বিচারের বাণী যেন নীরবে-নিভৃতে না কাঁদে
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২০ | ১২:০০
দুর্বৃত্ত সাহেদ করিম ধরা পড়েছে। বোরকা পরে সে ভারতে পালাতে চেয়েছিল। র্যাব তাকে ধরে ফেলে। তাতে দেশের মানুষ আনন্দিত। সঙ্গে বিদেশের বাংলাদেশিরাও। করোনা নিয়ে যখন সারাদেশ আক্রান্ত এবং আতঙ্কিত, তখন যে লোক তা নিয়েও ব্যবসা করতে পারে, মুনাফা লুটতে পারে, সে মানুষ নামের যোগ্য নয়। তাকে চরম শাস্তি দিয়ে বিচার বিভাগকে প্রমাণ দিতে হবে তারা ক্ষমার অযোগ্য এই ক্রিমিনালদের আইন অনুযায়ী চরম শাস্তি দিয়ে দুর্বলকে সহায়তা এবং দুর্জনকে শায়েস্তা করতে কিছুমাত্র অপারগ নন।
দুর্বৃত্ত সাহেদ করিম ধরা পড়ায় আনন্দিত বাংলাদেশিদের টেলিফোন পেয়েছি সুদূর অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড থেকেও। অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক আলাউদ্দীন সাহেবের আমন্ত্রণে একবার ব্রিসবেনে গিয়েছিলাম। ব্রিসবেন ইউনিভার্সিটির ছাত্র সমাবেশে বক্তৃতা দিয়েছিলাম। বাংলাদেশ সম্পর্কে বিদেশি ছাত্রদের অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছিল। তখন দু-চারজন বাংলাদেশির সঙ্গেও পরিচিত হয়েছিলাম। তাদের মধ্যে একজন সাহেদ করিম ধরা পড়ায় আনন্দিত হয়ে আমাকে টেলিফোন করেছেন।
তিনি বললেন, ভাই, করোনার জন্য আতঙ্কিত হয়ে আছি। তবু এই আতঙ্কের মধ্যেও আনন্দিত হচ্ছি দেশে সাহেদ করিমের মতো দুর্বৃত্ত ধরা পড়ায়। সে ভারতে পালাতে পারলে তাকে সহজে ধরা যেত না। কিন্তু এই আনন্দের মধ্যেও একটা উদ্বেগ আমাদের আছে। ধরা পড়লেও সাহেদ করিম বিচারে গুরুদণ্ড পাবে কি? নাকি দু'মাস-ন'মাস পর মুরব্বিদের জোরে জেল থেকে বেরিয়ে এসে আবার মানুষের মাথায় তলোয়ার ঘোরাবে? একবার তো সে জেলে গিয়েছিল। তাতে কী হয়েছে? সে জেল থেকে বেরিয়ে এসে আরও প্রতাপশালী হয়েছে। অতীতের ক্ষমতাসীনরা তাকে মাথায় করে ঘুরেছে। বর্তমান ক্ষমতাসীনরাও তাই করেছে।
তাকে বলেছি, দেখা যাক সে যখন ধরা পড়েছে, তখন কী হয়। আমাদের পুলিশ ও র্যাব এখন যতটাই সক্ষম, বিচার বিভাগও ততটাই দৃঢ়। অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন ছাড়াও লন্ডন, নিউইয়র্কের বন্ধুরাও টেলিফোন করেছেন। কিন্তু সবার কণ্ঠেই আনন্দের সঙ্গে শঙ্কা জড়িত। ধরা তো পড়েছে। বিচার হবে তো? সাহেদ করিমের মতো দুর্বৃত্ত ধরা পড়ায় সকল বাংলাদেশির মধ্যেই একটা দাবি দৃঢ়ভাবে উচ্চারিত হতে দেখছি যে, শুধু সাহেদ করিমকে নয়, তাকে যারা সমাজের মাথায় উঠতে সাহায্য করেছে এমন ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, সাংবাদিক এবং আমলাদের সম্পর্কেও তদন্ত হওয়া উচিত এবং তাদেরও বিচারের আওতায় আনা হোক। দেশবাসী জানুক, ক্ষমতার শীর্ষে বসে দুর্নীতির উৎসে কারা পানি ঢালছে। নইলে শুধু সাহেদ করিমকে একা শাস্তি দিয়ে লাভ হবে না।
বাংলাদেশে কেন দুর্নীতি দমন হয় না? এমনকি দুদকও দুর্নীতিবাজদের ধরতে পারছে না, তাদের নাকের ওপর দিয়ে স্পেশাল প্লেন ভাড়া করে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারে? একদল মানুষের ধারণা, পুলিশ ঘুষ খেয়ে দুর্নীতিবাজদের ছেড়ে দেয়। পুলিশ বলে তারা অসহায়। দুর্বৃত্তদের ধরলেই অনেক সময় ওপর থেকে টেলিফোন আসে ওকে ছেড়ে দাও। তারপর কিছু প্রভাবশালী আইনজীবী আছেন, যারা প্রচুর ঘুষ খেয়ে একশ্রেণির বিচারকের যোগসাজশে দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তার করা মাত্র জামিনে মুক্ত করে দেন। মুক্ত হয়ে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। 
সম্প্রতি ইউটিউবে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের জ্বালাময়ী বক্তব্য শুনলাম। তাকে আমি ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করি। তার বক্তব্য শুনে আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছে। শামীম ওসমান স্বাস্থ্য বিভাগের এই করোনাকালীন দুর্নীতির জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। এই দাবি দেশের মানুষের এবং আমারও। আত্মসম্মানবোধ থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগ না করলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচিত হবে দেশবাসীর ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে এই স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অপসারণ করা।
শামীম ওসমান জনপ্রতিনিধি হিসেবে এই দাবিটি জোরালোভাবে তুলে দেশবাসীর মনের ইচ্ছা পূরণ করেছেন। এখন আমার মনের প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করছি। শামীম ওসমান দুর্নীতির দায়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। শামীমকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, স্বাস্থ্য বিভাগে দুর্নীতির যে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, সেটি না ভেঙে কেবল মন্ত্রীকে অপসারণ করে কী হবে? শামীম বলেছেন, মন্ত্রী একাই এই সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেন। আমি বলছি, না শামীম, কোনো মন্ত্রীই একা এই সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেন না। কারণ, গোটা সরকারি এস্টাবলিশমেন্টই এখন দুর্নীতিময়। তাদের স্বার্থে আঘাত দিতে গেলে শামীম ওসমানও এমপি থাকবেন কিনা সন্দেহ।
আমাদের খাদ্যমন্ত্রী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। তিনি একজন সরল ও সৎ লোক। কিন্তু খাদ্য বিভাগ-সংশ্নিষ্ট সিন্ডিকেটের দ্বারা তিনি কীভাবে হিমশিম খাচ্ছেন তা আমি জানি। একশ্রেণির প্রভাবশালী ডাক্তারের দুর্নীতির কথা লিখতে গেলে প্রথমেই বঙ্গবন্ধুর হাসপাতালের কথা বলতে হয়। এখানে প্রায় সব ডাক্তারই বঙ্গবন্ধু-প্রেমিকের ব্যাজ ধারণ করে আছেন। কোন বাপের ব্যাটা এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের স্বার্থে বাধা দেবে? একজন দিতে চেয়েচিলেন। তার নাম ডা. কৃষ্ণা মজুমদার। তার ফলে এই সিন্ডিকেট তাকে তার স্বামীর হত্যাকারী সাজাতে চেয়েছিল। নানা অপবাদ দিয়ে তার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। তিনি এখনও শান্তিতে নেই।
শামীম ওসমান শুধু একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিলেন। কিন্তু একই অপরাধ করেছেন, এমন আরও ক'জন মন্ত্রী এবং সদ্যধৃত পাপুলের মতো এমপিদের সম্পর্কে তিনি নীরব রইলেন কেন? শামীম ওসমানকে আমি স্নেহ করি। তার পরিবার সারা বাংলাদেশেরই একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবার। শেখ হাসিনারও তিনি খুব প্রিয় লোক। কিন্তু তিনিও কি একবার নিজের রাজনৈতিক জীবনের রেকর্ডপত্রের দিকে চোখ বুলিয়ে দেখেছেন? একবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার এক বন্ধুপ্রতিম ওসি তার গোপন ডায়েরিটা আমাকে দেখিয়েছেন। তাতে ছিল আওয়ামী লীগেরও যত মন্ত্রী ও এমপি গ্রেপ্তার হওয়া দুর্বৃত্তদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য ওই ওসিকে টেলিফোনে নির্দেশ দিয়েছেন, তাদের নাম। এই নামগুলো দেখে আমি চমকে উঠেছি। শামীম ওসমান এসব নাম না জানেন তা নয়। কিন্তু তিনি কি এদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে রাজি আছেন কিংবা সাহসী হবেন? হবেন না। কারণ তাতে মি. হাইডের মুখোশটা খুলে গিয়ে ডা. জেকিল ধরা পড়তে পারেন।
আমাদের বিচার বিভাগ সম্পর্কে মানুষের মনে দারুণ আস্থা থাকা দরকার। আমাদের অনেক বিচারক তাদের সাহস, নিরপেক্ষতা ও অভিজ্ঞতার দ্বারা বিচার ব্যবস্থাকে বিশ্বের দরবারে উজ্জ্বল করে গেছেন। তা সত্ত্বেও আমাদের একশ্রেণির বিচারকের সাহস সম্পর্কে মানুষের মনে কিছু সন্দেহ আছে। সে জন্যেই তারা সন্দেহ করেন সাহেদ করিম ধরা পড়লেও শেষ পর্যন্ত তার প্রাপ্য শাস্তি পাবেন কিনা? নাকি ১৯৭৪ সালের 'ম্যান সেরু মিয়ার' মতো বিচার এড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারবেন? মানুষ এখনও জানে না সেই সময়ের দুর্নীতির মহানায়ক ম্যান সেরু মিয়ার আসল পরিচয় কী? সাহেদ করিমের ব্যাপারে একটি সান্ত্বনা, সে বোরকার আড়ালে লুকিয়ে পালাতে চেয়েছিল। পুলিশ ও র্যাব তাকে ধরে ফেলতে পেরেছে। চেষ্টা করলে সে প্রাইভেট জেট ভাড়া করে বিদেশে পালাতে পারত কিনা সেটাও একটা প্রশ্ন। আরও প্রশ্ন, এই পলাতকদের সাহায্যকারী কারা?
আমাদের বিচারপতিরাও মানুষ। তাদের মধ্যেও মনুষ্যসুলভ দুর্বলতা থাকা সম্ভব। সেটা গোপন থাকাই ভালো। প্রকাশ হওয়া উচিত নয়। প্রকাশ হলে বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও সাহসের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। আমাদের বিচার ব্যবস্থায় সম্প্রতি সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা অনেক অঘটন ঘটিয়ে গেছেন। কিন্তু তার আগেও দু-একজন প্রবীণ বিচারপতিও যে দুর্বলতা দেখিয়ে গেছেন, তা মানুষ এখনও ভুলে যায়নি।
বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বিচার করতে দু'জন বিচারপতি বিব্রতবোধ করেছিলেন। গোলাম আজমকে যে তিন বিচারপতি সর্বসম্মত হয়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে দু'জন ছিলেন সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত সাবেক প্রধান বিচারপতি। একজন মোস্তফা কামাল এবং আরেকজন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং ছাত্রজীবনে প্রগতিশীল আন্দোলনের নেতা মুহম্মদ হাবিবুর রহমান শেলী।
এই দুই বিচারপতিই আমার বন্ধু ছিলেন। তাদের মৃত্যুর পূর্বে আমার এক কলামে মোস্তফা কামালকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কোন ন্যায়নীতির ভিত্তিতে আপনি গোলাম আজমের মতো দেশদ্রোহী ঘাতককে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিলেন? আমার প্রশ্নের জবাব বিচারপতি মোস্তফা কামাল ঢাকার এক কাগজে নিজ নামে লেখা কলামে দিয়েছিলেন, গাফ্ফার, আপনি কেন আপনার প্রগতিশীল বন্ধু বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমান শেলীকে জিজ্ঞাসা করেন না, তিনি কেন গোলাম আজমকে নাগরিকত্ব দানের রায়ে সম্মতিসূচক সই দিয়েছিলেন?
'৭১-এর ঘাতক, দালাল এবং স্বাধীনতা ও মানবতার শত্রুদের বিচার ও শাস্তিদান দ্বারা সংশ্নিষ্ট বিচারপতিরা জনগণের প্রশংসা অর্জন করেছেন। কিন্তু রায়দানের প্রথমদিকে তাদের দুর্বলতা ছিল প্রকট। প্রথম রায়টি ছিল ঘাতক কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে। কাদের মোল্লা ছিল নির্মম ঘাতক। তাকে ট্রাইব্যুনালের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এই রায়ের বিরুদ্ধে সারাদেশ গর্জে উঠেছিল। পাঁচ লাখ লোক জমায়েত হয়েছিল শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বে। হাসিনা সরকার জনগণের ইচ্ছা পূরণে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল না করলে পরবর্তী রায়েও ঘাতকরা হয়তো ফাঁসি এড়াত। এখন জনতার চাপে বিচারপতিরা পরবর্তী আসামিদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে চরম শাস্তির রায় দিয়েছেন, এটা বলা চলে।
সাহেদ করিমের মতো প্রভাবশালীদের অনুগৃহীত এক দুর্বৃত্তের প্রকৃত বিচার ও শাস্তি হবে কিনা, এ প্রশ্নটি জনমনে আছে। কারণ, সাহেদ করিম মুখ খুললে গোটা এস্টাবলিশমেন্ট বিপন্ন হবে। সুতরাং এস্টাবলিশমেন্টের শাকে ঢাকা মাছ যাতে বেরিয়ে না পড়ে, সেজন্য নানা কৌশল খাটানো হতে পারে। এখানেই বিচার ব্যবস্থাকে তাদের ওপর জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য ন্যায়বিচারে অটল থাকতে হবে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে যেমন অটল ছিলেন, তেমনি এই সামাজিক অপরাধীদের বিচারেও যদি অটল থাকেন, তাহলে এই দুর্বৃত্তরা সাজা পাবেই।
[লন্ডন ১৬ জুলাই, বৃহস্পতিবার]
- বিষয় :
- কালের আয়নায়