ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

গল্প

শিন্মুর বন্ধু

শিন্মুর বন্ধু
×

ছবি এঁকেছেন সাফায়েত সাগর

গল্প লিখেছেন মুস্তাফা মাসুদ

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বা রবি পুতুলটা কোলে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় শিন্মু। বারান্দাজুড়ে সকালের মিষ্টি রোদের ঝিলিক। শিন্মু অবাক চোখে সেই আলোর ঝিকিমিকি 
খেলা দেখে। 
হঠাৎ কে যেন খরখরে গলায় বলে, আপু, আমার নাম টিকু। ওই নারকেল গাছের মাথায় থাকি। মা-বাবার সাথে। 
শিন্মু চমকে ওঠে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে,  কাকের ছোট্ট একটা বাচ্চা। বারান্দার কার্নিশে বসে আছে। শিন্মু বলে, তা ভাই, তোমাকে তো চিনলাম না, এর আগে কখনো দেখিনি! চটপট জবাব দেয় টিকু, কীভাবে দেখবে, আমরা তো কালই এসেছি এখানে। বাসাটাও এখনো বানানো হয়নি ঠিকমতো। 
শিন্মু বলে, এর আগে তোমরা কোথায় 
ছিলে টিকু? 
টিকু নরমগলায় বলে, সে খুব দুঃখের কথা আপু। এর আগে থাকতাম কাঁঠালবাগানের এক পাকুড় গাছে। সুন্দর ঝকঝকে বাসা ছিল। মা, বাবা, আমি আর ছোট একটা বোন। ভারি সুখের জীবন ছিল আমাদের। কিন্তু সে-সুখ বেশিদিন থাকলো না; কান্নায় বুজে আসে টিকুর গলা। 
কেন? কী হয়েছিল? শিন্মু ব্যস্তভাবে জিগ্যেস করে। তখন টিকু বলে, পাকুড় গাছের লাগোয়া একটা দোতলা পুরোনো দালান আছে। গতকাল সেই দালানের ছাদের কার্নিশে এসে বসলো দুটো পায়রা আর দুটো ঘুঘু। কী দেমাগ তাদের! মাথা উঁচু করে ঝুঁটিওয়ালা পায়রাটি বাবাকে বললো, ডার্টি কাক! শোন্, এটা ভদ্রলোকের পাড়া। আমরা এই দালানের কার্নিশে বাসা বানাবো, আর আমার বন্ধু ঘুঘুরা এই গাছে বাসা বানাবে। তোরা নোংরা জাত। পচা-ময়লা খাস। ওয়াক থু! ওয়াক থু! ডার্টি! ভয়ানক ডার্টি তোরা! আজই তোদের এ-গাছ ছাড়তে হবে। না হলে বিপদ হবে।  
শিন্মুর ভারি কান্না পাচ্ছে কাকবাবুর কথা শুনে। টিকুকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে, ভেবে পাচ্ছে না। 
টিকু আবার বলে, বলো তো আপু, আমাদের মধ্যে এতো ভেদাভেদ কেন? তারাও পাখি, আমরাও পাখি। না হয় আমরা তাদের মতো বাবুসাহেব না। কিন্তু পাখিতো! কেন এমন হয়, আপু! 
শিন্মু এ বছর কেজি ওয়ানে উঠেছে। পড়াশোনায় খুবই ভালো। সবাই বলে ওর মাথায় নাকি অনেক বুদ্ধি। কিন্তু ছোট্ট কাকের বাচ্চার এই প্রশ্নের জবাব সে দিতে পারে না। মুখ শুকিয়ে আসে। কেবলই মাথা চুলকায়। 
হঠাৎ মামণির গলা শোনা যায়। শিন্মু সোনা বলে ডাকতে ডাকতে তিনি বারান্দায় আসেন। টিকু তাকে দেখে ভয় পেলো না। সেখানেই বসে থাকল। শিন্মু টিকুকে দেখিয়ে বললো, মা, এই দেখো আমার নতুন বন্ধু। ওর নাম টিকু। ওর সাথে গল্প করছিলাম।
শিন্মুর কথায় মামণি তেমন অবাক হন না। যে মেয়ে ইঁদুর, তেলাপোকা, টিকটিকি আর পিঁপড়েদের সাথে জম্পেশ আড্ডা জমাতে পারে। গল্প করতে পারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, সে কাকের বাচ্চার বন্ধু হবে। তার সাথে গল্প করবে, এ আর এমন কী! মা হেসে বলেন, তাইতো! সুন্দর বাবু তো! 
শিন্মু টিকুদের সব কথা বলে মামণিকে। তারপর প্রশ্ন করে, মামণি, কেন ওরা একে অন্যকে ঘৃণা করে? কেন ওদের নোংরা আর ডার্টি বলে গাছ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো? কেন সবাই সবাইকে ভালোবাসতে পারে না! শিন্মু আর বলতে পারে না। ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলে। মা শিন্মুকে কোলে নিয়ে টিকুর কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ান। তারপর বলেন– শিন্মু সোনা, টিকু সোনা, হিংসা আর ঘৃণা ভারি অন্যায় কাজ। পায়রা-ঘুঘুরাও হয়তো তা বোঝে। বুঝেও সেই অন্যায় কাজ করে। শুধু পশুপাখি কেন, মানুষের মধ্যেও এসব আছে। হিংসা ভেদাভেদ রেষারেষি আছে। এগুলোই অশান্তির মূল। এসব না থাকলে কী চমৎকারই না হতো!
তারপর টিকুকে বলেন, এসো টিকু সোনা, শিন্মুর সাথে সকালের নাশতা 
করবে–এসো। 

আরও পড়ুন

×