ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছোটদের প্রিয় লেখক আখতার হুসেন

ছোটদের প্রিয় লেখক আখতার হুসেন
×

আখতার হুসেন

আশিক মুস্তাফা 

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভালোবাসা

পাশের এই ভাবুকটা তোমাদের অনেক ভালোবাসতেন। তোমাদের জন্য লিখেছেন রাজ্যের ছড়া-কবিতা, রূপকথা, গল্প, উপন্যাসসহ কত কী! নাম তাঁর 
আখতার হুসেন। প্রিয় এই লেখকের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর; নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে। প্রিয় এই লেখক, প্রিয় এই ভাবুক ভাবতে ভাবতে আকাশের দেশে চলে গেলেন ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬। না ফেরার দেশে চলে যাওয়া এই ভাবুকটার প্রতি রইল পৃথিবীর সব ফড়িংয়ের পক্ষ থেকে অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। চলো, প্রিয় এই লেখক সম্পর্কে জানি। আর তাঁর নিজ হাতে লেখা দুটি ছড়া পড়ি...

পাঠ্যবইতে নিশ্চয়ই তাঁর ছড়া পড়েছো। না পড়লে কিংবা তাঁর লেখা মনে না পড়লে মনে করিয়ে দিচ্ছি। এই নাও–
   ‘হ্যারে খবরটা কী উড়ো, 
   শুনতে পেলাম নিখিলপুরের 
   চার চারটে বুড়ো...’
এবার নিশ্চয়ই মনে পড়েছে! এই ছড়াকার কেবল ছড়াই লিখতেন না; তোমাদের জন্য অনেক মজার মজার গল্পও লিখতেন। অনুবাদ আর সম্পাদনাও করেছেন এত্তো এত্তো বই। লিখেছেন নাটক আর গানও। 
১৯৭১ সালের কথা, চারদিকে চলছে যুদ্ধ আর তিনি ভাবতে থাকেন দেশের স্বাধীনতা নিয়ে। ভাবতে ভাবতে একটা সুন্দর গান লিখে ফেলেন। ‘স্বাধীন স্বাধীন’ শিরোনামে সেই গান আবার ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। শুধু তাই নয়; স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত প্রথম স্বাধীনতার গান হিসেবে পরিচিতিও 
পেয়ে যায় গানটি!
ভাষা নিয়েও ছিল তাঁর বিস্তর জানাশোনা। তাঁকে ভাষার পণ্ডিতও বলা যেতে পারে! কোনো শব্দ নিয়ে খটকা লাগলে তাঁকে ফোন দিলেই পাওয়া যেত সমাধান। ঘাসফড়িং-এ লেখা দিতেন ফোনে। বলবে, সে আবার কেমন করে? বলছি শোনো, তিনি একটা ছড়া লিখলেন। তারপর ফোন দিয়ে বলতেন, ‘কাগজ-কলম হাতের 
কাছে আছে?’
কাগজ-কলম নিতাম। তারপর তিনি ছড়াটা বলতেন। আমি লিখতাম। লেখা শেষে তিনি ফের ছড়াটা শুনতেন। শুনে কোন শব্দ দীর্ঘ ঈ-কার, কোন শব্দ হ্রস্ব ই-কার হবে, তা বুঝিয়ে বলতেন। কোনো বানান একটু জটিল হলে সেটি কেন এমন হলো– এসবও বলতেন নিজ থেকেই।
সে যাক, অনেক অনেক আগে প্রিয় এই লেখক সোভিয়েত কালচারাল সেন্টারের তথ্য বিভাগে কাজ করতেন অনুবাদক-সম্পাদক হিসেবে।
তখন কত রঙিন রঙিন বই পড়তেন! ভালো লাগা বই তিনি ছোটদের জন্য অনুবাদ করতেন। ছড়া, গল্প, নাটক ও গানের মতো অনুবাদেও তিনি শিশুদের জগৎকে সুন্দর ও সাহসী করে তুলতেন। 
প্রিয় এই লেখকের নাম আখতার হুসেন। 
তাঁর জন্ম রেল কর্মচারী পিতার কর্মস্থল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আমনুরায়; ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর। যদিও তাঁর পৈতৃক নিবাস নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে। 
পিতার রেলওয়ের চাকরিসূত্রে তাঁর 
শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো কেটেছে খুলনা, গফরগাঁও, কুলাউড়াসহ দেশের নানান জায়গায়। মা আয়শা খাতুনের স্নেহে বেড়ে ওঠা ছোট্ট আখতার হুসেন যেন আজন্ম শেশবেই পড়ে রইলেন! শৈশব আর ছোটদের নিয়েই তাঁর যত কাজ!
তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পের বই হচ্ছে– ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘দি টাইগার ও অন্যান্য গল্প’, ‘যেতে যেতে যেতে’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’; অনুবাদ গল্পের বই হচ্ছে– ‘সাত সাগরের পার’ ও ‘নির্বাচিত কিশোর গল্প’; ছড়ার বই হচ্ছে– ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘সোনায় মোড়া ছড়া’, ‘এক ঘড়া ছড়া’; কিশোর কবিতার বই হচ্ছে– ‘হৈ হৈ রৈ রৈ’, ‘প্রজাপতি ও প্রজাপতি’, ‘আমার দুটো ডানা’ এবং ‘সেই যে আমার প্রাণের মিতে নদী’, ‘সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’, ‘কাজে হব বড়’; উপন্যাস হচ্ছে– ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘নায়ের ছোট্ট মাঝি’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’; নাটিকা হচ্ছে–‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’; জীবনী গ্রন্থের মধ্যে আছে– ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’, ‘ছোটদের জাতির জনক’ ও ‘ছোটদের জোয়ান অব আর্ক’ ইত্যাদি।
লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন ‘আলাওল সাহিত্য পুরস্কার’, ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’, ‘বাংলাদেশ শিশু একাডেমী পুরস্কার’সহ অনেক অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। 
তোমাদের নিয়ে ভাবুক এই লেখক ভাবতে ভাবতে ২৪ সেপ্টেম্বর চলে গেলেন আকাশের দেশে। তাঁর লেখা পড়তে পড়তে এবং তাঁর কথা ভাবতে ভাবতে যদি তাঁর দেখা পেয়ে যাও, তবে বলে দিও সব ফড়িং-এর মন খারাপের কথা। 
আর গভীর রাতে তাঁর দেখা পেতে 
চাইলে আকাশের দেশে খুঁজে নিও প্রিয় 
এই লেখককে। তাঁকে বলে দিও মনের কোণে জমে থাকা কথা! 

আরও পড়ুন

×