অন্তরচ্ছেদ
শিল্পকর্ম:: শাহানুর মামুন
মূল: পেতের নাদাশ।। অনুবাদ: ফয়জুল লতিফ চৌধুরী
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
পর্দার আড়ালে গিয়ে মডেল তার স্কার্ট ছাড়ে। ব্লাউজ মাথা গলিয়ে বের করে, ব্রা খুলে ফেলে। প্যান্টি নামিয়ে নেয়। তারপর বাইরে লেখার টেবিল আর দোলচেয়ারের মাঝখানে এসে দাঁড়ায়। পায়ে পুরোনো, দোমড়ানো মোকাসিন জুতো, গলায় সস্তা লকেট। শরীর আড়ষ্ট। কোন ভঙ্গিমায় তার ছবি আঁকা হবে এখনও ঠিক করা হয়নি। ঘরের মৃদু আলো তেমন কোনো কনট্রাস্ট তৈরি করছে না। তার দেহাবয়ব দৃশ্যমান। রোদে পোড়া শরীরে বিকিনির রেখা। পেটে অ্যাপেন্ডিক্স অস্ত্রোপচারের ক্ষত। ফিনফিনে যোনিকেশ। খানিক ঝুলে পড়া স্তন দুপাশে হেলে আছে। হাত দুটো লালচে, ফোলা। নিতম্ব থলথলে। গোড়ালিতে কড়া। পায়ের পাতা নিয়ে কুণ্ঠিত মেয়েটি। তাকে জুতো খুলে ফেলতে হবে।
কুরূপা বা রূপবতী কোনো শ্রেণিতেই তাকে ফেলা যায় না। সে এখন আদিম মানবী। কেবল তার লকেটটা অনন্যসাধারণ। কারণ তা নিষ্প্রাণ। মানবদেহ প্রতিরোধহীন, ভঙ্গুর, কিন্তু অস্তিত্বময়। লকেটটি তার চেয়েও যেন বেশি অস্তিত্বশীল। ওটাও তাকে খুলে ফেলতে হবে। হতে হবে সম্পূর্ণ নিরাভরণ।
আমার বন্ধু শ. মেয়েটিকে বিভিন্ন ভঙ্গিতে দাঁড় করাতে শুরু করে। এমন একটা ভঙ্গিমা ঠিক করল যেটা খুব জুতসই নয়। আরেকটু এদিক-ওদিক করলেই হয়তো সবচেয়ে উপযুক্ত ভঙ্গিটি খুঁজে বের করা যেত। কিন্তু বিষয়টা এখন না সেই মডেলের, না আমার বাস্তবতার অংশ। এই সুনির্দিষ্ট ভঙ্গিমাটি কেবল চিত্রশিল্পীর, আমার বন্ধুর।
সেই কয়েক মুহূর্ত আমাকে উদ্বেলিত করে। পোশাকাবরণ আর নগ্নতার মধ্যবর্তী অনিশ্চয়তা। ‘যা আর নেই’ এবং ‘যা এখনও হয়ে ওঠেনি’– এ দুইয়ের অন্তর্বর্তী কিছু সময়। ইতিহাসের অন্ধগলির অস্থির প্রান্ত। কেবল ভঙ্গিমাহীনতার দুর্লভ মুহূর্তগুলো মহাবিশ্বের সর্বগ্রাসী অনিশ্চয়তার মাঝে নিশ্চয়তার ঝিলিক। তাই মনে হয়।
এখন ব্যাপারটা আমাকে নিয়ে; শাশ্বত অনিশ্চয়তাবোধ থেকেই জন্ম নেয় এক অস্বস্তিকর, সর্বগ্রাসী সংশয়– মানুষের প্রতি অবিশ্বাস, বস্তুর ওপর আস্থাহীনতা, এমনকি ঘটে যাওয়া ঘটনারাশি নিয়ে সন্দেহ।
মানুষ, বস্তু ও ঘটনার ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে, কোনো এক ধরনের যৌক্তিকতার সন্ধানে– আমি একটি নয়, বরং একাধিক যৌক্তিক এবং সমান গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হই। কিন্তু একটিমাত্র সিদ্ধান্তই-বা কতটুকু সত্যকে ধারণ করতে পারে? একটি বয়ানই-বা কতটা প্রকাশ করতে পারে– যদি না তা সেই বর্ণিত বিষয়ের অগণিত সম্ভাব্য রূপ ও বৈচিত্র্যকেই আড়াল করে দেয়? আমি খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর একাধিক, সমানভাবে যৌক্তিকভাবে সঠিক সংজ্ঞায় উপনীত হই। কিন্তু এটি আবার কেমন সংজ্ঞা, যার বিপরীতটিও অগণিত রূপে প্রমাণ করা যায়? যদি আমি আমার নিজের উপলব্ধিগুলো যথেষ্ট কঠোরতার সাথে পর্যবেক্ষণ করি, এবং এই তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত বৌদ্ধিক-আবেগী পরিসরকে বর্ণিত খুঁটিনাটির সাথে তুলনা করি, তবে বর্ণনার আকস্মিকতা– অর্থাৎ অর্থের বিকৃতি– স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মডেলটি কোনো পর্দার আড়ালের পেছনে যায়নি। এই স্টুডিওতে আড়াল করার মতো কিছুই নেই।
তার পোশাক খুলে নিরাবরণ হওয়া? তা নিশ্চয়ই কয়েক মুহূর্তের ইঙ্গিতময় কসরত– মন, শরীর এবং অভিপ্রায়ের এক অনিবার্য পরিণতি। কিন্তু আমি এসবের কিছুই জানি না। বিশদ করে বর্ণনা করার মতো কোনো খুঁটিনাটি আমার জানা নেই। মাত্র দশ মিনিট আগে আমি তাকে প্রথম দেখেছি। তাই আমার এই বয়ান অসম্পূর্ণ জ্ঞানের ভিত্তিতে তার একে একে কাপড় খোলার প্রক্রিয়াটির সংকীর্ণ সাধারণীকরণের অতিরিক্ত কিছুই নয়। কিন্তু মডেলকন্যাটি যদি চেনা-পরিচিত হতো? তাহলেও আমি তাকে মডেলিংয়ের প্রচলিত ধারণা থেকে অন্যভাবে উপস্থাপন করতে পারতাম না। কিংবা ধরুন, আমি যদি তাকে আমার পরিচিত কেউ ভেবেই বর্ণনা করা শুরু করতাম? পূর্বপরিচয়ের অর্থ হতো চেনা জগতের এক নিশ্চিত সীমানা পার হয়ে যাওয়া– কিন্তু সেই সীমানাটাই-বা কোথায়– তখন সে আর নিছক একজন মডেল থাকত না।
ব্যাপারটা বর্ণনার সীমানা লঙ্ঘন করে ফেলত, আমারও সম্পৃক্ত হয়ে উঠত। যা আমার অধিগম্য নয় তা যদি বানিয়ে লিখতে হতো?
বাস্তবতাকে গল্প দিয়ে প্রতিস্থাপন করা মানে বিষয়টাকে উচ্চকিত করা। আবার এক ধরনের সাধারণীকরণও।
মনে হচ্ছে আমি বৃথাই মাথা কুটে মরছি। তথ্যটথ্য গুবলেট হয়ে যাচ্ছে কেবল ঘটনাটি আবছা মনে পড়ছে।
কিন্তু বিকৃতির তথ্যগুলো তো তথ্যই।
মডেলটি স্কার্ট ও ব্লাউজ পরে ছিল না; তার পরনে ছিল একটা গ্রীষ্মকালীন হাতাকাটা পোশাক। নিছক শৈলীগত কারণে আমি বাস্তবতাকে বদলে দিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল ‘বেরিয়ে আসা’, ‘গলিয়ে নেওয়া’, ‘খুলে ফেলা’, ‘নামিয়ে দেওয়া’– ইত্যাদি গতিময় ক্রিয়াপদগুলো পুরো বাক্যটিকে ছন্দোময় করে তুলবে– কাজটির সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যগুলোকে ফুটিয়ে তুলবে। বিষয়টি যেহেতু দ্বিতীয় বাক্যটির অন্তর্নিহিত ছন্দ নিয়ে, তাই এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল।
এবং নগ্ন মডেলটি আদৌ লেখার টেবিল আর দোলচেয়ারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল না। ঐ ছবি আঁকার স্টুডিওতে লেখার টেবিল ও দোলচেয়ার দুটোই ছিল, কিন্তু দোলচেয়ারটি তখন সেখানে ছিল না। দৃশ্যটাকে আমি পরে এভাবে সাজিয়ে নিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, এই জড়বস্তুগুলোর প্রেক্ষাপটে ওর নিরাবরণ শরীরটা আরও বেশি মূর্ত, আরও বেশি স্পর্শগ্রাহ্য হয়ে উঠবে। কারণ আমার মূল উদ্দেশ্য যদি কিছু থেকে থাকে, তা হলো এ রকম একটি বয়ান প্রতিষ্ঠা করা যে নৃকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনায় নগ্ন মানবশরীর এবং পারিপার্শ্বিক জড়বস্তুর মধ্যকার অসামঞ্জস্য এক ট্র্যাজিক উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়: এই পৃথিবীতে একটি জড়বস্তু মানুষের জীবন্ত শরীরের চেয়ে অনেক বেশি স্থায়ী, অনেক বেশি অটল। জড়বস্তু অধিকতর দুর্ভেদ্য, আরও সহজে বর্ণনার যোগ্য।
জড়জগৎ আরোপিত উপাদান আর নমনীয় অনুষঙ্গগুলো জড়িয়ে নিয়ে এই নগ্ন দেহাবয়ব সেই অসামঞ্জস্যকে অস্পষ্ট করে তোলে, দুই জগতের মধ্যে একটা সীমারেখা এঁকে দেয়, এবং এক ধরনের অনতিক্রম্যতার অনুভূতি জাগায়। অঁরি বর্গসঁ এই বিষয়ে বলেছিলেন: “পোশাকের অনমনীয় জড়তার সাথে আবৃত শরীরের জীবন্ত নমনীয়তার বৈসাদৃশ্য আর স্বতঃস্পষ্ট থাকে না।” নগ্ন শরীরের ভঙ্গুরতা ও অসহায় প্রতিরোধহীনতার এমন ট্র্যাজেডি হয়তো অবারিত প্রাকৃতিক পরিবেশে এতটা প্রকট হয়ে উঠত না। কেবল এখানেই, এই লেখার টেবিল আর দোলচেয়ারের মধ্যবর্তী স্থানে। তাই আমি দোলচেয়ারটিকে একটি প্রতীক হিসেবে তৈরি করতে চেয়েছিলাম– জবরজং টেবিলটার একটা জুতসই সঙ্গী হিসেবে।
আমি আবার শুরু করব: আমি দৃশ্যটি স্পষ্টতরভাবে স্মরণ করার চেষ্টা করব।
“আমি কি আমার জুতো খুলে ফেলব?”– সে জিজ্ঞেস করেছিল। কোনো উত্তর না-আসায় বুঝে গিয়েছিল তাকে খুলতে হবে। সে লজ্জায় লাল হয়ে গেল, জুতো দুটোকে লাথি মেরে স্টুডিওর কোনায় ছুড়ে দিল। ফলে গলায় একটা লকেট ছাড়া দেহাবয়বে আর কিছু অবশিষ্ট থাকল না। লকেটটাকে বিসৃদশ লাগছিল। কয়েক সেকেন্ড পার হলে তার আড়ষ্ট ভাব কেটে গেল। এক পায়ের পাতা দিয়ে অন্য পায়ের পাতা ডলছিল না। আসলে কিন্তু সে স্টুডিওর কোনায় জুতোজোড়া লাথি মেরে সরিয়ে দেয়নি। এই তথ্যটা আমি মাত্রই বানিয়ে নিলাম, কারণ সে নিচু হয়েছিল কি-না, তা আমার আদপেই মনে পড়ছে না। তাহলে সে জুতো খুলল কীভাবে? স্রেফ পা গলিয়ে বেরিয়ে এসেছিল হয়তো। কিন্তু তাহলে জুতোজোড়া চুল্লির পাশে গেল কীভাবে? ওগুলো চুল্লির পাশে যায়নি।
হ্যাঁ, ঠিক তাই। সে তখনও লেখার টেবিলটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়নি, যখন জিজ্ঞেস করল: “আমি কি জুতোজোড়াও খুলে ফেলব?”– তখন সে সারোশপাতাক স্কুলের জন্য পরিকল্পিত একটি দেয়ালচিত্রের মস্ত খসড়ার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখে যেন একঝলক রক্ত উঠে এলো। কেউ কোনো উত্তর দিল না। সে পা থেকে জুতোজোড়া বের করে নিল। এক পা দিয়ে অন্য পায়ের পাতা রগড়াতে লাগল। বলল, “আমার পায়ে কড়া পড়েছে।” আমার বন্ধু শ. চোখ সরু করে সতর্কদৃষ্টিতে শুধু এটুকুই বলল: “অন্যদেরও পড়ে”– এবং ইশারায় দেখাল কোন্ দিকে যেতে হবে। কী আর করা? মডেলটি দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে লেখার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আমি সাগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম গলায় ঝুলে থাকা লকেটটার শেষ পর্যন্ত কী গতি হয় তা দেখার জন্য। জুতোজোড়া ওখানেই রয়ে গিয়েছিল, বেশ সুন্দর গুছিয়ে রাখা, পাতাকি স্ক্রাফিটোর খসড়া নকশার নিচে। এই তথ্যটি নিয়ে আমি কিছুটা সংশয়গ্রস্ত ... সে আসলে লকেটটা পেছনের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল, যাতে ওটা তার পিঠে ঝুলে থাকে; সে ওটা শরীর থেকে খুলে ফেলেনি। এভাবেই তার কাপড় খোলার পর্ব শেষ হয়েছিল, আর আমার স্মৃতি যদি ধোঁকা না দেয়, তবে এর পরপরই তাকে দেখানো ভঙ্গিতে দাঁড়াতে বলা হলো। আর তখনই আমার মাথায় এই পুরো ভাবনাটা সিঁধিয়ে গেল– জড়বস্তু আর জ্যান্ত মানুষের শরীরের এই সম্পর্কটা নিয়ে। কিন্তু হয়তো, এটা তারও পরে।
জুতোর বদলে টেবিল। লকেটের জায়গায় দোলচেয়ার। এবার আমি গল্পটা ঠিক এভাবেই বলতে চাই। তবে নিখাদ সত্য হওয়ার পক্ষে এই বিন্যাসটা বড্ড বেশি যৌক্তিক আর নিপাট।
বাস্তবে তার পেটে অস্ত্রোপচারের কোনো ক্ষতচিহ্ন ছিল না। আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে এই ক্ষতচিহ্নের বিষয়টিও আমার বানিয়ে তোলা। কারণ আমার মনে হয়েছিল– কোমরে অন্তর্বাসের ইলাস্টিকের দাগ দেখা যাচ্ছে– এ রকম বর্ণনা খুব অরুচিকর হতো। আসলে আমি নিশ্চিত নই যে আদৌ তেমন কোনো ক্ষতচিহ্ন আমার নজরে পড়েছিল কিনা। অন্তর্বাস শরীরে ওরকম দাগ ফেলে যায় বটে। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, অ্যাপেন্ডিসাইটিস অস্ত্রোপচারের ওই কাল্পনিক ক্ষতচিহ্নটি তার শারীরিক নাজুকতা আর এই পুরো দৃশ্যের আদিম কাঁচা রূপটিকে আরও তীব্রভাবে ফুটিয়ে তুলবে। অবশ্য অন্তর্বাসের সেই দাগটা ছাড়াও দৃশ্যটা যথেষ্ট আদিম ছিল। তবে তার গোড়ালির কড়া পড়ার ব্যাপারটা পুরোপুরি সত্যি ছিল (সে বলেছিল তার পায়ে ‘কড়া’ পড়েছে, কিন্তু আসলে তার পায়ের আঙুলগুলো গিঁটযুক্ত ছিল।) এখন, একটা কারণ খুঁজতে গিয়ে আমার মনে হচ্ছে: সে হয়তো ‘আঙুলগুলো গিঁটযুক্ত’ বলার চেয়ে ‘কড়া’ বলাকে একটু কম অভব্য মনে করেছিল। আর আমি ওই গিঁটগুলো পায়ের আঙুল থেকে গোড়ালিতে সরিয়ে দিয়েছি কারণ আমি শব্দটির (পা, আঙুল) পুনরাবৃত্তি এড়াতে চেয়েছিলাম।
অন্যদিকে, আমি তার কদর্য পায়ের এই বিবরণ ব্যবহার করেছিলাম একটি শৈল্পিক রূপক হিসেবে– বস্তুর অনমনীয়তা আর শরীরের নমনীয় অবয়বের পার্থক্য ফুটিয়ে তুলে খুব সূক্ষ্মভাবে আমার মূল বক্তব্যটিকে প্রতিষ্ঠা করতে। তার ছিল খুঁত ঢাকার প্রচেষ্টা আর আমার ছিল প্রিয় গদ্যশৈলীর প্রতি আনুগত্য। এই দুই টানাপোড়েনের মধ্যে নিখাদ সত্যটি কোথাও ঝুলতে থাকে। অথবা হারিয়ে যায়।
ভাবতে অবাক লাগে, কত সামান্য কারণে সত্যকে এভাবে বিকৃত করা যায়! এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। কিন্তু আমরা যেমন বাস্তবতার খুঁটিনাটি প্রকাশ করতে পারি, তেমনি অপসত্যের খুঁটিনাটিও তুলে ধরতে পারি।
কোনো এক সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের স্বার্থে যাবতীয় তথ্যের এই দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের মাঝখান থেকে যেন এক কুটিল, বিদ্রুপাত্মক হাসির প্রতিধ্বনি ভেসে আসে।
আমি লিখেছিলাম তার যোনিমণ্ডপের কেশবিন্যাস ছিল পাতলা। এখন আমার স্বীকার করতেই হচ্ছে, তা আসলে মোটেও পাতলা ছিল না।
সে যখন সেই আড়াল থেকে– যেখানে স্টুডিওর একটা দরজার গায়ে একটা বাঁধানো ক্যানভাস হেলান দিয়ে রাখা ছিল– বেরিয়ে এলো, তখন তার যোনিমণ্ডপের আকার দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। আগের বর্ণনায় আমি অবশ্য এর কোনো উল্লেখ করিনি। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না গড়পড়তা যোনিমণ্ডপের তুলনায় তার যোনিমণ্ডপটি খুব বেশি বড় ছিল কিনা। আমার কাছে ওটা বড়ই মনে হয়েছিল। যদিও আমি ঠিক নিশ্চিত নই। আর ঠিক সেই কারণেই, আমি আমার এই অনিশ্চয়তাকে এক মনগড়া নিশ্চয়তার আড়ালে ঢেকে দিতে চেয়েছিলাম। তার হাত দুটো আসলেই লাল আর ফোলা ফোলা ছিল কি-না, তা এখন আমার মনে নেই। সত্যি বলতে, সম্ভবত তার হাতের কথাই আমার স্মৃতি থেকে পুরোপুরি মুছে গেছে।
আমি মনে করার চেষ্টা করছি।
মেয়েটি যখন স্টুডিওতে ঢুকে আমার থেকে মাত্র কয়েক ফুট (আন্দাজ সাড়ে ছয় ফুট, হয়তো কিছুটা বেশি কিংবা কম) দূরে কাঠের মঞ্চটার ওপর এসে বসল, আমি তখনই তার দিকে একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আর সে? সে কি ওটা নিয়েছিল? নাকি জ্বালিয়েছিল? আমার মনে নেই।
তবে আমি যে ওটা ধরিয়ে দেইনি, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। আমি যদি সিগারেটটা ধরিয়ে দিতাম, তবে খুব কাছ থেকে দেখা তার মুখাবয়ব আমার স্মৃতিতে অবশ্যই গেঁথে থাকত। কারণ ওটা করতে হলে আমাকে উঠে দাঁড়াতে হতো, দেশলাইয়ের গায়ে কাঠি ঘষে আগুন জ্বালাতে হতো, আর আগুন নিয়ে তার দিকে ঝুঁকে পড়তে হতো। কিন্তু আমি উঠে দাঁড়াইনি, কাঠিও জ্বালাইনি, আর তার দিকে ঝুঁকে সিগারেটটাও ধরিয়ে দিইনি। ফলে তার মুখখানি খুব কাছ থেকে দেখার কোনো স্মৃতি মানসপটে ধরা নেই। আমি তাকে সিগারেট ধরিয়ে দিইনি।
আমি কাঠের মঞ্চটার ওপর মেরুদণ্ড সোজা করে বসেছিলাম– যেন নগ্ন হয়ে আমি নিজেই মডেলিং করছি। অবশ্য একবার আমি উঠে দাঁড়িয়েছিলাম– ‘অদ্ভুত চেহারার মেয়ে’ শিরোনামের ছবিটা যে ইজেলে রাখা ছিল সেখান থেকে একটুকরো ক্যানভাস মেঝেতে পড়ে গিয়েছিল: আমি ওটা তুলে দিয়েছিলাম। ক্যানভাসের আঘাতে পেন্সিল আর কাঠকয়লা রাখার বাক্সটাও ছিটকে পড়েছিল। তবে এখন মনে হচ্ছে, সম্ভবত মেয়েটি ক্যানভাসের টুকরোটা তুলেছিল, আর আমি তুলেছিলাম পেন্সিলের বাক্সটা।
পরের দৃশ্যটি– ভাবা ঠিক হবে না যে আমার বন্ধু শ. ছবি আঁকার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল– সে আসলে তার ছাত্রছাত্রীদের জন্য মডেল মেয়েটির ভঙ্গিমা ঠিক করে দিচ্ছিল: দুটি ছেলে আর আকর্ষণীয় চেহারার একটি মেয়ে।
আমি মডেলটিকে একটি সিগারেট বাড়িয়ে দিই। আমি যদি তাকে ওটা ধরিয়ে না-ও দিয়ে থাকি, সে নিজেই হয়তো দেশলাই দিয়ে তা ধরিয়েছিল। হয়তো তার সাথে কোনো ব্যাগ ছিল না। আচ্ছা, আমি তাকে আবার ওই দরজাটা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেব, যার গায়ে একটা বাঁধানো ক্যানভাস হেলান দিয়ে রেখে আমার বন্ধু শ. একটা অস্থায়ী আড়াল তৈরি করেছিল। ওই তো সে ঢুকছে... কিন্তু আমি এখনও বুঝে উঠতে পারছি না তার হাতে কি একটা ছোট বটুয়া, কোনো ব্যাগ, নাকি অন্য কিছু দেওয়া উচিত? সুতির হালকা হাতাকাটা পোশাকটা পরার কারণে তার কাঁধ দুটো উন্মুক্ত ছিল,– এটুকু আমার স্পষ্ট মনে আছে: বেশ মোলায়েম কাঁধ। কিন্তু তার হাতের গড়ন কেমন ছিল, তা আমার মনে আসছে না। আমাদের যেহেতু আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়নি, তাই আমরা হাতও মেলাইনি।
আমি তাকে সিগারেট ধরিয়ে দিইনি। সে কীভাবে আঙুলের ফাঁকে সিগারেটটা ধরে রেখেছিল, সেই ভঙ্গিটার কোনো ছবিই আমি মনে মনে আঁকতে পারছি না। সম্ভবত সে আদৌ ধূমপান করে না। এমনকি আমার বাড়িয়ে দেওয়া সিগারেটটা সে হয়তো গ্রহণও করেনি।
তবে একটা সুনির্দিষ্ট ভঙ্গি আমি খুব পরিষ্কার মনে করতে পারি:– লকেটটিকে ঝটকা দিয়ে পিঠের দিকে ফেলে দেওয়ার সময় তার কবজির সেই মোচড়টুকু। আমি আমার আগের বর্ণনায় তার এই কাজটার খুব অস্পষ্ট একটা বিবরণ দিয়েছিলাম মাত্র। কারণ, একজন অপরিচিত মানুষের হাত নিয়ে আগ বাড়িয়ে কোনো মন্তব্য করাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। অবশ্য এটাও খুব সম্ভব যে, আমি কোনো ভুল করিনি: তার হাত দুটো আসলেই কিছুটা লালচে আর ফোলা ফোলা। তার পা দুটোও ঠিক তেমনই– গোটা গোটা গোড়ালি, শক্তিশালী, লালচে মাংসপেশি। ফ্যাকাশে ঊরু, কোঁচকানো বাহু, যেন সে সব সময় এই বিবর্ণ, হাতাকাটা বিবর্ণ পোশাকটা পরেই ঘুরে বেড়ায়।
আরও একটা বিষয়– বাস্তবে তার রোদে পোড়া ত্বকে বিকিনির কোনো স্পষ্ট রেখাই ছিল না। বরং উল্টোটাই সত্যি– সূর্যের আলো তার শরীরে কিছু হালকা বিক্ষিপ্ত দাগ ফেলেছিল। রোদ পোহানোর জন্য তার শরীরে দু’টুকরো বিকিনির সাদা রেখা ফুঠে উঠেছে– এটি কেবলই একটি সুচতুর গদ্যবিন্যাস।
শেষ কথা: আমার বন্ধু শ. তাকে কোনো সুনির্দিষ্ট ভঙ্গিমা ঠিক করে দেয়নি,– মেয়েটি নিজেই নিজের ভঙ্গি বেছে নিয়েছিল। ‘এভাবে ঠিক আছে?’ ‘হ্যাঁ... আরেকটু...’, ‘এই রকম?’ ‘হ্যাঁ, চমৎকার’। ভঙ্গিটি খুব একটা জুতসই নয়, বেঢপও নয়। এটি নিছকই একটি ভঙ্গি। তাকে ঝাড়া চল্লিশ মিনিট ঠিক এভাবে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
আমার বর্ণিত প্রতিটি মুহূর্তকেই ঠিক একইভাবে খণ্ডন করা চলে। এমনকি এই খণ্ডন করার প্রক্রিয়াটিকেও আবার নতুন করে খণ্ডন করা যায়। সত্যের এহেন বিকৃতি এড়ানোর চেষ্টায়– কিংবা বিকৃত হওয়া তথ্য আর বিকৃতিকারীর মধ্যকার সম্পর্কটা পরিষ্কার করার জাঁতাকলে পড়ে– একেবারে সহজতম তথ্যের ভেতরেও লুকিয়ে থাকা বহুবিধ অর্থের সম্ভাবনা উপেক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। মনের যাবতীয় পূর্বধারণাকে ছিঁড়ে ফেলার পর– চেনা প্রথায় সাজানো ইমারত যখন ভেঙে পড়ে– তখন আমরা এক নগ্ন তথ্যের মুখোমুখি হই; পিচ্ছিল, তরল আর সংজ্ঞার্থের অতীত যাবতীয় তথ্যের চোরাবালি।
দরজার কাছে মডেলটিকে আবারও দেখা যায় হাতে একটি চাবি– রিঙে আটকানো।
- বিষয় :
- গল্প