ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বারাংকো ওয়ালের ওপারে আফ্রিকার আকাশ

বারাংকো ওয়ালের ওপারে আফ্রিকার আকাশ
×

তানজানিয়ার কিলিমানজারো পর্বত

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে আদ্দিস আবাবা হয়ে কিলিমানজারো এসেছি। সেখান থেকে গাড়িতে এসেছি মোশি নামের একটা ছোট শহরে। এ শহরে দ্রষ্টব্য বলতে আছে শতাব্দীপ্রাচীন বাওবাব গাছ আর নানারকম কারুপণ্যের দোকান। পুরোনো বাওবাব গাছগুলোর গোড়ার দিকটা এত বড় যে কয়েকজন মিলে হাত ছড়িয়ে দিয়েও সে গাছের বেড় পাওয়া যায় না। 
সন্ধ্যায় পানামা গার্ডেন হোটেলে সময়মতো ডিনার সেরে সবাই জড়ো হই মিটিং রুমে। কয়েক সারি চেয়ার। ঘরের মাঝখানে কয়েকটি চেয়ার আলো করে বসে আছেন কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ অভিযাত্রী। সবাই আমাদের ট্রেক সঙ্গী। আমিন ভাই আর মাহবুব ভাই ঢাকা থেকে এসেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে এসেছেন তিনজন লেখক ও গবেষক। আনিসুজজামান, শাহাব ইউনুস আর সাদ কামালী ভাই। এই পাঁচজনের মধ্যে বয়সে কে কতটা প্রবীণ– তা নিয়ে সূক্ষ্ম প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। অনু আমাকে অনুরোধ করে তাদের পেছনে গিয়ে দাঁড়াতে। পাঁচ সিনিয়রকে একসঙ্গে ছবিতে ধরে রাখতে চায়। ওখানে যে কজন জ্যেষ্ঠতার দাবি জানাচ্ছিলেন তারা আমার বয়স জেনে দৃশ্যত নিরাশ হলেন। সদ্য ষাট পেরোনো যে কেউ আমার তুলনায় রীতিমতো তরুণ।
একে একে বাকি সবাই এসে হাজির হন। আমরা ২১ জন। আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে ডেনিস কিলিমানজারো অভিযান বিষয়ে ব্রিফ করবে। ডেনিস ছাড়াও পাঁচজন গাইড, তাদের একজন নারী। সপ্রতিভ, হাস্যোজ্জ্বল এই মেয়েটির নাম হাওয়া। ওর ওপর নির্ভর করা যায় তা শুরু থেকেই দেখেছি। সবচেয়ে বেশি জেনেছি ফেরার পথে, ট্রেকের শেষদিন, যখন হাওয়ার কাঁধে ভর দিয়ে নেমে আসতে হয়েছিল অনেকটা পথ। গাইড হিসেবে আরও আছে এরিক, তওহিদ, হাফিজ ও গ্রেগ। সবাই বেশ মজা করে কথা বলে। আমাদের যাত্রাপথে কী কী করতে হবে, কী করা যাবে না তার নির্দেশনা দেয়। নিজের ব্যাকপ্যাকে কী রাখতে হবে আর কী কী দিতে হবে ডাফেল ব্যাগে। আলোচনার শেষে ডেনিস আবারও জোর দেয় কিলিমানজারো আরোহণের পাঁচটি নিয়মের ওপর। 
রুল নাম্বার ওয়ান, পোলে পোলে... ধীরে ধীরে। রুল নাম্বার টু, ড্রিংক এজ মাচ এজ ইউ ক্যান, দিনে অন্তত তিন লিটার পানি। রুল থ্রি, ইট এজ মাচ এজ ইউ ক্যান। শক্তিদায়ক খাবার– পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে হবে। পাহাড়ে উঠতে এনার্জি দরকার। রুল ফোর, স্লিপ এজ মাচ এজ ইউ ক্যান। রাতে যতটা সম্ভব ঘুমাতে হবে। ঘুমের সময়ও গায়ে যেন কয়েক স্তর কাপড় থাকে। রুল ফাইভ, টেক ফোটোস এজ মাচ এজ ইউ ক্যান। যত পারেন ছবি তুলে নিন। কারণ শতকরা আশি ভাগ অভিযাত্রী দ্বিতীয়বার কিলিমানজারো আসে না।
আগের কয়েক মাস ধরে আমরা নিজেদের তৈরি করেছি এই ট্রেকের জন্য। নিজ নিজ প্রস্তুতি যেমন আছে, তেমনি আছে দলের অন্য সবার কাছ থেকে পাওয়া পরামর্শ ও প্রেরণা। নানা বয়সের নানা পেশার মানুষ নিয়ে তৈরি হয়েছে আমাদের দলটা। এই ট্রেক আট দিনের। লেমোশো রুটে এই কিলিমানজারো অভিযানের পরিকল্পনা করেছে অনু তারেক, তানজানিয়ার একটা এজেন্সির মাধ্যমে। 
গত কয়েক বছরে হিমালয়ে গিয়েছি বারবার। এভারেস্ট বেজক্যাম্প ও অন্নপূর্ণাতে বেশ ক’টি ট্রেক করতে পেরেছি বলে পর্বত অভিযানের কিছু প্রস্তুতি নেওয়া আছে আমার। ট্রেকিং বুটস থেকে শুরু করে জামাকাপড়, টুপি, গ্লাভস, জ্যাকেট, ব্যাকপ্যাক সবকিছু কেনা আছে। আমার ট্রেকিংয়ের সরঞ্জাম মোটামুটি ভালো। তবে এবারের লক্ষ্য আগের চেয়েও কিছুটা উঁচুতে ওঠা। এখন দরকার যথোপযুক্ত শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি। যতই নিয়মিত হাঁটি এবং দৌড়াই পাহাড়ে আমার হার্ট রেট বেশি বেড়ে যায়। অল্পেই হাঁপিয়ে যাই।      
আমাদের ট্রেক শুরু হয় ২০২৫-এর ২৯ জুলাই। প্রথম দুদিন ঘন পাইনবনের ভেতর দিয়ে ট্রেক করে ওপরের দিকে উঠতে থাকি। ঘন সবুজ অরণ্য, নানা রঙের ফুল, অসংখ্য পাখির ডাক আর গাছের উঁচু ডালে বসে থাকা সাদা-কালো কলোবাস বানরের রাজ্য পার হই। পরের দিন পার হয়ে যাই বিস্তীর্ণ ঘাসের প্রান্তর। ঘাসের বন হাওয়ায় দোলে। তাঁবুর দুয়ার চেপে ধরে পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস। দিনের বিভিন্ন সময় পর্বতশিখর ধারণ করে বিভিন্ন রং। সন্ধ্যার কিলিমানজারো পরাবাস্তব, জলরঙে আঁকা।          
চতুর্থ দিনটা বেশ দীর্ঘ মনে হয়। প্রথমে শিরা প্লাটুতে হেঁটে তারপর শৈলশিরা ধরে ট্রেক করে আমরা পূর্বদিকে এগিয়ে যাই। কিবো চূড়ার পথের জংশন পার হয়ে আমরা চলি লাভা টাওয়ারের দিকে, ৪৬৫০ মিটার উচ্চতায়। নাম থেকেই বোঝা যায় প্রাচীনকালে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়েছে এই লাভা টাওয়ার। বিশাল পাথরের টুকরোটি ৯০ মিটার বা ৩০০ ফুট উঁচু। আমরা চার হাজার ৬৫০ মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে টাওয়ার দেখি। একই দিনে ট্রেক করে এত উঁচুতে আরোহণ করেও আবার অনেক নিচে নেমে ক্যাম্পে যেতে হয়। এর নাম এক্লাইমেটাইজেশন।
লাভা টাওয়ার থেকে নিচের দিকে যাওয়ার সময় অনেকটা পথ প্রায় সমতল। অঞ্চলটি আধা মরুভূমি। চারদিকে চূর্ণপাথর আর শুকনো মাটি। কিছু অংশে বড় বড় পাথরের ওপর দিয়ে নিচে নামতে হয়। পাথরের স্তূপে পথ খুঁজে পাওয়া আর নিরাপদে পা ফেলে নিচে নামতে পারা রীতিমতো কঠিন। এ রকম বেশ কিছু খাড়া উতরাই পেরিয়ে কয়েক ঘণ্টায় মোট সাড়ে ৭০০ মিটার নেমে আসি। 
বারাংকো ক্যাম্প তিন হাজার ৯০০ মিটার। এদিন রাস্তা যেন শেষই হতে চায় না। সকালে লাভা টাওয়ারের দিকে চলার সময় একটা চড়াই পার করে ভেবেছি এই বুঝি গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। কিন্তু তারপরেই সামনে আরেকটা দিগন্ত-ছোঁয়া পাহাড় এসে সামনে দাঁড়ায়। বিকেলে লাভা টাওয়ার থেকে নামার সময়ও এ রকম। অনেক কষ্টে সাবধানে পা ফেলে একটা খাড়া উতরাই পার হয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। দূরে কোথাও আমাদের তাঁবুর চিহ্ন দেখতে চেষ্টা করি। একটু পরেই আসে আর একটা পাথরের পাহাড়। ট্রেকিং পোল তুলে রেখে পাথরের ফাঁকে পা ফেলে সাবধানে নামি। এই করে করে শেষ বিকেলে গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছাই। 
ক্যাম্পে পৌঁছানোর ঠিক আগে একটা জায়গাতে বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ফুলের অরণ্য দেখতে পাই। ছোট ছোট গাছে সাদা ও নানা রঙের ফুল। এখানে এই মরুভূমির ভেতরে এমন স্বর্গোদ্যান কীভাবে তৈরি হলো? এত যত্নে কে ফোটাল ফুল? ফুলবাগানের অন্য পাশে বেশ কিছু জায়ান্ট গ্রাউন্ডসেল। সতেজ সবুজ পাতা। আগের দিন হাওয়া বলেছিল এই গাছ থাকা মানে কাছেই কোথাও জলের উৎস আছে। একটু খুঁজতেই পেয়ে গেলাম শীর্ণ একটা ঝরনার ধারা। এখানে মরুর বুকে স্বর্গোদ্যান কীভাবে এলো সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলাম।
শেষ বিকেলে আমরা মেস টেন্টে বসে আড্ডা জমাই। নিচে চারদিকে ছড়িয়ে আছে সাদা মেঘ আর সামনে গরম চা কফি। প্রান্তরের কুয়াশায় উড়ে যায় কাক। রাতে অক্সিমিটার দিয়ে আমাদের অক্সিজেন স্যাচুরেশন মেপে দেখা হয়। কিলিমানজারো আরোহণের পথে বড় একটা বাধার মুখোমুখি হতে হবে কাল ভোরে। দেয়ালের মতো জেগে থাকা পাথরের এই খাড়া পাহাড়ের নাম বারাংকো ওয়াল। পরের দিনই আমরা বারাংকো ওয়াল ধরে ওপরে উঠব।
সকালে নাশতা সেরে সবাই যার যার ব্যাগ গুছিয়ে যথারীতি যাত্রা শুরু করি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ ওপরে উঠে এসেছি আমরা। এমনিতেই ঠান্ডা বেড়েছে। তার ওপর বাতাসের ঝাপটা কাঁপন ধরিয়ে দেয়। ক্যাম্পের কাছে ঘাসের গায়ে বরফ জমে আছে। পথে তেমন কোনো গাছ নেই। তবে বড় বড় পাথরের পাশে চারপাশ আলো করে ফুটে আছে সাদা ও হলুদ রঙের এভারলাস্টিং ফ্লাওয়ার। 
যাত্রা শুরুর আগেই বলে দেওয়া হয়, আজ দল বেঁধে চলা যাবে না। সারিবদ্ধ হয়ে এক লাইনে সবাইকে পথ চলতে হবে। বারাংকো ওয়ালে ওঠার সময় পাথরের গা বেয়ে একজন একজন করে উঠতে হবে। আরোহণের সময় হাত ব্যবহার করতে হয়। ট্রেকিং পোল ভাঁজ করে রাখি। আমাদের ব্যাকপ্যাক পোর্টারদের কাছে। পাথরের খাঁজে পা ফেলে ওপরে উঠতে শুরু করি। কখনও কখনও দুহাতে পাথর ধরে রাখতে হয়। কোনো কোনো জায়গায় ঝুলন্ত পাথরের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য মাথা নিচু করে চলতে হয়। আর মাঝখানে, বিখ্যাত কিসিং স্টোনের সামনে দাঁড়িয়ে দুহাত ছড়িয়ে পাথরটা ধরে খুব সরু একটা পাথরে পা ফেলে অন্য পাশে চলে যাই।
নিচের দিকে তাকালে ভয় করে বেশি। কোনো কোনো জায়গাতে পাথর একটু নড়বড়ে। সামনে পা ফেলার পর পেছনের পা ওঠানোর আগে বুঝে নিতে হয় সামনের পা-টা দৃঢ়ভাবে পড়েছে কিনা। মাঝে মাঝে পা কাঁপে। গাইড পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলে ডোন্ট শেক, ইউ আর ফাইন, ট্রাস্ট ইউর লেগস। কীভাবে এই প্রবীণ পায়ের ওপর বিশ্বাস রাখব?
পাথরের দেয়াল পার হয়ে ওপরে ওঠার পর মনে হলো সত্যিই আফ্রিকার আকাশের কাছে চলে এসেছি আমরা। এতক্ষণে লক্ষ্য করি আজ দারুণ উজ্জ্বল একটা দিন। রোদের মধ্যে মিশে আছে সবুজ ছত্রাক ও ছোট ছোট ঘাসফুলের রং। আনন্দে মেতে উঠি আমরা সবাই। আনন্দ তো কোনো গন্তব্য নয়, চলারই অন্য নাম। আমাদের গাইডদের দল যে কোনো সুযোগেই নেচে গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। আমাদের উৎসাহ দিতে চেষ্টা করে। গান একটাই, সেটাকে নানাভাবে গায় ওরা। জাম্বো জাম্বো, জাম্বো বোয়ানা, হাবারি গানি, মুজুরি সানা। ওয়াগেনি, মোয়াকারিবিশ্ব। কিলিমানজারো হাকুনা মাতাতা। তেমবিয়া পোলে পোলে, হাকুনা মাতাতা। অতিথিরা এখানে স্বাগত... ধীরে ধীরে হেঁটে পৌঁছে যাও কিলিমানজারো... সমস্যা নেই। 
সোয়াহিলি ভাষায় ও সুরে যেন আমার চোখের সামনে দুলে ওঠে রবীন্দ্রনাথের আফ্রিকা। সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী। আমাদের তানজানিয়ান গাইড, পোর্টার ও অন্য সঙ্গীরা নাচে। সেই সুর দোলা দেয় আমাদেরও শরীরে ও মনে। হাওয়ার গান শুনি। অন্য হাওয়া তার নৃত্যের ভেতরে টেনে নেয় জুঁই, মিষ্টি, লিজা ও তিন্নিকে। 

আরও পড়ুন

×