ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

শতবর্ষের মিলনমেলা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাব্দী-বিস্তৃত ছায়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাব্দী-বিস্তৃত ছায়া
×

ইনাম আহমদ চৌধুরী

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১১ মার্চ ২০২২ | ১৪:৩০

কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ বছরপূর্তি যে বড় একটি কৃতিত্ব বা শ্নাঘার ব্যাপার- তা বলা যায় না। আমাদের প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সাল থেকে আপন অস্তিত্ব জিইয়ে রেখে আকারে ও ছাত্র সংখ্যায় অনেক প্রবৃদ্ধি লাভ করেছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমাদের গর্ববোধের কারণ হলো, এই শিক্ষাপীঠের প্রভাব এবং তার সুদূরপ্রসারী কল্যাণকর তাৎপর্য সাধারণত্বের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থিতি পূর্ববঙ্গবাসীর উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুবিধা পেতে সহায়ক হয়েছিল এবং বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে সচেতনতার সৃষ্টি করেছিল। দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, বিশেষ করে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং আমাদের রক্তস্নাত ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতুলনীয় ভূমিকা পরম গর্বের ব্যাপার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যতিক্রমী বিশেষত্ব ছিল, এটি আবাসিক হলকেন্দ্রিক এবং হলনিবাসী না হলেও সব ছাত্রছাত্রীকে কোনো একটি হলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হতো। রিসার্চকেও তুলনামূলক অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হতো। অধ্যয়নে টিউটোরিয়াল পদ্ধতিকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। এ ধরনের শিক্ষাদান ব্যবস্থা অক্সফোর্ডে প্রচলিত ছিল বলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে 'প্রাচ্যের অক্সফোর্ড' বলে আখ্যায়িত করা হতো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ভর্তি হই ১৯৫৪ সালে। ঢাকা কলেজ থেকে আইএ পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন একটি প্রচলিত স্বাভাবিকতায়ই প্রবেশ। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে সিট পেলাম- ইস্ট হাউসের দোতলার ২২ নম্বর কক্ষে। অর্থনীতিতে অনার্স নিলাম। অর্থনীতিতে তখন বেশ ক'জন সুখ্যাত অধ্যাপক-শিক্ষক। ড. এমএন হুদা ছিলেন বিভাগীয় প্রধান; সুদর্শন, সুবেশ ও অমায়িক। আমাদের পড়াতেন কৃষি অর্থনীতি। তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি। আরও ছিলেন অধ্যাপক মাহমুদ, ড. কেটি হোসেন, ড. নূরুল ইসলাম (হার্ভার্ড থেকে সদ্য আগত), ড. নূরুল আলম, মোহাম্মদ উজায়ের। ড. মজহারুল হক ছিলেন রিডার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। অর্থনীতি বিভাগে পরে যোগ দেন ড. কুলসুম হুদা (ড. এমএন হুদার স্ত্রী), রেহমান সোবহান (সদ্য কেমব্রিজ প্রত্যাগত); কিন্তু তারা আমাদের কোনো ক্লাস নেননি। অর্থনীতি বিভাগটি বেশ কর্মচঞ্চল ছিল। প্রায়ই সেমিনারের আয়োজন হতো। আমরাই প্রথম 'ইকোনমিক্স অ্যাসোসিয়েশন' প্রতিষ্ঠা করলাম। বিভাগীয় প্রধান হলেন সভাপতি, সিনিয়র ছাত্র রেজাউল করিম সহসভাপতি এবং আমি জেনারেল সেক্রেটারি। আমরা বছরে একবার স্টাডি ট্যুর বা শিক্ষা সফরের আয়োজন করতাম। সেটা সাধারণত ক্লাসভিত্তিক হতো। আমাদের ক্লাসে ছিলেন ছয়জন ছাত্রী এবং ২২ জন ছাত্র। বেশ সম্প্রীতির সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক। অন্য বিভাগের তুলনায় ছাত্রীসংখ্যা বেশ ছিল। অধিকাংশ বিভাগেই ছাত্রীদের সংখ্যা ছিল আরও কম। সতীর্থদের মধ্যে আমার সঙ্গে যাদের বিশেষ সখ্য ছিল তারা ছিলেন- খন্দকার আসাদুজ্জামান (পরে সিএসপি-রাজনীতিক), আইয়ুবুর রহমান (সিএসপি, কেবিনেট সেক্রেটারি), আলতাফ (ব্যাংকার), মোয়াজ্জম (বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক), জুনেদ (বিজনেস এক্সিকিউটিভ), আবুল হোসেন (ইনকাম ট্যাক্স কমিশনার), সুফিয়া হাসনা জাহান (ক্রীড়াবিদ-অধ্যাপিকা), রওশন আরা (সুগায়িকা), লিলি শামসুন্নাহার (প্রবাসিনী-গৃহিণী) এবং জোবেইদা (কেন্দ্রীয় সুপিরিয়র সার্ভিসে যোগদান; সহকর্মী একজন পশ্চিম পাকিস্তানিকে বিয়ে)। আমরা (সবাই নই) শিক্ষা সফরে ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তানে কয়েকবার গিয়েছি। সিলেট-তামাবিল সীমান্তে গিয়ে সড়কপথে মেঘালয়ের শিলং। শিলং ছিল আমার শৈশবের স্মৃতিময় শহর এবং প্রথম স্কুলজীবনের পীঠস্থান। পাকিস্তান-ভারতের অন্যান্য জায়গায় গিয়েছি প্রধানত ট্রেনে; কখনওবা বাসে। ট্রেনে কম্পার্টমেন্ট ভাড়া করে গাদাগাদি করে যেতে ভালো লাগত। মেয়েদের সংখ্যা খুব বেশি থাকত না। তাদের কিছুটা অসুবিধা হতো বটে, তারা তা সামলে নিতেন। দলনেতা হিসেবে খবরদারির জন্য দু-একজন শিক্ষক থাকতেন। সাধারণত আমরা দর্শনীয় স্থানগুলোই দেখতাম। তবে মাঝেমধ্যে কোনো বিশেষ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আগেই যোগাযোগ করে তাদের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আলোচনা সভা করেছি। ছুটির সময় হলে কখনওবা ব্যবস্থা করে তাদের ছাত্রাবাসে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে।

মনে পড়ে, আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের জন্য একটি বড় অভ্যর্থনার আয়োজন করা হয়েছিল। দু'বার পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয় এবং একবার লাহোর হেইলি কলেজ আমাদের আহার-বাসস্থানের ব্যবস্থা করে আতিথেয়তা প্রদর্শন করেছিল। সব জায়গায়ই আমরা সহৃদয় সহানুভূতিশীল ব্যবহার পেতাম। মাঝেমধ্যে দু-একটি মজার ঘটনাও ঘটত।

একবার আমরা পশ্চিম পাকিস্তান সফর শেষ করে ওয়াগা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের অমৃতসর শহরে এসে কলকাতার উদ্দেশে ট্রেন ধরব। যদিও চণ্ডীগড় ভারতীয় পাঞ্জাবের রাজধানী, অমৃতসর শিখদের সর্বোচ্চ তীর্থস্থান এবং পাঞ্জাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। অমৃতসর আন্তর্জাতিক সীমানার খুব কাছেই। অমৃতসর পৌঁছে দেখি, যে ট্রেন আমাদের ধরার কথা, সেটি ছেড়ে চলে গেছে। বর্ডার অতিক্রম করতে আমাদের বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তান যাওয়ার সময় আগেই আমরা উত্তর ভারতের কোনো কোনো স্থান বেড়িয়ে গেছি। ফেরার পথে শুধু কলকাতা দু'দিন থেকে ঢাকা প্রত্যাবর্তন। ভারতে ভিসায় তখন বেড়ানোর জন্য আগেই স্থান নির্দিষ্ট করে অনুমোদন নিতে হতো। যেমন সেবার আমাদের ছিল লক্ষেষ্টৗ, আগ্রা, ফতেহপুর সিক্রি, দিল্লি এবং কলকাতা। অন্য কোথাও থাকার কোনো অনুমোদন ছিল না। অমৃতসরের কোনো উল্লেখ নেই। আমাদের তাই রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে এবং ওয়েটিং রুমেই থাকতে বলল। ট্রেন পরের দিন। আমাদের সবারই স্লিপিং ব্যাগ বা হোল্ড-অল ছিল। তাই ঘুমোতে বিশেষ অসুবিধা হয়নি। সঙ্গিনী মেয়েদের জন্য ওয়েটিং রুমে ব্যবস্থা করা হলো। পরদিন সকালে চা খেয়ে আমরা তিন বন্ধু স্থির করলাম, গোপনীয়ভাবে আমরা ঘণ্টা দু-তিন অমৃতসর ঘুরে আসতে পারি। স্টেশনে তো কোনো ইমিগ্রেশন বা কাস্টমস চেক পয়েন্ট নেই। অমৃতসরে আছে শিখদের গোল্ডেন টেম্পল- সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থ। আর আছে জালিয়ানওয়ালাবাগ, যেখানে ব্রিটিশ সৈন্যরা নৃশংসভাবে জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে একটি সভায় যোগদানকারী নিরস্ত্র শত শত মানুষকে গুলি করে হত্যা করেছিল; ১৩ এপ্রিল ১৯১৯ সালে। আমরা তিনজন চুপি চুপি বেরিয়ে গেলাম কাউকে না বলে। একটি ঘোড়াচালিত টাঙা ভাড়া করে গেলাম প্রথমে জালিয়ানওয়ালাবাগ, পরে গোল্ডেন টেম্পল। বিভিন্ন কারণে আমরা ঠিক করেছিলাম, কোথাও নাম বলতে হলে আমরা হিন্দু নাম বলে দেব- ওয়েস্ট বেঙ্গল থেকে এসেছি। গোল্ডেন টেম্পলে ঢোকার সময় গেটে দর্শনার্থীদের নামধাম লিখে রাখার ব্যবস্থা ছিল। হঠাৎ জিজ্ঞেস করাতে ভড়কে গিয়ে আমাদের একজন বন্ধু বলল- তার নাম রাম সিং। রেজিস্টার-লেখক চমকে উঠলেন মনে হলো। তিনি বললেন, আশ্চর্য! আমি তো বেঙ্গলে ৩০ বছরেরও বেশি কাটিয়েছি। পড়াশোনা ও স্কুল-কলেজও করেছি। কোথাও 'রাম সিং' বলে বাঙালি কারও নাম শুনিনি। বন্ধুবর বিব্রত বোধ করে আমতা আমতা করে কী যেন বলতে চাচ্ছিল। হঠাৎ আমার খেয়াল হলে বললাম, রাম সিং সংক্ষেপিত। আসল নাম রাম কুমার সিনহা। রেকর্ড-লেখক মাথা নাড়া দিয়ে বলে উঠলেন- ও, তাই বলেন। আমাদের সবার ভুয়া নামধাম লিখে আমরা স্বর্ণমন্দিরটি দেখে বাইরে এসে টাঙা চেপে প্ল্যাটফর্মগামী হই। কথাচ্ছলে টাঙাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম- শুনেছিলাম, এখানে সাম্প্রদায়িক টেনশন চলছে। আমরা তো কিছু টের পেলাম না। শিখ টাঙাওয়ালা বলল, 'জি, এখন প্রায় শেষ। চলছিল বেশ ক'দিন দিল্লির সরকারবিরোধী আন্দোলন। পরে এটা হয়ে দাঁড়ায় হিন্দু-শিখ সংঘর্ষ। শিখরা হিন্দি-রাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিল। পার্টিশনের সময় (১৯৪৭)। শিখদের ওয়াদা করা হয়েছিল- তাদের স্পেশাল স্ট্যাটাস দেওয়া হবে। বিট্রে করে ওটা দেওয়া হয়নি। হিন্দুরা শিখদের বিশেষ স্ট্যাটাস দিতে চায় না। ওই কারণে।' প্ল্যাটফর্মে ফিরে এসে আমাদের বোকামির কথা নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করে কৌতুক বোধ করলাম। বেশি সাবধানতার ফল উল্টো হতে পারত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের অধিকাংশ কর্মকাণ্ড কিছু হলকেন্দ্রিক ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বছরেই আমি এসএম হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনে যুগ্ম সম্পাদক পদে গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হয়ে জিতে গেলাম। এর আগে আমি ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের (১৯৫২-৫৩) নির্বাচিত জেনারেল সেক্রেটারি ছিলাম। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং কলেজ চত্বরে শহীদ মিনার নির্মাণের অভিযোগে আমাকে আরও চার ছাত্রের সঙ্গে বহিস্কার করা হয়েছিল। পরে ছাত্র আন্দোলনের জেরে সে আদেশ প্রত্যাহূত হয়। সে সুবাদে ছাত্র রাজনীতির অঙ্গনে সুপরিচিত হয়ে পড়ি। ১৯৫৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনে একই দলের মনোনীত প্রার্থী হয়ে এএমএ মুহিত (পরবর্তী জীবনে সিএসপি, অর্থমন্ত্রী) হলেন সহসভাপতি। সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন পরবর্তী সময়ে সাংবাদিক এবং এক্সিকিউটিভ মাহবুব আনাম। আমাদের সময়ে ছাত্র সংসদের যথেষ্ট কর্মচাঞ্চল্য ছিল। আমরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, বার্ষিক নাটক, বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করি। ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন হলের প্রভোস্ট ড. উসমান গণি। তার প্রশাসনিক দক্ষতা, রীতিনীতি ও শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা, অভিভাবকসুলভ সস্নেহ আচরণ, ব্যক্তিত্ব এবং ছাত্রস্বার্থ সংরক্ষণে দৃঢ় মনোভাব আমাদের সবারই আস্থা ও প্রশংসা অর্জন করে। '৫৩ সালে একবার পুলিশ এসএম হলে প্রবেশ করতে চাইলে তিনি তাদের ঠেকিয়েছিলেন। পাগড়ি পরিহিত সুঠামদেহী পাঠান দারোয়ান 'নাজু' তো ওর লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

ইনডোর গেমসে আমরা প্রথম হলের মধ্যেই ছাত্রীদের অংশগ্রহণে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত করি। তখন ছাত্রীদের নিজস্ব হল ছিল না। চামেলী হাউসে আবাসিকরা থাকতেন। তবে তারা এবং অনাবাসিক ছাত্রীদেরও কোনো একটি হল, অর্থাৎ এসএম, ফজলুল হক, জগন্নাথ, ঢাকা অথবা ইকবাল হলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হতো।

সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা এবং নাটকেও মেয়েরা অংশগ্রহণ করতেন। জমজমাট ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। টেনিস খেলাতেও ছাত্রদের প্রচুর আগ্রহ ছিল। শীত ও হেমন্তকালে তিনটি কোর্টে খেলা হতো। একবার প্রশিক্ষণ দিতে কয়েক দিনের জন্য এসেছিলেন বিশ্বখ্যাত টেনিস তারকা এলথিয়া গিবসন ও আরেকজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য হলেও সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রচুর উৎসাহ ও আয়োজন ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে হতো আন্তঃহল প্রতিযোগিতা। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক প্রচুর কর্মকাণ্ড হতো। আমাদের সময়ে ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন একজন প্রখ্যাত ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জেঙ্কিন্স।

অর্থনীতিতে অনার্সের পর সিদ্ধান্ত নিলাম, জীবিকার সন্ধানে সিভিল ফরেন সার্ভিসে যোগদান করব অথবা আইনজীবী হবো। সে উদ্দেশ্যে এমএতে নিলাম আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং আইনে এলএলবি। তখন আইন অনুষদের শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই সুবিখ্যাত ছিলেন- অধ্যাপক এনইউ সিদ্দিকী, আবু সাঈদ চৌধুরী (পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি), ব্যারিস্টার এটিএম মোস্তফা (পরে মন্ত্রী), ব্যারিস্টার আসরারুল হোসেন, ব্যারিস্টার হামদুর রহমান (পরে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি), কামাল উদ্দিন হোসেন (পরে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এবং সুপণ্ডিত-সুলেখক) প্রমুখ। তখন আইন পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিপ্রাপ্তি দুস্কর বলে একটি ধারণা ছিল। গুরুত্ব দিয়ে পড়াশোনা করে আমি অবশ্য এলএলবিতে প্রথম শ্রেণি পেয়েছিলাম। ওই পরীক্ষায় সম্ভবত আমি একাই তা পেয়েছিলাম। হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করার মানসে তদানীন্তন অ্যাডভোকেট জেনারেল (পরে প্রধান বিচারপতি) বি এ সিদ্দিকী এবং আশিক কামাল উদ্দিন হোসেনের তত্ত্বাবধানে চেম্বারশিপ করি। পরে অবশ্য ব্যক্তিগত কারণে সিভিল-ফরেন সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে সিএসপিতে যোগদান করি। সেকালে কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিতে যোগদান তরুণদের একটি প্রধান আকর্ষণ ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্র সংসদ ও ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িয়ে থাকলেও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং কার্যকলাপে আমার সংশ্নিষ্টতা ছিল নিবিড়। ওই ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় সংস্কৃতি-সংসদের প্রেসিডেন্ট আমি নির্বাচিত হই একবারই; আর জেনারেল সেক্রেটারি হন খ্যাতনামা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও পরে চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান। পঞ্চাশ দশকের শেষার্ধে আমরা সংস্কৃতি সংসদে কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত করে একটি গণমুখী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ঢেউ সারা প্রদেশে ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট হই।

এত কিছু করেও পড়াশোনা এবং পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার চেষ্টা করা যে আমাদের ছাত্রজীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, তা আমরা সব সময়ই ধারণ করেছি। বস্তুতপক্ষে পরীক্ষার ফল এবং কোনো বিষয়ে উৎকর্ষ অর্জন- লেখালেখি, ক্রীড়া, সংগীত, অভিনয় ছাত্রছাত্রীদের গ্রহণযোগ্যতা ও মান নির্ণয়ের প্রধান নির্দেশক ছিল। সর্ব পাকিস্তান প্রতিযোগিতামূলক সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষাগুলোয় এককভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কৃতিত্ব ছিল সর্বোচ্চ। ভারতেও এককভাবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমমানের অবদান নেই। তবে দুঃখের বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় এখন অনেক বড় এবং সমৃদ্ধতর হলেও শিক্ষার মান কমেছে লক্ষণীয়ভাবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রমে অনেকাংশে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে। শান্তি-শৃঙ্খলা এবং বিদ্যা-শিক্ষার পরিবেশ বিপর্যস্ত। যদিও সাম্প্রতিক 'স্কোপাস'-এর জরিপে দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গবেষণায় শীর্ষস্থান অধিকার করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১১ হাজার ৪৭৭টি প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধের মধ্যে এক হাজার ২৪৬টি বের হয়েছে এখান থেকে) এবং ২০২০ সালে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ৬৪১ জন গবেষক পিএইচডি ডিগ্রি পেয়েছে। এটা মনে করার কোনোই কারণ নেই যে, দেশে গবেষণানির্ভর উচ্চশিক্ষার প্রসার হয়েছে। অধিকাংশ গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির যোগ্য নয় বলে বিবেচিত। এর মধ্যে আবার নন-একাডেমিক পেশাজীবী বা আমলাদের পিএইচডি ডিগ্রি গ্রহণের প্রবণতা লক্ষণীয়। মেধাবী ছাত্রদের রিসার্চের জন্য ফান্ডের যথোপযুক্ত সাশ্রয় নেই। ২০১৫-১৬ সালের শিক্ষা বাজেটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ ফান্ড ছিল মাত্র ১ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষপূর্তির এই ক্ষণে আমরা আশা করব সরকার, রাজনৈতিক দলগুলো এবং সমাজের শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গের সমন্বিত উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ঊর্ধ্বগতি লাভ করবে- দেশের সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গে শুধু তাল মিলিয়ে নয়, সে অভিযাত্রায় আকাঙ্ক্ষিত অবদান রেখে। সন্তুষ্টির বিষয়, ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ইদানীং এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে। বস্তুত সারা পৃথিবীতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকল্পে অ্যালামনাই- অর্থাৎ প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা একটি মুখ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ইনাম আহমদ চৌধুরী: সাবেক সচিব; সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

আরও পড়ুন

×