রাজনীতি
বিএনপিকে 'সমুচিত জবাব' দেওয়ার কারণ
জাহেদ উর রহমান
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২২ | ১৪:৪৬
আমরা দেখছি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীন হওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশের প্রায় সব বিরোধী রাজনৈতিক দল জনসভা, বিক্ষোভ মিছিলের মতো নানা কর্মসূচি ঘোষণা ও পালন করেছে। বিএনপিও স্বাভাবিকভাবে এ ইস্যুতে বেশ সক্রিয়। দেশের সর্ববৃহৎ বিরোধী দলটির কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের অভূতপূর্ব সাড়া দেখা যাচ্ছে। বিএনপির এসব কর্মসূচির মধ্যেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা এবং মন্ত্রীরা নানা রকম কথা বলছেন। এর মধ্যে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের 'খেলা হবে' মন্তব্য বেশ সাড়া জাগিয়েছে।
এদিকে গতকাল, ২৮ আগস্ট রোববার সমকালে প্রকাশিত এক সংবাদের শিরোনাম- 'সহিংসতা হলে আরও কঠোর হবে আ'লীগ'। এই প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সভাপতি উদ্ৃব্দত হয়েছেন এভাবে- 'আওয়ামী লীগের স্পষ্ট কথা, রাজপথের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বাধা দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সংযত রয়েছে। ভবিষ্যতেও সংযত থাকবে। তবে কথিত সরকারবিরোধী আন্দোলনের নামে অগ্নিসংযোগ, বোমাবাজি, হামলা, ভাঙচুর ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করলেই সমুচিত জবাব দেওয়া হবে।'
এসব বক্তব্যের ফল দেখা যাচ্ছে মাঠে। ২২ আগস্ট থেকে সারাদেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিএনপির বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৫০টির বেশি স্থানে হামলা করা হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৩০০ নেতাকর্মী। গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে। ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে অন্তত ২০টি স্থানে। এসব ঘটনায় মামলা করা হয়েছে ১৫টির বেশি; আসামি করা হয়েছে প্রায় ১ হাজার নেতাকর্মীকে।
এর আগে ভোলায় একই ধরনের কর্মসূচিতে পুলিশ হামলা করে দু'জন বিএনপি কর্মীকে হত্যা এবং অনেককে আহত করলেও এই দফায় হামলা করছে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনগুলো। বিএনপির কর্মসূচিতে কোনো রকম সহিংসতা বা নাশকতা হয়েছে- এমন অভিযোগ ছাড়াই হয়েছে এসব হামলা। যদি তেমন ঘটনা ঘটত, সেটা ঠেকানোর দায়িত্ব কি আওয়ামী লীগের?
দেশের নাগরিকের করের অর্থে প্রতিপালিত পুলিশ বাহিনী রয়েছে তাদের সুরক্ষার জন্য। অবশ্য বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনী আছে- কথাটা তাত্ত্বিকভাবে বলা হলেও কার্যত বহুলাংশে সরকারি দলের ক্রীড়নকে পরিণত। বাহিনীটির অনেক সদস্যের প্রধান কাজ হচ্ছে দমন-পীড়নের মাধ্যমে বিরোধী দলকে এমনভাবে কোণঠাসা করে ফেলা, যেন ক্ষমতা ধরে রাখতে সরকারের পথে কোনো বাধা সৃষ্টি না হয়। এই বাস্তবতার পরও আমরা নিশ্চয় বুঝি দেশে, যে কেউ যে কোনো ধরনের সহিংসতা বা নাশকতা করলে বা করার চেষ্টা করলে সেটা প্রতিরোধ করার দায়িত্ব পুলিশসহ অন্য সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরই।

আমাদের বুঝতে হবে- মাঠে থেকে, মাঠ দখলে রেখে বিরোধী দলকে 'সমুচিত জবাব দেওয়া' ধরনের মন্তব্য বেআইনি এবং অসাংবিধানিক। এই দেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চালু থাকলে এসব বক্তব্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো। প্রশ্ন হচ্ছে- সরকারি দল এতটা আক্রমণাত্মক এবং মরিয়া কেন?
কয়েক মাস আগে র্যাব এবং এর সাবেক ও বর্তমান কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর থেকে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের কথা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেই আলোচনায় এসেছে। তারপর বাংলাদেশে এলেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট। তিনি প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করে এবং গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে বাক-স্বাধীনতা হরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। সর্বক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব জবাব দেওয়া হয়েছে, সেগুলো যে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি- সেটা স্পষ্ট ছিল বাংলাদেশ ছাড়ার আগে সাংবাদিকদের সামনে তাঁর পঠিত বক্তব্যে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে কঠোর আন্তর্জাতিক নজরদারির মধ্যে থাকার কারণে বিরোধী দলের ওপরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে আগের মতো ক্র্যাকডাউন চালানো সম্ভব হবে না। এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চরম ঊর্ধ্বগতিতে সংক্ষুব্ধ মানুষ যদি বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে একাত্ম হয়ে মাঠে নেমে যায়, তাহলে সরকারের পক্ষে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। পরিস্থিতি পুরোপুরি তুলনীয় না হলেও শ্রীলঙ্কা নিশ্চয় সরকারকে ভীত করেছে।
সরকারি দলের হাতে একমাত্র অপশন হচ্ছে নিজেরাই বিএনপিকে 'সমুচিত জবাব' দেওয়া। ইউনিফর্মহীন মানুষ দিয়ে হতাহত করে কর্মসূচি পণ্ড করার পর বিএনপির নিজেদের মধ্যে কোন্দলের কারণে এসব হয়েছে জাতীয় বিবৃতি দিয়ে দায় সারার সুযোগ তৈরি করা।
কিন্তু বিষয়টি কি এতই সহজ? মনে আছে, ২০২১ সালের মার্চ মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। এর প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলাম মাঠে নামে। ২৬ মার্চ বায়তুল মোকাররমে আয়োজিত বিক্ষোভে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা (মূলত ছাত্রলীগ) হামলা চালায়। পরে পুলিশসহ ত্রিমুখী সংঘর্ষে আহত হন অনেকেই। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
হেফাজতে ইসলাম সংগঠনটির নীতি-আদর্শ, কর্মকাণ্ড এবং অরাজনৈতিক সংগঠনের মোড়কে যে রাজনীতি; তার বিরোধী আমি। প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের কর্মসূচিতে ক্ষমতাসীন দল কেন হামলা করবে? তারা নাশকতা করলেও সেটা ঠেকানোর দায়িত্ব কি সরকারি দলের? এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে। বস্তুত বায়তুল মোকাররমে হেফাজতের কর্মসূচিতে ছাত্রলীগ হামলা না করলে ওই সময় কি সারাদেশে পরিস্থিতি ততটা খারাপ হতো?
হেফাজতের ওই ঘটনার দেড় বছর পর বিএনপির কর্মসূচিতে সরকারি দলের হামলার মধ্য দিয়ে কি আরেকটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে? দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করার মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা কি আরেকবার লাভবান হতে চায়?
ডা. জাহেদ উর রহমান: শিক্ষক ও নাগরিক অধিকারকর্মী
- বিষয় :
- রাজনীতি
- জাহেদ উর রহমান
