ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

হেমিংওয়ে: দ্বিতীয় প্রেম ও প্রথম বিচ্ছেদ

হেমিংওয়ে: দ্বিতীয় প্রেম ও প্রথম বিচ্ছেদ
×

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে [২১ জুলাই ১৮৯৯–২ জুলাই ১৯৬১] ছবি :: কার্ট হাটন

ফারুক মঈনউদ্দীন

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমেরিকান লেখক, জীবনীকার ও গবেষক অ্যারন এডওয়ার্ড হচনার (১৯১৭-২০২০) আর্নেস্ট হেমিংওয়ের চাইতে বয়সে ১৮ বছরের ছোট হলেও তিনি পরিণত হয়েছিলেন তাঁর বন্ধুদের একজনে। ১৯৪৮ সালে হচনারকে হাভানায় পাঠানো হয়েছিল এক অদ্ভুত কাজে– হেমিংওয়ের কাছ থেকে ‘সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’ বিষয়ে একটা লেখা আদায় করা। হচনার তখন কাজ করতেন ‘কসমোপলিটান’ সাহিত্য পত্রিকায়। 
অবশ্য হচনার জানতেন কোনো লেখকই সাহিত্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরের দিন সকালে তিনি কী লিখবেন, তার চাইতে খুব বেশি কিছু জানেন না। তাই হচনার আশা করেননি হেমিংওয়ে তাঁকে কৃতার্থ করবেন। তাই কিউবার এক হোটেলে পৌঁছে হেমিংওয়েকে একটি চিঠি লিখে অনুরোধ করেন তিনি যেন তাঁকে সংক্ষিপ্ত প্রত্যাখ্যানপত্র পাঠান। কিন্তু তাঁকে অবাক করে দিয়ে হেমিংওয়ে তাঁকে ফোন করে হাভানায় তাঁর প্রিয় পানশালা ‘ফ্লোরিদিতা’-তে দেখা করেন। 
হেমিংওয়ের সঙ্গে এ রকম বিভিন্ন সময়ের আলাপচারিতার ভেতর থেকে বের করে এনেছিলেন বিশ্বখ্যাত এই লেখকের জীবনের বহু কাহিনি, সেসবের ওপর ভিত্তি করে মৃত্যুর দুই বছর আগে হচনার প্রকাশ করেন ‘হেমিংওয়ে ইন লাভ’ নামে এক বই। এসব আলাপচারিতায় হেমিংওয়ে নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হচনারের কাছে প্রকাশ করেছিলেন তাঁর বিবাহবহির্ভূত বিভিন্ন সম্পর্কের খুঁটিনাটি, যার একটি তাঁর প্রথম বিবাহজাত দাম্পত্য জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। তিনি প্রকাশ করেছিলেন প্যারিসে তাঁর প্রেমময় জীবনের বহু গোপন সত্য, জানিয়েছিলেন কীভাবে প্রথম স্ত্রী হ্যাডলিকে হারিয়েছিলেন তিনি। 
হেমিংওয়ে হচনারকে জানান যে প্যারিসের ডিঙ্গো বারে তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল পলিন এবং তাঁর বোন জিনি ফেইফারের। প্রথম দর্শনে পলিন সম্পর্কে নিজের মনোভাব হচনারকে অকপটে জানিয়েছিলেন হেমিংওয়ে। ছোটখাটো, চ্যাপ্টা বুক, বোনের মতো আকর্ষণীয়ও ছিলেন না তিনি। ভোগ ফ্যাশন ম্যাগাজিনে কাজ করতে সদ্য প্যারিসে এসেছিলেন পলিন। তাই তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল সবেমাত্র ফ্যাশন ম্যাগাজিনের পাতা থেকে বেরিয়ে এসেছেন যেন। হালফ্যাশনের কেতাদুরস্ত মেয়ে, সে সময়ের ফ্যাশন অনুযায়ী ছেলেদের মতো ছোট করে ছাঁটা চুল, ঝালর লাগানো সংক্ষিপ্ত উজ্জ্বল পোশাক, গলায় মুক্তার পেঁচানো মালা, ইমিটেশন গহনা, গালে রুজের লালিমা, উজ্জ্বল লাল ঠোঁট। এই পলিন ফেইফারের প্রেমে কিংবা প্রেমের ফাঁদে পড়ে প্রথম প্রেমিকা ও স্ত্রী হ্যাডলির সঙ্গে চরম প্রতারণা করেছিলেন আমেরিকান সাহিত্যের বরপুত্র আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। 
হচনারের কাছে হেমিংওয়ে প্রকাশ করেছেন, কীভাবে পলিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেড়ে গিয়েছিল তাঁর। রুয় মুফতাদের পুরোনো জীর্ণ হোটেলের পাঁচতলার ওপর যে ছোট ঘরটি ভাড়া করেছিলেন তিনি, সেখানে মাঝে মাঝে, পলিন বোন জিনিকে নিয়ে দিনের কাজ শেষে তাঁর কাছে আসতেন। ছোট্ট ঘরটিতে ছিল না হিটিং ব্যবস্থা, লিফট নেই, প্রায় কিছুই নেই। কাছের একটা ক্যাফেতে তাঁকে নিয়ে গিয়ে বসতেন ওরা দুই বোন। শেষ দিকে জিনি আর আসতেন না। পলিন একাই আসতেন। 
এভাবেই পলিনের সঙ্গে শুরু হয়েছিল হেমিংওয়ের গোপন অভিসার। অবশ্য কখনও হেমিংওয়েকে নিয়ে দূরে কোথাও বেড়াতে গেলে হ্যাডলি ও তাদের শিশুপুত্র বামবিকেও সঙ্গে নিয়ে যেতেন পলিন। বহু বছর পর হেমিংওয়ে যখন তাঁর প্যারিসের স্মৃতিকথা ‘অ্যা মুভেবল ফিস্ট’ লেখেন, সেখানে তিনি অকপটে স্বীকার করেছিলেন তাঁর প্রথম বিয়ে ভেঙে যাওয়ার সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁর নিজের। তিনি লিখেছিলেন, ‘বন্ধুর সঙ্গে প্রতারণা করা মেয়েটির পক্ষে জঘন্য একটা ব্যাপার, কিন্তু সেটা ছিল আমারই দোষ ও অন্ধ আবেগ, যা আটকায়নি আমাকে। ব্যাপারটার সঙ্গে জড়িয়ে এবং প্রেমে পড়ে সকল দায় নিজের ওপর গ্রহণ করেছিলাম আমি, বেঁচে ছিলাম অনুশোচনা নিয়ে। যত দিন পর্যন্ত না আমার স্ত্রী এমন একজনকে বিয়ে করে, যিনি আমার চেয়ে ভালো, যার মতো কখনোই ছিলাম না এবং কখনও হতেও পারব না এবং যতদিন না জেনেছি যে সে সুখী হয়েছে, ততদিন বিবেকের এই দংশন দিন-রাত্রির কখনোই ছেড়ে যায়নি আমাকে।’
হেমিংওয়ের দ্বিতীয় বই প্রকাশের আগে প্রকাশক নির্বাচনের জন্য নিউইয়র্কে যাওয়ার দরকার পড়েছিল তাঁর। তাঁর অস্থায়ী বসবাস তখন অস্ট্রিয়ার শ্যোন্সে। তাঁর জাহাজ নিউইয়র্ক রওনা হওয়ার আগের চারটি রাত পলিনের বিছানায় কাটিয়েছেন হেমিংওয়ে। নিউইয়র্ক থেকে ফেরার পথে আবার প্যারিসে পৌঁছে গাখ দে-লেস্ট স্টেশন থেকে প্রথম ট্রেন ধরেই অস্ট্রিয়া চলে যেতে পারতেন তিনি, যেখানে ১৯ দিন ধরে প্রতীক্ষারত তাঁর স্ত্রী হ্যাডলি। কিন্তু প্যারিসে পলিনের সঙ্গে উদ্দাম সময় কাটানোর জন্য পরপর তিনটি ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিলেন হেমিংওয়ে। পরে তাঁর বইতে সেই কয়েকটা দিনের কথা লিখেছিলেন তিনি। সেটা ছিল এক ‘অবিশ্বাস্য বিরহবেদনা, আনন্দের উত্তেজনা, স্বার্থপরতা, বিশ্বাসঘাতকতা– যা কিছু করেছি আমরা, আমাকে এমন আনন্দ, অবধ্য ভয়ংকর আনন্দ দিয়েছিল, যাতে গাঢ় অনুশোচনা আসে, আসে পাপের ঘৃণা, আক্ষেপ নয়, কেবল এক ভয়ানক অনুতাপ।’
পলিনের সঙ্গে অভিসারে কয়েকটা দিন কাটিয়ে তিনি যখন অস্ট্রিয়া ফেরেন, তার বর্ণনায় তিনি লেখেন: ‘গাদা করে রাখা কাঠের গুঁড়ির পাশ দিয়ে ট্রেনটা স্টেশনে ঢোকার পর আমার স্ত্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি, তখন মনে হচ্ছিল ওকে ছেড়ে আরেকজনকে ভালোবাসার আগে আমার মরণ হলো না কেন? আমাকে দেখে ওর মুখে হাসি, বরফের মধ্যে রোদে পোড়া ওর সুগঠিত চমৎকার মুখের ওপর সূর্যের আলো পড়ছিল, সারা শীতকাল ধরে বেসামাল আর সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠা ওর চুল সূর্যের আলোয় লাল সোনারঙে জ্বলছিল।’ 
স্কট ফিট্জেরাল্ড কিন্তু বরাবরই হেমিংওয়েকে সতর্ক করেছিলেন যে পলিন ফেইফার এক ধনীর দুলালী, হিসেবি নারী, তিনি প্যারিসে এসেছেন একজন স্বামীর খোঁজে। একসময় হ্যাডলির সঙ্গে তাঁর বিয়েটাও ভেঙে দেবেন পলিন। ফিট্জেরাল্ড সরাসরি হেমিংওয়েকে বলেছিলেন, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য যে কোনো কিছু করতে পারে ও।’ হ্যাডলি ও পলিনের মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত হেমিংওয়েকে ফিট্জেরাল্ড একবার ক্ষেপে গিয়ে বলেছিলেন যে তিনি এমন এক কুক্কুরী শাবক, যে মেয়েদের সম্পর্কে কিছুই জানে না। তারপর হেমিংওয়ের হাত চেপে ধরে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘ওর হাত থেকে ছুটে যাও। এক্ষুনি! এখানেই! এটা তিন নম্বর বিপদসংকেত! ওকে এখনই বলে দাও!’ কিন্তু পলিনের বিলাসবহুল জীবনযাপন ও তাঁর প্রেমের মোহে স্কটের এই পরামর্শ উপেক্ষা করেছিলেন হেমিংওয়ে।
স্ত্রী হ্যাডলি সবই বুঝতে পারেন, কিন্তু তাঁর কাছে এই টানাপোড়েনের চেয়ে আলাদা হয়ে যাওয়াটাই ছিল শ্রেয়তর। তবু স্বামীকে পলিনের ভালোবাসার নিগড় থেকে উদ্ধারের শেষ চেষ্টা হিসেবে তাদের একটা অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি করেছিলেন তিনি। একদিন একটা কাগজে তিনি লেখেন, ‘যদি পলিন ফেইফার ও আর্নেস্ট হেমিংওয়ে টানা একশ দিন পরস্পরের সঙ্গে দেখা না করেন এবং তারপরও যদি আর্নেস্ট বলেন যে তিনি পলিন ফেইফারকে ভালোবাসেন, তাহলে আমি আর জটিলতা না বাড়িয়ে আর্নেস্টকে ডিভোর্স দিয়ে দেব।’ তারপর নিজের নাম স্বাক্ষর করে হেমিংওয়েকেও তাতে স্বাক্ষর করতে বলেন। হেমিংওয়ে বলেন, এটাকে তো মৃত্যুপরোয়ানার মতো মনে হচ্ছে। হ্যাডলি বলেছিলেন, ‘ওটা মৃত্যুপরোয়ানাই বটে, হয় পলিন বেঁচে থাকবে, না-হয় আমি।’
অবশ্য শেষ পর্যন্ত হেমিংওয়েকে একশ দিনের বিচ্ছিন্নতার পরীক্ষা দিতে হয়নি। পঁচাত্তর দিনের মাথায় প্যারিস থেকে দূরের এক শহর থেকে লেখা চিঠিতে হ্যাডলি হেমিংওয়েকে জানান যে তিনি ডিভোর্স দিতে রাজি, যেহেতু সেটাই চাইছেন আর্নেস্ট। অবশেষে স্বামীর ছলনার কারণ দেখিয়ে হ্যাডলির পক্ষ থেকে করা ডিভোর্সের মামলার চূড়ান্ত রায় হয় ১৯২৭ সালের ২৭ জানুয়ারি। 
হেমিংওয়ের কাছ থেকে হ্যাডলি শেষ ফোনটা পেয়েছিলেন ১৯৬১ সালের মার্চে। তাদের প্যারিসবাসের সময় পরিচিত একজনের নাম জানতে চাইছিলেন তিনি। ফোনালাপটা ছিল খুবই আন্তরিক। সেই বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপের মধ্যেও আর্নেস্টের কণ্ঠস্বরের মধ্যে লুকানো এমন কিছু একটা ছিল যে তিনি বুঝতে পারেন, আর্নেস্ট আর তাঁর ভালোবাসার আগের মানুষটি নেই। ফোন ছাড়ার পর কেঁদে ফেলেছিলেন হ্যাডলি। এই ফোনালাপের চার মাস পর আত্মহত্যা করেছিলেন হেমিংওয়ে। 

আরও পড়ুন

×