নজরুল পত্রে প্রেমের শিল্পরূপ
হাফিজ রহমান
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৯ | আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
কাজী নজরুল ইসলামের মতো কবি ও দার্শনিকরা দীর্ঘকাল প্রেমের প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ প্রেমকে একটি গুণ হিসেবে দেখেছেন যে গুণ নৈতিক বিকাশ এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নে উৎসাহিত করে। অন্যরা এটিকে একটি মৌলিক শক্তি হিসেবে গণ্য করেছেন যে শক্তি ব্যক্তি ও সম্প্রদায়কে সংযুক্ত করে।
প্রেম শব্দটি সাংস্কৃতিক। ‘প্রেম’ শব্দের প্রকৃতি ও প্রত্যয় হলো: প্রিয় + ইমন (ইমন্) = প্রেম। ইমন তদ্ধিত প্রত্যয়। সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মানুযায়ী, ‘প্রিয়’ শব্দের সাথে ‘ইমন’ প্রত্যয় যুক্ত হলে ‘প্রিয়’ শব্দটির স্থলে ‘প্র’ হয় এবং আদি স্বরের গুণ হয়ে ‘প্রেম’ শব্দটি গঠিত হয়। সংগীতের ভাষায় ‘ইমন’ একটি রাগ। এটি প্রেমের রাগ। একে কল্যাণ নামেও ডাকা হয়। বস্তুত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয়, সুমধুর ও ব্যাপক ব্যবহৃত ও প্রচলিত রাগ এটি। উচ্চাঙ্গ সংগীত শেখার শুরুতে সাধারণত এই রাগ দিয়েই শিক্ষার্থীদের গায়কি বা বাদ্য-বাজনার হাতেখড়ি হয়। এটি মূলত শান্ত, স্নিগ্ধ এবং গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। প্রেমের ক্ষেত্রে এই গাম্ভীর্য মূলত প্রেমের পথ সহজ নয়, এমন একটি ধারণাকে প্রোথিত করে। এই রাগে সব স্বর শুদ্ধ, কেবল মধ্যম স্বরটি তীব্র। এই হিসেবে একসময় প্রেম শুদ্ধই ছিল, কিন্তু এখন তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। এই রাগের জাতি আরোহ-অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ। অর্থাৎ আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই সাতটি স্বরই অবিকৃত রূপে ব্যবহৃত হয়। প্রেমের ক্ষেত্রেও কোনো কিছু অপূর্ণ থাকলে পরিপূর্ণ সুখী হওয়া যায় না। এই রাগের গীত সময়– রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত গাওয়ার উপযুক্ত সময়)। এর প্রধান রস-শান্ত, ভক্তি এবং শৃঙ্গার (প্রেম) রস। শান্ত-নম্র-ভদ্র স্বভাব এবং প্রেমাস্পদের প্রতি নির্ভেজাল ভক্তিই প্রেমের রসে রূপান্তরিত। ইমন রাগের সাথে স্রষ্টাভক্তির যেমন অনাবিল সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানব-মানবীর প্রেমও। এই রাগের তীব্র মধ্যম প্রেমে জাদুর ছোঁয়ার মতো কাজ করে। ভারতীয় উপমহাদেশের বা বাংলা সিনেমার বেশির ভাগ রোমান্টিক বা ভক্তিভীতিমূলক জনপ্রিয় গান রাগ ইমনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সন্ধ্যা নামার মুখে এই রাগের আলাপ বা বিস্তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়। ভালোবাসা প্রকাশে প্রেম শব্দটি অত্যন্ত কার্যকর।
সাহিত্য-সংস্কৃতি বা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় প্রাচীন গ্রিক ছিল সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রসর। প্রাচীন গ্রিক চিন্তাধারায়, প্রেম-ভালোবাসার বিভিন্ন রূপ বর্ণনা করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হতো। ‘ইরোস’ বলতে বোঝাত তীব্র বা রোমান্টিক ভালোবাসা, ‘ফিলিয়া’ বলতে বোঝাত বন্ধুত্ব ও স্নেহ, এবং ‘আগাপে’ বোঝাত নিঃস্বার্থ, শর্তহীন ভালোবাসা। এই পার্থক্যগুলো মানুষের স্নেহ ও আসক্তির বহুবিধ দিক তুলে ধরে।
গ্রিক শব্দ ‘ইরোস’ দ্বারা রোমান্টিক ভালোবাসা পরিচিত। সম্ভবত ভালোবাসার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও স্বীকৃত রূপ। এর মধ্যে দুজন ব্যক্তির মধ্যে গভীর মানসিক আকর্ষণ, স্নেহ, আবেগ এবং আকাঙ্ক্ষা জড়িত থাকে। রোমান্টিক ভালোবাসা সাধারণত এমন সঙ্গীদের সম্পর্কের সাথে যুক্ত, যারা মানসিক এবং শারীরিক ঘনিষ্ঠতা ভাগ করে নেয়। এই ধরনের ভালোবাসা অবুঝ আকর্ষণ দিয়ে শুরু হয়। একজন ব্যক্তি অন্যের চেহারা, ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা বা চরিত্রের প্রশংসা করতে পারেন। সময়ের সাথে সাথে এই আকর্ষণ একটি গভীর মানসিক সংযোগে পরিণত হতে পারে, যার বৈশিষ্ট্য হলো বিশ্বাস, প্রতিশ্রুতি ও সাহচর্য। রোমান্টিক ভালোবাসার মধ্যে সাধারণত অন্তর্ভুক্ত থাকে মানসিক ঘনিষ্ঠতা, শারীরিক আকর্ষণ, আবেগ, প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা, পারস্পরিক সমর্থন। সুস্থ রোমান্টিক ভালোবাসার জন্য শুধু তীব্র অনুভূতিই যথেষ্ট নয়। এটি নির্ভর করে শ্রদ্ধা, যোগাযোগ, বিশ্বাস এবং একে অপরের সাথে বোঝাপড়ার ওপর। যদিও সময়ের সাথে সাথে আবেগের তারতম্য হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী রোমান্টিক সম্পর্কগুলো বন্ধুত্ব, আনুগত্য এবং অভিন্ন মূল্যবোধের দ্বারা টিকে থাকে। মানব ইতিহাস জুড়ে রোমান্টিক ভালোবাসা অগণিত কবিতা, উপন্যাস, গান এবং শিল্পকর্মকে অনুপ্রাণিত করেছে, কারণ এটি তীব্র আবেগ এবং জীবন পরিবর্তনকারী অভিজ্ঞতার সাথে জড়িত। কবি নজরুলের জীবনেও নার্গিস আসার খানমের আগমন এমনি একটি ঘটনা।
২৩ জুন ১৯২১ সালের বিকেল বেলা কবি নজরুল নার্গিসের মামা আলী আকবর খানকে একটি পত্র লেখেন। কাজী নজরুল ইসলামের ‘পত্রাবলি’ থেকে নেওয়া এই অংশটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। এবং কবি-হৃদয়ের গভীর অভিমান, ক্ষোভ ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণার দালিলিক অনন্য দর্পণ। বাইরে যিনি ‘বিদ্রোহী’ ও বজ্রকণ্ঠ, ভেতরে তিনি যে কতটা কোমল এবং নিজের আত্মমর্যাদা বা ‘পৌরুষ’ নিয়ে কতটা সংবেদনশীল ছিলেন, এই পত্রের প্রতিটি ছত্র তার প্রবল প্রমাণ।
কান্দিরপাড়, কুমিল্লা,
২৩ জুন ১৯২১
(বিকেল বেলা)
বাবা শ্বশুর!
আপনাদের এই অসুর জামাই পশুর মতন ব্যবহার করে এসে যা কিছু কসুর করেছে, তা ক্ষমা করো সকলে, অবশ্য যদি আমার ক্ষমা চাওয়ার অধিকার থাকে। এইটুকু মনে রাখবেন, আমার অন্তর-দেবতা নেহায়েৎ অসত্য না হয়ে পড়লে আমি কাউকে ব্যথা দিই না। যদিও ঘা খেয়ে খেয়ে আমার হৃদয়টাতে ঘাটা বুজে গেছে, তবু সেটার অন্তরতম প্রদেশটা এখনও শিরীষ ফুলের পরাগের মতোই কোমল আছে। সেখানে খোঁচা লাগলে আর আমি থাকতে পারিনে। তাছাড়া আমিও আপনাদেরই পাঁচজনের মতন মানুষ, আমার গন্ডারের চামড়া নয়, কেবল সহ্যগুণটা কিছু বেশি। আমার মান-অপমান সম্বন্ধে কাণ্ডজ্ঞান ছিল না বা ‘কেয়ার’ করিনি বলে আমি কখনও এত বড় অপমান সহ্য করিনি। যাতে আমার ‘ম্যানলিনেসে’ বা পৌরুষে গিয়ে বাজে– যাতে আমাকে কেউ কাপুরুষ হীন ভাবতে পারে। আমি সাধ করে পথের ভিখারি সেজেছি বলে লোকের পদাঘাত সইবার মতন ‘ক্ষুদ্র-আত্মা’ অমানুষ হয়ে যাইনি। আপনজনের কাছ হতে পাওয়া অপ্রত্যাশিত এত হীন ঘৃণা, অবহেলা আমার বুক ভেঙে দিয়েছে। বাবা! আমি মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। দোয়া করবেন, আমার এ ভুল যেন দু-দিনেই ভেঙে যায়– এ অভিমান যেন চোখের জলে ভেসে যায়!
বাকি উৎসবের জন্য যত শিগগির পারি বন্দোবস্ত করব। বাড়ির সকলকে দস্তুর মতো সালাম-দোয়া জানাবেন। অন্যান্য যাদের কথা রাখতে পারিনি, তাদের ক্ষমা করতে বলবেন। তাকেও ক্ষমা করতে বলবেন, যদি এ ক্ষমা চাওয়া ধৃষ্টতা না হয়। আরজ-ইতি
চির-সত্য স্নেহ-সিক্ত
নুরু
চিঠির শুরুতেই ‘অসুর জামাই’ প্রত্যয়-দ্বয় ব্যবহার মূলত তীব্র আত্ম-ধিক্কারের সমন্বিত রূপ। এভাবে নিজেকে ‘অসুর জামাই’ এবং নিজের আচরণকে ‘পশুর মতন’ বলে উল্লেখ করেছেন। এটি কোনো সাধারণ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নয়, বরং আপনজনদের কাছ থেকে পাওয়া বড় আঘাত বা ভুল বোঝাবুঝি থেকে জন্ম নেওয়া চরম অভিমান ও তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। নজরুল লিখেছেন, তার ভেতরের মানুষটি বা অন্তর-দেবতা কখনও কাউকে ‘ব্যথা দিত না’। তার হৃদয় ‘শিরীষ ফুলের পরাগের মতোই কোমল’। বাহ্যিক রুক্ষ্মতা বা দ্রোহের আড়ালে নজরুলের মনটা যে কতটা সংবেদনশীল ও কবিসুলভ ছিল, এই উপমাটি তা চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে। তবে তিনি কোমল হৃদয়ের হলেও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে ছিলেন চির-আপসহীন। কবি দারিদ্র্য বা ‘পথের ভিখারি’ হওয়াকে কখনও লজ্জার মনে করেননি। কিন্তু সেই কারণে কেউ তাকে ‘কাপুরুষ’ বা ‘হীন’ ভাববে, কিংবা তার পুরুষত্বে আঘাত করবে, এটা তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি স্পষ্ট বলেছেন: ‘আপনাদেরই পাঁচজনের মতন মানুষ, আমার গন্ডারের চামড়া নয়, কেবল সহ্যগুণটা কিছু বেশি।’ নার্গিসকে বিবাহ করার পর বাসররাতে কী ঘটেছিল, তার পরিপূর্ণ বর্ণনা এখনও অনাবিষ্কৃত। কবি কখনোই প্রকাশ করেননি। তবে মারাত্মক অবমাননাকর কিছু ঘটেছিল নিঃসন্দেহে। তা না হলে আদর্শ ছেলে কাজী নজরুল কখনোই নববিবাহিত স্ত্রীকে ত্যাগ করে গভীর রাত্রে বৃষ্টি কাদার মধ্যে কুমিল্লা শহরে গিয়ে উঠতেন না। এই পত্রে মানুষের প্রতি নজরুলের বিশ্বাস হারানোর হাহাকার লিপিবদ্ধ হয়েছে। ‘আমি মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি’। নজরুলের মতো প্রখ্যাত মানবতাবাদী কবির মুখ থেকে যখন এই হাহাকার বের হয়, তখন বোঝা যায় আঘাতটা কতটা গভীর ছিল। তিনি সমাজ বা শত্রুর কাছ থেকে নয়, বরং ‘আপনজনের কাছ হতে পাওয়া অপ্রত্যাশিত হীন ঘৃণা’র কারণে এই কষ্ট পেয়েছিলেন। এই চিঠিটি নজরুলের জীবনের এক চরম অশান্ত ও আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী। এই পত্রে একদিকে তার তীব্র দারিদ্র্য ও অবহেলা, আর অন্যদিকে তার আকাশচুম্বী আত্মসম্মানবোধ ফুটে উঠেছে।
এই পত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রোমান্টিক প্রেমের সৌন্দর্য। এবং এর উচ্চ সাহিত্যিক মান। সাধারণত রোমান্টিক প্রেম বলতে আমরা বুঝি, মিলন, সৌন্দর্য বা মধুর স্তুতি। এই চিঠিতে তার উপস্থিতি ভিন্নরূপে। এখানে রোমান্টিকতা প্রকাশ পেয়েছে ‘বিপ্রলম্ভ শৃঙ্গার’ বা বিরহ, চরম অভিমান ও আত্মাহুতির বেদনায়। এমন অভিমানই প্রেমের গভীরতার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। রোমান্টিক প্রেমের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো ‘অভিমান’। নজরুল নার্গিসকে কতটা গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন, তা প্রকাশ পায় তার এই তীব্র অভিমানে। যার প্রতি ভালোবাসা নেই, তার দেওয়া আঘাতে মানুষ এতটা চূর্ণ হয় না। ‘আপনজনের কাছ হতে পাওয়া অপ্রত্যাশিত এত হীন ঘৃণা’ বাক্যটি প্রমাণ করে তিনি তাদের রক্তের সম্পর্ক– আত্মীয় বই পর ভাবেননি। অথচ প্রতিদানে পেয়েছেন অতিগোপন শর্তের বেড়াজাল ও অবহেলা। হৃদয়ের চরম কোমলতা ও সংবেদনশীলতাই কবিকে হঠাৎ দ্রোহী করে তোলে। তীব্র ক্ষোভের মাঝেও কবি নিজের প্রেমময় হৃদয়ের যে বিবরণ দিয়েছেন, তা প্রেমের এক অপূর্ব রোমান্টিক রূপ। তিনি লিখেছেন: ‘...সেটার অন্তরতম প্রদেশটা এখনও শিরীষ ফুলের পরাগের মতোই কোমল...’।
যিনি ব্রিটিশ রাজদণ্ডকে কাঁপিয়ে দিতে পারেন, প্রেমের ক্ষেত্রে তিনি ‘শিরীষ ফুলের পরাগের’ মতো সূক্ষ্ম ও নরম। এই বৈপরীত্যই নজরুলের রোমান্টিকতার মূল সৌন্দর্য। তবে এই বৈপরীত্যের কারণে প্রেম বনাম আত্মমর্যাদার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। প্রকৃত রোমান্টিক নায়ক কখনও নিজের আত্মমর্যাদা বা ‘পৌরুষ’ বিসর্জন দিয়ে প্রেম ভিক্ষা করে না। নজরুল এখানে প্রেমকে খাটো করেননি, কিন্তু ঘরজামাই থাকার শর্ত বা অসম্মানজনক আপসকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রেমের জন্য তিনি ‘পথের ভিখারি’ হতে রাজি আছেন, কিন্তু ‘কাপুরুষ’ বা ‘ক্ষুদ্র-আত্মা’ হতে রাজি নন। এটি প্রেমের এক মহৎ ও বীরত্বপূর্ণ রূপ। ব্যক্তিগত চিঠি হওয়া সত্ত্বেও পত্রটি নজরুলের উচ্চমানের সাহিত্যিক গদ্যের একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন। এর সাহিত্যিক গুণাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আবেগের উত্তাল প্রবাহে গদ্যের ছন্দ আলোড়িত। চিঠিটি পড়ার সময় মনে হয় কোনো বাঁধভাঙা ঝড়ের গতিতে শব্দগুলো বেরিয়ে আসছে। এটি কোনো ঠান্ডা মাথায় লেখা চিঠি নয়; তীব্র মানসিক যন্ত্রণার মুখে গদ্যও এখানে কবিতার মতো ছন্দময় ও নান্দনিক হয়ে উঠেছে। এই পত্রটি তীক্ষ্ণ বৈপরীত্য, হতাশা-নিরাশাতেও উপযুক্ত রূপকের ব্যবহার বেশ লক্ষণীয়। সাহিত্যিক দিক থেকে এই পত্রে ব্যবহৃত উপমাগুলো অসাধারণ। একদিকে তিনি নিজেকে ব্যঙ্গ করে বলছেন ‘অসুর জামাই’, ‘পশুর মতন ব্যবহার’, অন্যদিকে নিজের ভেতরের সত্তাকে তুলনা করেছেন সুকোমল ‘শিরীষ ফুলের পরাগ’-এর সাথে। আবার নিজের সহনশীলতাকে বুঝিয়েছেন ‘গন্ডারের চামড়া নয়’ বলে। এই বিপরীতমুখী শব্দের কোলাজ চিঠিটিকে উচ্চমানের সাহিত্যিক রূপ দিয়েছে।
এই সংক্ষিপ্ত পত্রটিতে ভাষার মেলবন্ধন বা লিঙ্গুইস্টিক ফিউশন অবিশ্বাস্যরকম সুন্দর। নজরুলের কবিতার মতো তার এই চিঠিতেও তৎসম (সংস্কৃত) এবং আরবি-ফারসি শব্দের এক অপূর্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত মিশ্রণ ঘটেছে। একদিকে আছে ‘অন্তর-দেবতা’, ‘অন্তরতম প্রদেশ’, ‘ক্ষুদ্র-আত্মা’র মতো গুরুগম্ভীর সংস্কৃত শব্দ, অন্যদিকে রয়েছে ‘কসুর’, ‘নেহায়েৎ’, ‘সালাম-দোয়া’, ‘দস্তুর’, ‘বন্দোবস্ত’, ‘আরজ-ইতি’র মতো পরিচিত ইসলামি/ফারসি পরিভাষা । এর সাথে ইংরেজি শব্দ ম্যানলিনেস-এর ব্যবহার নজরুলের চিরচেনা অসাম্প্রদায়িক ও আধুনিক ভাষাশৈলীকেই ফুটিয়ে তুলেছে। তা ছাড়া ম্যানলিনেস শব্দটি বহুমাত্রিক। এর সঙ্গে ‘কারেজ’, ‘ফিজিকাল স্ট্রেংথ’, ‘রেসপন্সিবিলিটি’, ‘ইন্টেগ্রিটি’, ‘ইমোশনাল রেজিলিয়েন্স’ এর মতো গুণাবলি জড়িত। কাজী নজরুল সচেতনভাবেই এই শব্দ ব্যবহার করেছেন। তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। এই গুণাবলি সব নজরুলে চরিত্রেরই বৈশিষ্ট্য যেন।
এই পত্রের আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– কবির মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। চিঠির ছত্রে ছত্রে একজন ট্র্যাজিক নায়কের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন স্পষ্ট। তিনি একদিকে সবার কাছে ক্ষমা চাচ্ছেন ‘তা ক্ষমা করো সকলে’, আবার পরক্ষণেই নিজের আত্মসম্মানকে উচ্চে তুলে ধরেছেন। এই যে নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ, তা এই পত্রকে সাধারণ চিঠির স্তর থেকে উন্নীত করে মনস্তাত্ত্বিক সাহিত্যে রূপ দিয়েছে। নজরুলের এই চিঠিটি শুধু পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝির কৈফিয়ত নয়; এটি একজন কবির হৃদয়ের আত্মলিপি। রোমান্টিক ট্র্যাজেডি ও ক্ষুরধার গদ্যশৈলীর সম্মিলনে লিখিত এই পত্র বাংলা সাহিত্যের সম্পদ।
- বিষয় :
- নজরুল উৎসব