ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশ্লেষণ

‘কাগুজে বাঘ’: ট্রাম্পের ক্ষোভে কতটা ভুগবে ন্যাটো

‘কাগুজে বাঘ’: ট্রাম্পের ক্ষোভে কতটা ভুগবে ন্যাটো
×

ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বের হয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

এএফপি

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ১৭:৫২ | আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:২১

ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব সামলাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হিমশিম খাচ্ছেন, তখন তাঁর ক্ষোভের বড় অংশ অন্য একটি লক্ষ্যের দিকে ঘুরে গেছে। সেটি হলো উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর সামরিক ও রাজনৈতিক জোট- ন্যাটো।

ইউরোপীয় মিত্ররা ট্রাম্পের এই যুদ্ধে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। হরমুজ প্রণালি সচলের আহ্বানেও সাড়া দেননি। সম্প্রতি সামরিক ঘাঁটি ও মার্কিন যুদ্ধবিমানের জন্য নিজেদের আকাশসীমাও বন্ধ করেছে। এ অবস্থায় ট্রাম্পের সুর দিন দিন আরও হুমকিমূলক হয়ে উঠছে।

বুধবার দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি কখনোই ন্যাটোর ওপর খুব একটা ভরসা করিনি। আমি সবসময়ই জানতাম তারা একটি কাগুজে বাঘ।’ যুক্তরাষ্ট্রকে এই জোট থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো থেকে বেরিয়ে গেলে ৭৭ বছরের পুরোনো এই সামরিক জোট অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়তে পারে। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর জোটটি একাধিকবার জটিলতার মুখে পড়েছে। সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তিনি ন্যাটো মিত্রদের ‘ভীতু’ বলেও তাচ্ছিল্য করেছেন। 

কয়েক মাস আগে ন্যাটোর সদস্য ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়ে ন্যাটোর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। যদিও পরে তিনি সে অবস্থান থেকে সরে যান। এর আগে তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনকে দেওয়া সহায়তা বারবার বন্ধ করেছেন। প্রতিরক্ষা ব্যয় না বাড়ালে মিত্রদের রক্ষা না করার হুমকিও দিয়েছেন। হুঁশিয়ারি দেন ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের।

আগের সংকটগুলো সময়ের সঙ্গে কেটে গেলেও এবারের ক্ষত শুকানো নিয়ে মার্কিন মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ন্যাটোর একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপিকে বলেছেন, ‘দিন দিন পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠছে।’

ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদেও ন্যাটোকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ অ্যাখ্যা দিয়ে জোট ত্যাগের চিন্তা করেছিলেন। এবারের উদ্বেগের বড় কারণ হলো- ট্রাম্প শুধু একা নন বরং ওয়াশিংটনের অন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও ন্যাটোর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন।

গত মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশ তাদের মাটিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে ন্যাটোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। ফক্স নিউজকে রুবিও বলেন, ‘ঘাঁটি ব্যবহারের প্রয়োজনের সময় তাদের নেতিবাচক উত্তরের পরও কেন আমরা ন্যাটোতে আছি?’

ন্যাটোতে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইভো ডাল্ডার বলছেন, ‘জোটের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। বর্তমান অবচলাবস্থা সেই বিশ্বাসের জায়গাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।’ বারাক ওবামার আমলে ন্যাটোতে দায়িত্ব পালন করা ডাল্ডার এক পোস্টে লিখেন, গত দুই সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ ট্রাম্প ও ইউরোপীয় মিত্রদের সম্পর্ককে ‘ফুটন্ত বিন্দুতে’ নিয়ে গেছে। এটি ন্যাটোর ইতিহাসে সবচাইতে বড় সংকট।

আগের চেয়েও শক্তিশালী?
গত বছর ন্যাটোর সম্মেলনে ট্রাম্পকে খুশি রাখতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোসহ নানা প্রতিশ্রুতি দেন ইউরোপীয় মিত্ররা। কিন্তু ইরান ইস্যুতে এখন আর তারা আপস করতে রাজি নয় বলে মনে হচ্ছে।

যেহেতু এই যুদ্ধ শুরু করার আগে ট্রাম্প তাঁদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেননি, তাই বর্তমানে সৃষ্ট সমস্যাগুলো সমাধানে সহায়তা করতে বা ঝামেলায় জড়াতে তাঁদের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। অনেক হতাশাবাদী মনে করছেন, এই মতপার্থক্য জোটের মধ্যে একটি ফাটল তৈরি করছে। তবে কেউ কেউ জোর দিয়ে বলছেন, ন্যাটো সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বুধবার বলেছেন, ‘এটি আমাদের বহু দশক ধরে নিরাপদ রেখেছে। আমরা ন্যাটোর প্রতি সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ ট্রাম্পকে শান্ত রাখতে এরইমধ্যে দক্ষ ব্যক্তির খেতাব পেয়েছেন ন্যাটো প্রধান মার্ক রুটে। গত সপ্তাহে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ন্যাটো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।’

‘রোলার-কোস্টার’
আগামী জুলাই মাসে তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটোর পরবর্তী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। তখন জোটের জন্য একটি বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। অনেকে আশা করছেন, ততদিনে হয়তো এখনকার তিক্ততা কিছুটা কমে আসবে।

তবে বর্তমান তিক্ততা মিটে গেলেও, ট্রাম্প যতদিন ক্ষমতায় আছেন ততদিন জোটকে আরও বড় ধরনের অস্থিরতার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক ফেলো জন ডেনি এএফপিকে বলেন, ‘আমি এটিকে স্থায়ী সংকট বলব না। তবে আগামী তিন বছর বা তারও বেশি সময় জোটটি এক ধরনের রোলার-কোস্টার রাইডের মধ্য দিয়ে যাবে।’

ইউরোপীয় মিত্রদের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প একটি মৌলিক সত্যকে সামনে এনেছেন। সেটি হলো- নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন নিজেদের হাতেই নিতে হবে। ফ্রান্সের সশস্ত্র বাহিনীবিষয়ক মন্ত্রী অ্যালিস রুফো বলছেন, ‘আমরা চাই জোটের ভেতরে থেকেই ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হোক। সেটি হলেই নির্ভরযোগ্যতা ও বিশ্বাস বাড়বে।’

আরও পড়ুন

×