আদর্শ অনুপাতের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না; কিন্তু কেপলারের কাছে এই আনুমানিক সাদৃশ্যই ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কেপলার এখান থেকে একটা কাব্যিক সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন। পশ্চিমা সংগীতে mi আর fa– অর্থাৎ E আর F– এই দুটো সুরের মধ্যে ব্যবধান মাত্র একটা অর্ধস্বর। কেপলার বললেন, পৃথিবী তার কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে ঠিক এই দুটো সুরের মধ্যে দুলতে থাকে– কখনও mi, কখনও fa। এই mi আর fa থেকেই লাতিনে আসে miseria আর fames– দুঃখ আর ক্ষুধা। পৃথিবী চিরকাল এই দুটো সুরের মাঝখানে দুলছে। পৃথিবী তাই কষ্টের গ্রহ। এটা অবশ্য বিজ্ঞান নয়, কেপলারের ব্যক্তিগত দর্শন– কিন্তু দেখায় যে তিনি এই সংগীততত্ত্বকে কতটা গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন।
কেপলার দেখলেন শনি সূর্যের সবচেয়ে কাছে এলে যে গতিবেগ, আর সবচেয়ে দূরে গেলে যে গতিবেগ– এই দুটোর অনুপাত প্রায় ৫:৪ (বা ১.২৫)। গ্রহ সুর বাজাচ্ছে– এটা অবশ্য রূপক, কিন্তু অনুপাতের মিলটা কেপলারকে রোমাঞ্চিত করেছিল। এটার একটু ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। ধরা যাক সা-এর কম্পাঙ্ক ২৪০ হার্টজ। এর সঙ্গে আরেকটা সুর বাজালে সেটা শ্রুতিমধুর হবে কিনা তা নির্ভর করে দুটো কম্পাঙ্কের অনুপাতের ওপর। শুদ্ধ গান্ধারের অনুপাত হলো ৫:৪। আর ২৪০ × ৫/৪ = ৩০০ হার্টজ। এখন সা (২৪০) আর শুদ্ধ গান্ধার (৩০০) একসঙ্গে বাজালে শুনতে উজ্জ্বল, প্রফুল্ল লাগে। পশ্চিমে এটাকে বলা হয় major third। গান্ধার ভারতীয় সংগীতের তৃতীয় স্বর। যদি সা-কে পশ্চিমা C ধরা হয়, তবে গান্ধার প্রায় E-র সমতুল্য।
অন্যদিকে কোমল গান্ধারের অনুপাত হলো ৬:৫। ২৪০ × ৬/৫ = ২৮৮ হার্টজ। সা (২৪০) আর কোমল গান্ধার (২৮৮) একসঙ্গে বাজালে শুনতে ভারি, বিষণ্ন লাগে। পশ্চিমে এটি হলো minor third। এই অনুপাতগুলো কেপলারকে তার মহাবিশ্বের সংগীতের হারমোনিক্সের সঙ্গে মিলে গেছে বলে প্রফুল্ল করলেও, তিনি জানতেন যে, পর্যবেক্ষণ অনুপাতগুলো সমর্থন করে না। আসল সংখ্যাগুলো হলো, শনির জন্য ১.০৬ (১.২৫ নয়) আর বৃহস্পতির জন্য ১.০৭ (১.২০ নয়)। কাজেই মিলটা আনুমানিক, নিখুঁত নয়। কেপলারের কাছে এই আনুমানিক মিলটাই যথেষ্ট ছিল রোমাঞ্চিত হওয়ার জন্য। এখানে কেপলার গ্রহগুলোর অনুসূর ও অপসূর অবস্থায় গতিবেগের অনুপাতকে সংগীতের স্বরলিপিতে রূপ দিয়েছেন। বুধের বিস্তৃত সুর তার অধিক উপবৃত্তাকার কক্ষপথের ইঙ্গিত দেয়, শুক্র প্রায় এক নোটে স্থির আর পৃথিবীর mi-fa ব্যবধান তার কাব্যিক ‘দুঃখ ও ক্ষুধা’র রূপক। জ্যোতির্বিজ্ঞান এখানে সংখ্যার মাধ্যমে সংগীতে রূপান্তরিত হয়েছে– দুই হাজার বছরের পিথাগোরীয় স্বপ্নের এক বৈজ্ঞানিক পুনর্জন্ম। 
কেপলার যা আশা করছিলেন সেটার সঙ্গে বাস্তবের পুরোপুরি মিল হলো না, তাই বললেন, সৃষ্টিকর্তা সম্ভবত নিখুঁত সামঞ্জস্যের চেয়ে বৈচিত্র্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এটা ছিল একজন বিশ্বাসীর যুক্তি, বিজ্ঞানীর নয়। কিন্তু এই হিসাব করতে বসেই, এই সংখ্যাগুলো নিয়ে ঘাঁটতে ঘাঁটতে, তিনি লক্ষ্য করলেন একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন সম্পর্ক– গ্রহের কক্ষকালের বর্গ তার গড় দূরত্বের ঘনের সমানুপাতিক, অর্থাৎ সূর্যের চারদিকে ঘুরতে গ্রহের যত সময় লাগছে, সেটা থেকে সূর্য থেকে তার দূরত্ব বের করা সম্ভব। এটা তাঁর তৃতীয় সূত্র। সংগীতের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই, প্লেটোর দর্শনের সঙ্গেও নেই। কিন্তু এটাই পরে নিউটনের হাতে মহাকর্ষ সূত্রের ভিত্তি হয়ে উঠল। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এ রকম আরও উদাহরণ আছে– ভুল পথে হাঁটতে হাঁটতে নতুন গন্তব্য আবিষ্কার। কেপলারের ক্ষেত্রে বিশেষত্ব হলো, তিনি যে স্বপ্ন দেখছিলেন, সেটা দুই হাজার বছরের পুরোনো– প্লেটো আর পিথাগোরাসের উত্তরাধিকার। সেই পুরোনো স্বপ্নের জ্বালানিতেই চলল আধুনিক বিজ্ঞানের প্রথম ইঞ্জিন।
যুদ্ধ, মায়ের বিচার, ধর্মীয় নিপীড়ন– এসবের মধ্যে বসে গ্রহের সংগীত খুঁজছিলেন তিনি। সম্রাটের কাছে বছরের পর বছরের বকেয়া বেতন চাইতে গিয়ে ১৬৩০ সালে রেগেন্সবুর্গে পথেই মারা গেলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৮। তাই রুডলফের প্রাগে যে মানুষটি গ্রহের কক্ষপথ আবিষ্কার করেছিলেন, সেই মানুষটির শেষ জীবন ছিল যুদ্ধ, দারিদ্র্য আর নিরন্তর পলায়নের গল্প। 

আরও পড়ুন

×