মানচিত্র সবিশেষ
শাহীন আখতার
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমার পুরস্কৃত বইটি ছোটগল্পের। আমার লেখালেখির শুরু ছোটগল্প দিয়ে। প্রথম বইটিও গল্পের ছিল, নাম ‘শ্রীমতীর জীবনদর্শন’। এ পর্যন্ত আমার গল্পের বই ছয়-সাতটি। প্রথম কোনো গল্পগ্রন্থ পুরস্কৃত হলো। সেজন্য পুরস্কারটি আমার কাছে বিশেষ। বইটির নাম ‘মানচিত্র’। এতে চারটি গল্প আছে। গল্পগুলোর বিস্তার কয়েকটি মহাদেশজুড়ে। ভ্রমণের ছোঁয়া থাকলেও ভ্রমণকাহিনি নয়, গল্পই এগুলো। ভ্রমণ ও আবিষ্কার এই গ্রন্থের প্রতিপাদ্য। এখানে আছে দুর্ধর্ষ কিছু অভিযান– বর্তমান ও অতীতকালের। মূলত সমুদ্রপথে। অতীতের সমুদ্রপথগুলো যেন বহু যুগের নিদ্রার পর জেগে উঠেছে। অভিবাসনের প্রয়াসে জাগিয়ে তোলা হচ্ছে। এ পথে অতীতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু নয়, আছে শক্তিধর দেশগুলোর সশস্ত্র বাধা। সমুদ্র, সীমান্ত– প্রতিটিকে একপক্ষীয় রণক্ষেত্র বলা যায়। সমুদ্রপথে প্রবেশের বাধাদানের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ড্রোন, মনুষ্যবিহীন ডুবোজাহাজ, ত্রিমাত্রিক রাডার, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিশ্লেষক যন্ত্র, ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা, নাইটভিশন চশমা প্রভৃতি। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ অফশোর ডিটেনশন ক্যাম্প সাজিয়ে রেখেছে। দরিদ্র বন্দির জন্য দরিদ্র দেশে ভাড়া করা কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। এই অমানবিক কাজটা এ সময়েই হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধবন্দি, পরে যারা ফ্রি ইন্ডিয়া লিজিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তাদের কথা আছে এ বইয়ের একটি গল্পে। আমার ‘অসুখী দিন’ উপন্যাসে নেতাজি সুভাষ বসুর ছায়ামূর্তি আছে। সে মূর্তি আলো ঝলমলে। তাঁর অগ্নিসম ডাকে সাড়া দিয়ে অগণিত মানুষের কীটপতঙ্গের মতো পুড়ে ছাই হওয়া– সেই ঝলমলে ছায়ামূর্তির অপর পিঠ, যা এই গল্পে আছে। এ যুগে যুদ্ধবন্দি কেবল যুদ্ধ করে হয় না। এই সময়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়েও যে বন্দি হয়, অমানবিকতার দিক দিয়ে তার স্ট্যাটাসও যুদ্ধবন্দির মতোই। আমি অফশোর ডিটেনশন ক্যাম্পের কথা একটু আগে বলেছি। পাপুয়া নিউগিনির অফশোর ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি এক ছোট রোহিঙ্গা বালক। সে মুক্ত হওয়ার পথ খোঁজে সমুদ্রে আবার বেরিয়ে পড়বে বলে। নিজ দেশহীন কওমের মানুষের জন্য একটা দ্বীপ আবিষ্কার করতে চায় সে। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে যারা প্রাণ হারায় বা ইউরোপে পৌঁছায়, তারা পেছনে ফেলে যায় নিজের দেশ, নিজের মানুষ। এই অভিবাসনের একরৈখিক কোনো ব্যাখ্যা হয় না। স্থানান্তর, বিচরণ– মানুষের আদিম প্রেরণা। পর্বতসমান বাধার মুখে মানুষের এই দুর্জয় মনোভাব বা স্পৃহা, সমুদ্রের মতোই অশান্ত, নিদ্রাহীন। ব্র্যাক-ব্যাংক ও সমকালকে ধন্যবাদ।
- বিষয় :
- গল্প