সমকালীন প্রসঙ্গ
সিলেটের বিস্মৃত-প্রায় গণভোটের সাম্প্রতিক তাৎপর্য
ইনাম আহমদ চৌধুরী
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০
বর্তমানে বিজেপি শাসনামলে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মতো আসামেও বেশকিছু ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যেমন সাম্প্রদায়িকতামূলক জাতীয়তা আইন। সাম্প্রতিক গো-সুরক্ষা আইনের অর্থ আসামে বন্ধ হলো গরুর ব্যবসা, গরু জবাই করা ও খাওয়া। হিন্দুসহ অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায়ের বাসস্থানের আশপাশে এবং যে কোনো অমুসলিম কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে গো-মাংস কেনাবেচা, জবাই দেওয়া বা ভক্ষণ সম্পূর্ণ বন্ধ। ভুলক্রমে তা যদি কখনও হয় বা কোনোরকম সন্দেহ করা হয়, তাহলে অহেতুক হলেও সন্দেহভাজনকে অথবা আন্তঃধর্মীয় প্রেমে মুসলিম-হিন্দু বিয়ে হলে তাকে 'লাভজিহাদ' আখ্যা দিয়ে সংশ্নিষ্টদের বিশেষ করে বর মুসলিম হলে তাকে কী ধরনের বিচারবহির্ভূত কখনও-বা গণপিটুনিসহ শাস্তি প্রদান করা হয়, তা আমরা ভারতের কোনো কোনো স্থানে লক্ষ্য করেছি।
আসামে যেখানে ৩৫ শতাংশ মুসলমান, সেখানে এ ধরনের অবস্থা বা আইন যে কত বড়মাপের সমস্যা বা বিপদের সৃষ্টি করবে, তা সহজেই অনুমেয়। গত ১৩ আগস্ট (শুক্রবার ২০২১) আসামের বিধানসভায় বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, 'মহাত্মা গান্ধী বলে গেছেন- গো-সুরক্ষাই বিশ্বকে হিন্দুত্বের সবচেয়ে বড় উপহার। যে যত বড় তিলকই কাটুক না কেন, হিন্দুদের শেষ পর্যন্ত বিচার করা হবে তারা গো-মাতার সুরক্ষা দিতে পেরেছে কিনা তা নিয়ে।' (প্রথম আলো ১৫ আগস্ট ২০২১)। অবস্থা যে কী পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, এ বক্তব্য থেকেই তা সুপরিস্ম্ফুট। অথচ এমন হওয়ার কথা যে ছিল না, তা বোঝার জন্য ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের দিকে।
১৯৪৭ সাল। ভারতবর্ষের ভাইসরয় এবং গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ৩ জুনের স্বাধীনতা ও দেশভাগের ঘোষণা দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ গ্রহণ করার পর সম্ভাব্য কর্ম-নির্ঘণ্ট নিয়ে আর কোনো সংশয় থাকল না। তারিখ নির্ধারিত হলো- ১৪ আগস্ট করাচিতে পাকিস্তানের এবং ১৪-১৫ আগস্ট মধ্যরাতে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে যা ১৫ আগস্ট, দিল্লিতে হস্তান্তরিত হবে দুই দেশের শাসনভার। ঘোষিত হবে তাদের স্বাধীনতা। যদিও তারা আপাতত ডোমিনিয়ন মর্যাদায় কমনওয়েলথের সদস্য থাকবে, তবুও যে কোনো সময় তারা স্বেচ্ছায় ওই গণ্ডি থেকে বেরোতে পারবে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি মেনে নেওয়া হলেও যা প্রদত্ত হলো তা পাকিস্তানের খণ্ডাংশ। মুসলিম লীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও স্থির হলো পাঞ্জাব ও বাংলা দ্বিধাবিভক্ত হবে- কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের এবং পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ। লাহোরসহ পশ্চিম পাঞ্জাব পাকিস্তানে এবং পূর্ব পাঞ্জাব ভারতে। দাবি অনুযায়ী যদিও একক সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত আসামের পাকিস্তানের থাকার কথা; কিন্তু ঘোষিত হলো- আসাম থাকবে ভারতে। শুধু আসামের সিলেট জেলা এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে গণভোটে (রেফারেন্ডাম) নির্ধারিত হবে তারা পাকিস্তানে, না ভারতে যোগদান করবে।
সেই কর্মসূচি অনুযায়ী নির্ধারিত হলো সিলেটের গণভোট হবে ৬ ও ৭ জুলাই ১৯৪৭। সময় সংক্ষিপ্ত। পাকিস্তান ও ভারতভুক্তির সমর্থকরা অবিলম্বে তোড়জোড় শুরু করলেন ভোটারদের তাদের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য। কংগ্রেসের প্রচুর সম্পদ ও লোকবল ছিল। তারা সহজেই তাদের প্রচারকার্য শুরু করে দিল। মাসওয়ারি অর্থ সাহায্যও ত্বরিত এলো। মুসলিম লীগের প্রস্তুতি তেমন ছিল না। তা ছাড়া মুসলিম সমাজে কিছুটা বিভক্তি ছিল। জমিয়তে উলামা এবং কংগ্রেসি মুসলিমরা ভারতে থেকে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। তা ছাড়া আশঙ্কা ছিল, মুসলিম মহিলা সমাজ ভোটের দিন প্রকাশ্যে বেরিয়ে এসে সবাই ভোট দিতে আসবেন কিনা। প্রচারের দিক থেকে সাংগঠনিকভাবে মুসলিম মহিলাদের মধ্যে যথেষ্ট দুর্বলতা ছিল। যদিও বেগম জোবেদা রহিম চৌধুরী, বেগম সিরাজুন্নেছা চৌধুরী, ফখরুন্নেছা মতিন চৌধুরী, সৈয়দা শাহের বানু এবং আরও কারও কারও নেতৃত্বে মুসলিম নারী সমাজ অল্প সময়েই যথেষ্ট সংগঠিত হচ্ছিল। অভাব ছিল কর্মী স্বেচ্ছাসেবীদের। ঠিক হলো, জেলার বাইরে থেকে স্বেচ্ছাসেবী মুসলিম তরুণীরা সম্ভব হলে যোগ দেবেন। এত কম সময়ে খুব বেশি সাড়া পাওয়া গেল না। তবে কলকাতা থেকে দু-তিনজন এলেন। তাদের মধ্যে একজন তরুণ নেত্রী ছিলেন- নাম বেগম জেরিনা রশীদ। তিনি সিভিল সার্ভিসের তরুণ অফিসার আবদুর রশীদের স্ত্রী। সরকারি কর্মকর্তাদের সেকালে রাজনৈতিক-সংশ্নিষ্টতা পরিহার্য ছিল। তবুও ঝুঁকি নিয়ে এলেন জেরিনা রশীদ। এসেই তিনি কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে একযোগে প্রচার- গৃহে গৃহে যোগাযোগ; পর্দানশীন মহিলাদের বাইরে এনে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করা। ভোটারদের বোঝানো হলো- এই ভোট সাধারণ ভোট নয়; জীবন-মরণ, অস্তিত্ব-স্বাধীনতার প্রশ্ন এখানে জড়িত। অচেনা জায়গা, অপরিচিত পরিবেশ। কিন্তু এত অসুবিধা এবং দুর্লঙ্ঘ্য বাধা সত্ত্বেও জেরিনা রশীদ অদম্য। অতীব উৎসাহ নিয়ে তিনি অন্যদের সঙ্গে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে থাকলেন। প্রভূত উদ্দীপনার সৃষ্টি হলো। মুসলিম লীগের প্রতীক ছিল কুড়াল, আর কংগ্রেসের কুঁড়েঘর। ৬ ও ৭ জুলাই হলো ভোটের দিন। তদানীন্তন ডিসি এম খুরশীদ আইসিএসকে পাল্টিয়ে রেফারেন্ডামকালীন মি. ডামব্রেক আইসিএসকে ডিসি নিযুক্ত করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের সামগ্রিক চার্জ, ভোট গ্রহণের ব্যবস্থাকরণ, আইনশৃঙ্খলা সবই ডিসির আওতাধীন। গণভোট কমিশনার নিযুক্ত হন মি. এইচ স্টক। ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনার জন্য হিন্দু-মুসলমান সরকারি কর্মকর্তারা (বিশেষ করে অন্য জেলার) নিযুক্ত হন। ওই ধরনের চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতেও সরকারি কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতায় কারও অবিশ্বাস ছিল না। তাদের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা ছিল। ভোট আবার সর্বজনীন ছিল না। গ্রামে যাদের চৌকিদারি ট্যাক্স আট আনা এবং পৌর এলাকায় হোল্ডিং ট্যাক্স নিম্নতম পাঁচ আনা; শুধু তারাই ভোটার। তারপর নূ্যনতম শিক্ষারও এক শর্ত ছিল। সব শর্তেই মুসলমানদের দুর্বলতা ছিল; তবুও সিলেটের পাকিস্তানভুক্তির সমর্থনে এক বিরাট গণজাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল। বাইরে থেকে যেসব মুসলিম লীগ নেতা এসেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন সর্বজনাব লিয়াকত আলী খান, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, চৌধুরী খলিকুজ্জামান, ফজলুর রহমান, নূরুল আমীন, মওলানা আকরম খাঁ, গিয়াসুদ্দিন পাঠান প্রমুখ। তরুণ এবং ছাত্রনেতাদের মধ্যে ছিলেন- ফজলুল কাদের চৌধুরী, শাহ আজিজুর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমান (পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু)। স্থানীয় তরুণদের মধ্যে ছিলেন চৌধুরী এটি মাসুদ, তাসাদ্দুক আহমদ, মোয়াজ্জম আহমদ চৌধুরী, দেওয়ান ফরিদ গাজী, আব্দুস আসাদ আজাদ। স্থানীয় নেতৃবর্গের কেন্দ্রস্থলে ছিলেন আবদুল মতিন চৌধুরী (সভাপতি, মুসলিম লীগ নির্বাচনী কমিটি), অ্যাডভোকেট আবদুল হাফিজ (জেনারেল সেক্রেটারি), আজমল আলি চৌধুরী, মাহমুদ আলি, আমিনুর রশীদ, দেওয়ান বাসিত, আবদুল হামিদ, মোদাব্বের হোসেন চৌধুরী প্রমুখ। কংগ্রেসের পক্ষে নেতাদের মধ্যে ছিলেন বসন্তকুমার দাস, বৈদ্যনাথ মুখার্জী, অক্ষয় কুমার দাস। পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারকদের মধ্যে জিন্নাহ সাহেব প্রেরিত মন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল খুবই ফলপ্রসূ দায়িত্ব পালন করেন। কেননা, তার পাকিস্তানের পক্ষের ওকালতিতে বহু তফসিলি সম্প্রদায়ের ভোট কুড়াল মার্কা বাক্সে পড়ে। আসাম হেরাল্ড পত্রিকার মতে, 'কায়েদে আযম জিন্নাহর দুস্রা মার্চ (১৯৪৬)-এর সিলেট সফর পাকিস্তানের পক্ষে এক বিরাট তরঙ্গের সৃষ্টি করে, যা ক্রমাগত শক্তিধর হতে থাকে, স্লোগানমুখর শোভাযাত্রা- পাকিস্তানের পক্ষে চাঁদ-তারা শোভিত এবং ভারতের পক্ষে কংগ্রেসি তে-রঙা পতাকা; স্লোগান- 'আসামে আর থাকব না, গুলি খেয়ে মরব না'- 'ভাঙ্গা-বঙ্গে যাব না, নালি শাক খাব না' ইত্যাদি দু'দিকের স্লোগানে সিলেটের সর্বত্র মহাগণজাগরণ। মুসলিম লীগের সভা-সমিতিতে আবেগপূর্ণভাবে তুলে ধরা হতো সাম্প্রতিক বিহার-কলকাতায় মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার কথা। বস্তুতপক্ষে বিহারের দাঙ্গা-উপদ্রুত এলাকা থেকে স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপের একজন উল্লেখযোগ্য নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিহার থেকে প্রায় সোজাই সিলেটে দলবল নিয়ে উপস্থিত ছিলেন এবং প্রচারে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

গণভোটে কথা ছিল- সিলেট যদি পাকিস্তানভুক্তির সপক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট দেয়, তাহলে আসামের সিলেট সন্নিহিত মুসলিমপ্রধান এলাকা যেমন হাইলাকান্দি ও শিলচরের একাংশও পাকিস্তানে আসবে। গণভোটে দেখা গেল পাকিস্তানের পক্ষে ২,৩৯,৬২৯ ভোট এবং বিপক্ষে (অর্থাৎ আসামে থাকার পক্ষে) ১,৮৪,০৪১ ভোট। তবুও র্যাডক্লিফের রোয়েদাদে অন্যায়ভাবেই শুধু যে হাইলাকান্দি, শিলচর পাকিস্তানে দেওয়া হলো না, তা নয়; গণভোটের রায় সত্ত্বেও সিলেটের অংশ করিমগঞ্জকেও ভারতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হলো। ওগুলো যদি তখন পাকিস্তানে আসত, তাহলে তা আজ হয়ে দাঁড়াত স্বাধীন বাংলাদেশেরই অঙ্গ। ত্রিপুরা রাজ্যেরও এ জাতীয় সম্ভাবনা থাকত। যদিও জমিয়তে উলামার অবিভক্ত ভারতে থাকা এবং পাকিস্তান-বিরোধিতার জন্য ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে সিলেট ও সিলেটভাষী এলাকার তিনটি আসন থেকে নির্বাচিত আইনসভার তিনজন সদস্য (এমএলএ) গোলাপগঞ্জের মাওলানা আব্দুর রশীদ, কানাইঘাটের মাওলানা ইব্রাহিম চাতুলি এবং হাইলাকান্দি-শিলচরের আবদুল মতলিব মজুমদারকে মন্ত্রিসভায় নিয়ে গোপীনাথ বরদলই স্যার সা'দউল্লার মুসলিম লীগ-প্রাদেশিক সরকারের পরিবর্তে কংগ্রেস-জামাতকে কোয়ালিশন ক্ষমতাসীন করেন। তবুও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সিলেট ও আসামে ক্রমশ বেশ জোরদার হচ্ছিল। ১৯৪৭ সালের ২৪ এপ্রিল সিলেট শহরের মূল কোতোয়ালি থানা থেকে ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে নিয়ে পাকিস্তানের প্রতীক মুসলিম লীগের পতাকা উত্তোলনের শেষ মূহূর্তে ব্রিটিশ সরকারের আদেশাধীন গোর্খা পুলিশ সরাসরি গুলি করলে আলকাছ নামীয় এক তরুণ শহীদ হন। শহীদ আলকাছের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধে এই আত্মত্যাগ দেশে প্রভূত উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। 'শহীদ আলকাছের রক্ত বৃথা যেতে দেব না'- এ স্লোগানের ঢেউ আড়াই মাস-পরবর্তী অনুষ্ঠিত গণভোটে তরঙ্গ সৃষ্টি করে।
তবে গণভোট মোটামুটি সুশৃঙ্খলভাবেই অনুষ্ঠিত হয়। তীব্র প্রতিযোগিতা থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা বা সহিংস মনোভাব ছিল না। আন্তঃসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিগত সম্পর্ক অটুট ছিল এবং মোটামুটি সৌভ্রাতৃত্বের অবস্থা বিরাজ করে। শুধু একটিমাত্র ঘটনা এই নিস্তরঙ্গ পরিবেশে তাৎক্ষণিক আলোড়নের সৃষ্টি করে। ভোটের দুটো দিনেই সিলেটে বেশ বৃষ্টি হয়। এই বৃষ্টি উপেক্ষা করেই সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রের আশপাশে জড়ো ছিলেন।
কলকাতা থেকে আগত স্বেচ্ছাসেবী তরুণী-নেত্রী জেরিনা রশীদ তুমুল উৎসাহ সহকারে কাজ করে যাচ্ছিলেন একটি ভোটকেন্দ্রের পাশে। সেখানে একটি জটলার সৃষ্টি হয়। তখন প্রতিপক্ষের আক্রমণাত্মক কয়েকজন ধাক্কাধাক্কি করে জেরিনা রশীদকে মাটিতে ফেলে দেয় এবং তিনি আহত হন। তাকে অবিলম্বে চিকিৎসাসেবা নিতে হয়। ঘটনাটি সমর্থকদের মধ্যে বিশেষ করে মহিলা মহলে প্রচুর সহানুভূতিমূলক উদ্দীপনার সৃষ্টি করে।
গণভোটকালীন এই দৃশ্যমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি প্রধান কারণ ছিল গণভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো সাম্প্রদায়িক ইস্যু- যেমন ধর্মীয়, যথা হিন্দু, মুসলমান বা ভাষাভিত্তিক, যেমন অসমিয়া-বাংলা ভোটারদের মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি করেনি। জামাতপন্থি এবং কংগ্রেসি বহু মুসলমান ভারতে থাকার পক্ষে এবং তফসিলি হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু হিন্দু পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। এটা প্রায় সর্বজনবিদিত ছিল যে, আসামের গভর্নর স্যার আকবর হায়দারী আইসিএস কংগ্রেসের জোর সমর্থক এবং ভারতপন্থি ছিলেন। অসমীয় হিন্দু মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলই ছিলেন সিলেটের পাকিস্তানভুক্তির তীব্র সমর্থক। এসবের কারণ ছিল সিলেট যদি আসামে থেকে যেত তাহলে আসাম হয়ে দাঁড়াত এক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী প্রধান রাজ্য/প্রদেশ। ওটা হতো বর্তমানের অসমীয় হিন্দুদের আধিপত্যের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। জনশ্রুতি ছিল- গণভোটে সিলেটে পাকিস্তানপন্থিদের বিজয়ের কথা শুনে উল্লসিত মুখ্যমন্ত্রী সহর্ষে উচ্চকণ্ঠ হয়ে বলে উঠেছিলেন- 'হেরি, সিলট চলি গৈল'।
অবশ্য সিলেট তখন পাকিস্তানে না চলে এলে আজ তা স্বাধীন বাংলাদেশের একটি গর্বিত বিভাগ হতো না। ভারতের আসাম প্রদেশের করিমগঞ্জ-বরাক ভ্যালির মতো সম্ভবত একটি সাংঘর্ষিক অবস্থায় থেকে যেতে হতো। সন্তুষ্টির কথা, বাংলাদেশে আমরা অধুনা ভারতের মতো সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মধ্যে না গিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করে চলেছি। বঙ্গবন্ধুর একটি লক্ষ্য- সোনার বাংলার অসাম্প্রদায়িক রূপ- তার সুরক্ষায় আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
সাবেক সচিব; সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদ
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- ইনাম আহমদ চৌধুরী
