ঢাকা শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লেখা তৈরির নেপথ্য শক্তি

লেখা তৈরির নেপথ্য শক্তি
×

আর এফ কুয়াং [২৯ মে ১৯৯৬]

আর এফ কুয়াং

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বয়স ত্রিশ বছরে পৌছনোর আগেই জনপ্রিয়তা পেয়েছেন চীনা লেখক আর এফ কুয়াং। সম্প্রতি এক অনলাইন সাক্ষাৎকারে তিনি সাহিত্য নিয়ে নিজের কথা বলেছেন...

০১. আমার লেখার বড় একটা প্রভাব বিস্তার করে আছে আবেগ। কারণ, আমি লেখালেখিকে এক ধরণের মানসিক নিরাময়ের উপায় হিসেবে দেখি। যখনই আমি কঠিন কোনো সময়ের ভেতর দিয়ে যাই তখন নিজেকে শুধাই–শরীর কী চাচ্ছে? কান্না এলে তা কেমন শোনাবে? কিংবা ধুকপুকানি কতোটা বেড়েছে? এরপর আমি সেগুলো লিখে রাখার বা কোথাও টুকে রাখার চেষ্টা করি। এতে হয়তো দুঃখ পুরোপুরি লাঘব হয় না; কিন্তু অনুভূতির ভাব–ভঙ্গি আঁচ করা যায়! এটাই শিক্ষার্থীদের বলছিলাম। ধরুন, আপনি সাফল্যের কোনো একটা সময়কে তুলে আনতে চাচ্ছেন লেখায় তখন আপনি ‘উচ্ছ্বাস’ বা ‘অর্জন’–এর মতো শব্দ ব্যবহার করছেন। কিন্তু এর মাধ্যমে পাঠক চরিত্রটির অভ্যন্তরীণ অবস্থা বা অনুভূতি সম্পর্কে তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণা পায় না। তাই আমি তাদের বললাম, কোনো বড় সাফল্যের সংবাদ শরীরের ঠিক কোন জায়গায় অনুভূত হয়? শুধু শারীরিক প্রতিক্রিয়াটুকুই বর্ণনা করতে বললাম। উত্তরে কেউ বললো, ধুকপুকানি বেড়ে যায়। কেউ বললো পেটের ভেতর প্রজাপতি উড়ে। এক মেয়ে বললো, সে তার পায়ের আঙুলে অনুভব করে সবার আগে। আঙুলগুলো ঝিনঝিনিয়ে ওঠে! শুনে আমার বেশ অদ্ভুতই লাগলো। তবে শারীরিক স্তর থেকে শুরু করলে খুব চমৎকারভাবে এমন সব আবেগের দিকে যাওয়া যায় যা বেশ জটিল ও পরস্পরবিরোধী। ফলে আমরা অনুভূতির সেই দ্বিতীয় স্তরে পৌঁছাতে পারি—যেখানে আবেগগুলো কখনোই একরৈখিক হয় না। 
০২. আমার পরবর্তী উপন্যাস ফে। রূপকথার পুনর্কথন। ওখানে শিল্প আছে, রাজনীতি আছে। যান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্থা নিয়েও কথা আছে। সব রকম শিল্পমাধ্যমের প্রতি এক ধরনের প্রেম সেখানে ব্যক্ত। আমরা যখন মানুষের স্বাভাবিক গতির বাইরে আরো দ্রুতগতিতে কিছু পেতে চাই তখন কী হারাই? এ নিয়েও কিছু কথা সেখানে আছে। যাহোক, আমার দেখার চোখ বদলে গিয়েছিল ছবি আঁকতে গিয়ে। বোস্টনে ফিগার ড্রয়িংয়ের একটি কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলাম। প্রথম যখন মডেল এসে দাঁড়াল, সঙ্কোচ হচ্ছিল। কিছুক্ষণের ভেতর আবিষ্কার করলাম এখানে সঙ্কোচের কিছু নেই। আমার সামনে স্রেফ মানুষের একটি চমৎকার শরীর। আমার কাজ তার সমস্ত ভাঁজ ও জটিলতার দিকে তাকিয়ে থাকা। তারপর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর ভেতরকার সম্পর্কটাকে ফুটিয়ে তোলা। তখন আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখেছি। তা হলো, দেখা ও না-দেখার ভেতর সমন্বয় সাধন করা। 
নতুন আঁকিয়েদের একটা বৈশিষ্ট্য হলো তারা সব ফুটিয়ে তুলতে চায়। আমার প্রশিক্ষক যখন বিভিন্ন শেড তৈরি করা শেখাচ্ছিলেন,  বলছিলেন, আপনারা একটু চোখ ছোট করে দেখুন। দৃষ্টিকে কিছুটা ঝাপসা হতে দিন। কোথায় অন্ধকার বেশি, কোথায় আলো বেশি? তাদের সম্পর্কটা কী। দৃষ্টি দিন। কোন জায়গাটা নজর কাড়ছে। আলো কোথা থেকে আসছে, দেখুন। কোথায় রবার ঘষে আমরা একটু হাইলাইট করে দিলে ভালো হয়, দেখে বলুন। তাঁর কথা শেষ হলো, আমরাও লক্ষ্য করতে শুরু করলাম। আর তখনই আবিষ্কার করলাম, গোট দৃশ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মনোযোগকে একটা দৃশ্যে পূঞ্জীভূত করার বিষয়টি আমি কখনোই এভাবে লক্ষ্য করিনি। এবং ধীরে ধীরে মডেলের সঙ্গেও আমাদের এক ধরনের অনুরাগের সম্পর্ক তৈরি হলো। 
ছবি আঁকতে গিয়ে লেখার আরো একটি বিষয় আবিষ্কার করি। আমাকে একটা বিষয় শেখানো হয়েছিল। যাকে আঁকব, তার প্রতিকৃতি উল্টো করে দিয়ে তারপর আঁকা। তাতে করে আমার মন একটু অসুবিধায় পড়ে। আগে থেকে ঠিক করে রাখা পূর্বধারণাগুলো কোনো কাজে আসে না। আমরা যখন ঘরের কোণে তাকাই, যা আছে হয়ত তার দশ শতাংশ দেখি। বাকিটুকু আমাদের মন কল্পনা করে নেয়। স্মৃতি থেকে পূর্ণ করে নেয়। লিখতে গিয়ে একই ব্যাপার ঘটলে কিন্তু বিপদ। আপনি যদি কেবল আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, নিজস্ব স্মৃতি, বিশ্ব সম্পর্কে আপনার পূর্বধারণা ধরে রাখেন, তাহলে একটা সমস্যা হবে। যখন কোনো ঘটনার দিকে তাকাবেন, কিছু পূর্বধারণার পুনরাবৃত্তি দেখতে পাবেন। আপনার মনে হবে বুঝি সত্যটাই দেখছেন। কিন্তু আসলে তা নয়। যা দেখছেন সেটি মূলত ‘যা দেখতে চাইছেন’ তা। এবং তা সত্য নাও হতে পারে। 
লেখালেখি বিষয়ে ভার্লিন ক্লিনকেনবার্গের ‘সেভারেল ভেরি শর্ট সেন্টেন্সেস অব রাইটিং’ নামে একটি বই থেকেও কিছু মনোভাব আয়ত্ব করেছি, কাজে এসেছে। ভার্লিন মূলত প্রতিভার বা অভিব্যক্তি প্রকাশের সহজাত প্রবাহের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন। মনে করা হয়, যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে, তাই বোধহয় সুন্দর কিছু দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, ঐশ্বরিক কিছু আসছে। আসলে তা নয়। লেখার সময় আপনার কেমন অনুভূতি হচ্ছে তার সঙ্গে আসলেই কী দাঁড়াচ্ছে তার সম্পর্ক নেই। শব্দ বা বাক্য সহজেই পেয়ে যাচ্ছেন মানে আপনি কেবল বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকা পুরনো কথাগুলোকেই পাতায় বসাচ্ছেন। লেখার আসল সময়টা কিন্তু কঠিন। তখন শব্দ স্বেচ্ছায় আসবে না। যখন আপনি বুঝতে পারেন যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেসে ওঠা কিছু না লিখে, আপনি একেবারে শূন্য থেকে ভিত তৈরি করছেন, বুঝে নেবেন, তখনই রোমাঞ্চকর কিছু দাঁড়াচ্ছে। এমন কিছু, যা খানিকটা প্রভাব রাখলেও রাখতে পারে। 
lকালের খেয়া ডেস্ক

আরও পড়ুন

×