আরিশার সময় ধরা
ছবি এঁকেছেন সাফায়েত সাগর
গল্প লিখেছেন রবিউল কমল
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিকেল ৫টা। দাদু আর আরিশা বারান্দায় বসে আছে। দাদুর হাতে একটা গোল ঘড়ি। আরিশার চোখ ঘড়ির কাঁটার দিকে। একটা কাঁটা ধীরে ধীরে ঘুরছে। আরেকটা যেন তার চেয়েও ধীরে হাঁটছে। দাদু বললেন, ‘এখন ঘড়িতে ৫টা বাজে। দেখো, বড় কাঁটাটা আছে বারোর ঘরে। ছোট কাঁটাটা পাঁচের ঘরে।’ আরিশা ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘বড় কাঁটা কোনটা?’
‘যেটা লম্বা।’
‘আর ছোট কাঁটা?’
‘যেটা কম লম্বা।’
আরিশা কিছুক্ষণ চুপ করে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর বলে, ‘আচ্ছা দাদু, ঘড়ির কাঁটা কি হাঁটতে পারে?’
দাদু হেসে বললেন, ‘হাঁটতে পারে তো! তবে পা দিয়ে না। ঘুরে ঘুরে হাঁটে।’
আরিশা বললো, ‘সারাদিন ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয় না?’
‘না।’
‘খিদে পায় না?’
‘না।’
‘ঘুম পায় না?’
‘না।’
‘বাহ! তাহলে তো ওরা খুব ভালো!’
দাদু হেসে ফেললেন, ‘হ্যাঁ, ওরা খুব ভালো। সারাদিন কাজ করে।’
আরিশা আবার ঘড়ির দিকে তাকালো।
দাদু বললেন, ‘জানো, সময় খুব মূল্যবান।’
‘সময় কি খুব দামি?’
‘খুউউউব দামি!’
‘কতো টাকা?’
দাদু হাসেন। আর বললেন, ‘টাকা দিয়ে তো সময় কেনা যায় না।’
আরিশা একটু অবাক হলো। টাকা দিয়ে দামি দামি গাড়ি কেনা যায়, আর সময় কেনা যায় না; তাই আবার হয় নাকি!
দাদু বললেন, ‘জীবনে সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে সময়ের মূল্য বুঝতে পারে এবং সময়মতো কাজ করতে পারে, সে অনেক বড়ো হয়।’
আরিশা চোখ গোল গোল করে বললো, ‘আমিও বড়ো হতে চাই।’
‘তাহলে সময়কে ধরতে হবে।’
‘সময় ধরলেই বড়ো হয়ে যাবো?’
‘হ্যাঁ!’
পরদিন সকালে বাড়ির সবাই ব্যস্ত। মা রান্নাঘরে নাশতা তৈরি করছেন। বাবা অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছেন। দাদু বারান্দায় পত্রিকা পড়ছেন। হঠাৎ আরিশার ঘর থেকে চিৎকার–‘এই! দাঁড়াও! দাঁড়াও! পালিও না!’
মা রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন। আরিশা একটা চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এক হাতে দেয়াল ঘড়ি। আরেক হাত দিয়ে ঘড়ির কাঁটা ধরার চেষ্টা করছে।
মা ভয় পেয়ে বললেন, ‘আরিশা! তুমি চেয়ারের ওপর কেন?’
আরিশা বললো, ‘চুপ করো, দেখছো না সময় পালিয়ে যাচ্ছে!’
‘কী! সময় পালিয়ে যাচ্ছে?’
‘হ্যাঁ, সময় ধরতে পারছি না!’
মা কিছুই বুঝতে পারলেন না।
‘তুমি ঘড়ির কাঁটা ধরছো কেন?’
আরিশা বললো, ‘না! আমি সময়কে ধরছি!’
ঠিক তখনই দাদু এসে বললেন, ‘কী ব্যাপার?’
আরিশা বললো, ‘দাদু, তুমি বলেছিলে সময়কে ধরতে হয়।’
‘হ্যাঁ, বলেছিলাম।’
‘আমি তো ধরার চেষ্টা করছি। কিন্তু সময় খুব দুষ্টুমি করছে!’
দাদু অবাক! ‘সময় কেন দুষ্টুমি করবে?’
‘আমি যতবার ধরতে যাই, কাঁটাগুলো পালিয়ে যায়!’ দাদু ঘড়ির দিকে তাকালেন। তারপর আরিশার দিকে। তারপর মায়ের দিকে।
হো হো হেসে বলেন, ‘আরিশা, সময় ধরা মানে ঘড়ির কাঁটা ধরা না; সময়কে ধরার মানে হলো সময় নষ্ট না করা। মানে যখন পড়ার সময় হবে, তখন পড়বে। যখন খাওয়ার সময়, তখন খাবে। স্কুলে যাওয়ার সময় হলে সময়মতো তৈরি হবে। খেলাধুলার সময় খেলবে। এভাবে সময়রে কাজ সময়ে করাই হচ্ছে সময় ধরা যায়।’
সেদিন থেকে আরিশা সময়মতো কাজ করার চেষ্টা শুরু করেছে। প্রথম দিন সকাল ৭টায় মা বললেন, ‘আরিশা, ওঠো। স্কুলে যাওয়ার সময় হয়েছে।’
আরিশা চোখ না খুলেই বলল, ‘আর পাঁচ মিনিট।’ মা বললেন, ‘ঠিক আছে।’
পাঁচ মিনিট পর, ‘আরিশা, ওঠো।’
‘আর দুই মিনিট।’
আরও দুই মিনিট পর, ‘আরিশা!’
আরিশা লাফ দিয়ে উঠে বললো, ‘ও মা! সময় কোথায় গেলো।’
মা হেসে বললেন, ‘সময়কে তো ধরতে যাওনি আজ!’ আরিশা বিছানা থেকে নেমে বললো, ‘কাল থেকে ঠিকই ধরবো।’
পরদিন আরিশা নিজেই অ্যালার্ম দিয়ে রাখলো। অ্যালার্ম বাজতেই বললো, ‘উঠে পড়ো আরিশা, সময় নষ্ট করা যাবে না!’
তারপর উঠে দাঁত মাজলো। মুখ ধুলো।
জামা পরলো। ব্যাগ গোছালো। নাশতা খেলো। স্কুলে গেলো। রাতে সময়মতো বিছানায় গেলো।
আরিশা চোখ বন্ধ করলো। ঘরের
দেয়ালঘড়ির কাঁটাগুলো ঘুরছে টিক টিক টিক টিক!
- বিষয় :
- গল্প