স্বাস্থ্য
আবারও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ হচ্ছে
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৪ | আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
অন্তর্বর্তী সরকার সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ সহজলভ্য করতে ২৯৫টি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করেছিল। তবে আগের সরকারের রেখে যাওয়া তালিকা কার্যকর না করে বিএনপি সরকার নতুন করে তালিকাটি হালনাগাদের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে ২২ সদস্যের জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এই কাউন্সিলের নেতৃত্ব দেবেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গত রোববার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।
পরিষদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে নতুন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন এবং তা দুই বছর অন্তর হালনাগাদ করা। এছাড়া কমিটি বছরে অন্তত দুইবার বৈঠক করবে এবং প্রয়োজনে নতুন সদস্য নিতে পারবে।
পরিষদের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী সমকালকে জানান, তারা আগের তালিকা পর্যালোচনা করে সব দিক বিবেচনায় নিয়ে নতুন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করবেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন গঠিত পরিষদে শিল্প খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়েছে। স্বাস্থ্য সচিব বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে একাধিক মামলা ও পাল্টা মামলা হয়েছে। তিনি জানান, পরিষদ গঠনে সব প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ও বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আগে স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়াতে টাস্কফোর্সে ওষুধশিল্পের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। তবে এবার বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। যদিও অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএআইএমএ) কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে অন্তর্বতী সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ করে। আগে এ তালিকায় ছিল ১১৭টি ওষুধ; সেখানে আরও ১৭৮টি ওষুধ যুক্ত করা হয়। ফলে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯৫। এর আগে ৮ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে তালিকাটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেছিলেন, নতুন তালিকার ২৯৫টি ওষুধ দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার চাহিদা পূরণ করতে পারবে। একই সঙ্গে এগুলো দেশের মানুষের ৮০ শতাংশ রোগের চিকিৎসায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
গেজেটে সে সময় উল্লেখ করা হয়, নতুন নীতিতে ওষুধের দাম নির্ধারণে বিজ্ঞানভিত্তিক কাঠামো, উৎপাদনকারীদের জন্য বাধ্যবাধকতা এবং বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করার কঠোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিটি ওষুধ কোম্পানিকে তাদের মোট বার্ষিক বিক্রয়ের অন্তত ২৫ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ করতে হবে। এ নিয়ম না মানলে নতুন ওষুধের অনুমোদন বন্ধ থাকবে। এছাড়া নতুন জেনেরিক ওষুধের ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তুলনায় সর্বোচ্চ ৩৩ শতাংশ মার্ক-আপ (খুচরা বিক্রয়মূল্য) নির্ধারণ করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইকিউভিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ৪৪ টাকা ব্যয় হয় শুধু ওষুধের পেছনে। যেখানে বৈশ্বিক গড় ১৫ শতাংশ। ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ওষুধের উচ্চমূল্যের কারণে প্রায় ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন।
২০১৬ সালে অ্যান্টিবায়োটিক, নিউমোনিয়া, সর্দি-জ্বর, উচ্চ রক্তচাপ, গ্যাস্ট্রিক আলসার, কৃমিনাশক, ব্যথানাশক, হাঁপানি, ভিটামিনসহ ২৮৬টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করা হয়। তবে তখন মাত্র ১১৭টি ওষুধের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রতিবছর তালিকা হালনাগাদ করার কথা থাকলেও গত ১০ বছরে কার্যক্রম তদারকি করা হয়নি।
নতুন জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পরিষদে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব, শিক্ষক এবং ওষুধশিল্পের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিটিতে এফবিসিসিআই, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই) এবং বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটির সভাপতিকেও রাখা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘প্রস্তুতকৃত তালিকা সরকার চাইলে বাস্তবায়ন করতে পারবে। তবে সরকার প্রয়োজন মনে করেছে যে এটি হালনাগাদ করবে। এটি অবশ্যই করতে পারে। তবে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম এমনভাবে নির্ধারণ হোক, যাতে রোগী ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান লাভবান হয়। যেভাবে হোক এ তালিকার বাস্তবায়ন জরুরি। কারণ এর মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। এজন্য উপযুক্ত আইনি কাঠামোর আওতায় ওষুধ প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।’
