হুমায়ূন আহমেদের অপ্রকাশিত রচনা
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
[গ্রন্থসমালোচক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের পরিচিতির আকাঙ্ক্ষা ছিল না। দেখা যাচ্ছে তিনি জীবনে কয়েকটি গ্রন্থালোচনা করেছিলেন। তার একটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’। এটি মূল শ্রীকান্তের আলোচনা নয়। এটি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য সংক্ষেপে পুনর্লিখিত ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসটির আলোচনা। এ কারণে গ্রন্থালোচনার রীতিসিদ্ধ পথে যাননি হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত এবং স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের উপযোগী করে লেখা ‘শ্রীকান্ত’-এর আলোচনা করেছেন। সংক্ষেপণ ও উপযোগী ক’রে তোলার কাজটি করেছেন মঈনুল আহসান সাবের। এ আলোচনাটি ১৯৮৯ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিক ‘উত্তরাধিকার’ সাহিত্যপত্রে মুদ্রিত হয়েছিল।]
বাংলা একাডেমি বেশ কিছু চমৎকার কাজ অতীতে করেছে। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হলো ‘চিরায়ত কিশোর গ্রন্থমালা’ ─ ‘কিশোর’দের উপযোগী করে লেখা চিরায়ত সাহিত্যের অমর রচনাবলী।
কৈশোর হচ্ছে বইপড়ার সবচে সুন্দর সময়। তখন মন থাকে তাজা। আবেগ ও কল্পনায় হৃদয় থাকে পূর্ণ। সাহিত্যের সুবিশাল উত্তরাধিকার─ চিরায়ত সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয়ের জন্য এই সময়টাই হচ্ছে মাহেন্দ্রক্ষণ। কৈশোরের পর আমরা নিজের সময় নিয়ে বড় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ফিরে তাকানোর অবসর আর হয় না। আমাদের মধ্যে অনেকেই তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ বইগুলি পড়েছেন কৈশোরে। তারপর আর পড়তে পারেননি─ সময়ের অভাব, সুযোগের অভাব এবং খানিকটা হয়তোবা আগ্রহের অভাব ঘটে। আবার হয়তো সময় হয় তবে তা হয় শেষ জীবনে─ তখন চোখের দৃষ্টি হয় ক্ষীণ, নানান রোগ-ব্যাধিতে মন থাকে ক্লান্ত─ কোনো মহৎ সাহিত্যই তখন আর স্থবির মনকে তেমনভাবে আকৃষ্ট করতে পারে না।
চিরায়ত গ্রন্থমালা কিশোরদের উপযোগী করে প্রকাশ─ এই কারণেই আমার চোখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বাংলা একাডেমিকে আমি আমার নিজের পক্ষ থেকে এবং এ দেশের কিশোর-কিশোরীদের পক্ষ থেকে জানাচ্ছি অভিনন্দন।
আমি সিরিজের ‘শ্রীকান্ত’ বইটি নিয়ে আলোচনা করব। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গ্রন্থ শ্রীকান্তের কিশোর সংস্করণ─ বাংলা একাডেমির ভাষায় সংক্ষেপণ─ তৈরি করেছেন মঈনুল আহসান সাবের।
‘শ্রীকান্ত’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সম্পদ। সেই হিসেবে অবশ্যই চিরায়ত সাহিত্যের মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য। মঈনুল আহসান সাবের একজন শক্তিমান কথাশিল্পী। কাজেই তাঁর কাজে আমার প্রত্যাশাও বেশি। শ্রীকান্তের সংক্ষেপণে তিনি সেই প্রত্যাশা পূরণ করেছেন তা’ অবশ্যই বলা যায়। একটি সুন্দর এবং পরিচ্ছন্ন কাজ। মূল শ্রীকান্তের, আবেদন ও আকর্ষণ এতে আছে। আর এ ধরনের কাজে মূলের চরিত্র বজায় রাখা এবং মূলের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ তৈরি করাই হচ্ছে প্রধান ব্যাপার। তবে একটি বড় বিচ্যুতি উল্লেখ না করে পারছি না। সংক্ষেপণে মূলের আবহ অক্ষুণ্ণ রাখা বাধ্যতামূলক বলেই জানি, সেই কারণেই যখন দেখি মঈনুল আহসান সাবেরের শ্রীকান্ত’র ইন্দ্রের মাসতুতো ভাই হয়ে যায় ইন্দ্রের খালাতো ভাই তখন অবাক লাগে।
মূল বইটিতে ভূতের ভয় কাটানোর জন্য ইন্দ্র ‘রামনাম’ করত। এখানে সে রামনাম করে না। সে ‘সৃষ্টিকর্তা’কে ডাকে। ─ ভূতের সঙ্গে রামনামের একটি সম্পর্ক আছে। রামনামের জায়গায় সৃষ্টিকর্তার ব্যবহার সেই কারণেই মূল রচনার রসভঙ্গ করে।
বইটি কি খুব তাড়াহুড়া করে লেখা? তাড়ার ছাপ আছে অনেক জায়গায়। একটি উদাহরণ দিই: পৃষ্ঠা ১০১।
প্রায় দশজোড়া ছোট-বড় রুদ্রাক্ষের মালা আর একজোড়া পিতলের তাগা। ওগুলো পরে খানিকটা ধুলোর ছাইও মাথায়-মুখে মেখে ফেললাম।
ধুলোর ছাই হয় বলে তো জানতাম না। ধুলো আগুনে পুড়ালে যা হয় তার নাম কাচ। সেই জিনিস মুখে মাখা সম্ভব না।
শেষ কথার আগে এই প্রকাশনার আরেকটি দুর্বলতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। চিরায়ত আখ্যায়িত করে কিশোর সংস্করণের প্রয়োজন অনুভব করা মানেই মূল রচনা এবং কিশোর পাঠকদের মধ্যেরও দূরত্ব স্বীকার করে নেওয়া। লেখক এবং মূল বইয়ের পরিচিতি এই কারণেই অপরিহার্য।
মূল শ্রীকান্তের সঙ্গে যে কিশোরের পরিচয় আছে এই বই নিশ্চয়ই তাদের জন্য নয়। আর পরিচিতির অভাব এ বইগুলিকে মূলের দিকে আগ্রহী করছে না।
শরৎচন্দ্র তাঁর এ কালজয়ী রচনাটি নিয়ে নিজে খুবই দ্বিধায় ছিলেন; বছরের পর বছর বিরতি দিয়ে লেখায় ফিরে গেছেন এবং আরও একটি খণ্ড লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত লেখেননি। এসব তথ্য এমনিতেও তো কম আকর্ষণীয় নয়। এই ব্যাপারগুলি থাকলে ভালো হতো নাকি?
আর একটি ছোট্ট কথা বলে বক্তব্য শেষ করছি: আমার মনে হয় বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত গ্রন্থগুলির কিশোর সংস্করণের চেয়ে জোর দেওয়া উচিত বিদেশি ভাষার রচনাবলিতে। বাংলা গ্রন্থগুলি কিশোররা এমনিতেই পড়তে পারে। আলাদা করে ওদের জন্য এগুলি লেখানোর তেমন কোনো অর্থ হয় না।
- বিষয় :
- গল্প