ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অনলাইন বন্ধুত্বের ফাঁপা বাস্তবতা

অনলাইন বন্ধুত্বের ফাঁপা বাস্তবতা
×

আরিফুল ইসলাম রাফি 

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

যে সময়ে সরাসরি সাক্ষাৎ কঠিন, সময় সংকুচিত এবং শহরগুলোতে ভিড়ের মধ্যে একাকিত্ব ঘন হয়েছে, সেই সময়ে অনলাইন বন্ধুত্ব অনেকের কাছে এক বিকল্প হাজির করেছে। কথা বলা, হাসাহাসি, সমর্থন এবং কখনও কখনও আবেগিক আশ্রয়ের সন্ধান পায় মানুষ। এ বন্ধুত্ব কতটা অর্থপূর্ণ, সে প্রশ্নও ইতোমধ্যে উঠেছে।

মানুষ বন্ধুত্ব করে মূলত বোঝা ভাগাভাগি করতে, চিন্তায় সঙ্গী খুঁজতে, জীবনের প্রশ্ন ও আনন্দ নিয়ে কথা বলতে। বাস্তব বন্ধুত্বে এই ভরসা গড়ে ওঠে সময়, আচরণ, উপস্থিতি ও দায়িত্বের ওপর। অনলাইনে এই উপাদানগুলো আংশিক বা প্রতিস্থাপনমূলক রূপে আসে। সেখানে উপস্থিতির স্থানে থাকে ‘অনলাইন স্ট্যাটাস’, সময়ের স্থানে থাকে ‘রিপ্লাই স্পিড’, দায়িত্বের স্থানে থাকে ‘লাইক, হার্ট বা রিঅ্যাকশন’। ফলে সম্পর্ক জন্ম নেয়, কিন্তু যে মূল উপাদানগুলো বন্ধুত্বের ভিত্তি তৈরি করে তা নড়বড়ে হয়ে যায়।  বাংলাদেশের শহরের তরুণরা অনলাইন বন্ধুত্বের প্রধান ভোক্তা। কারণ নগরজীবন ব্যস্ত ও চাপপূর্ণ। পরিবার, পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, সামাজিক প্রতিযোগিতা–সব মিলিয়ে বাস্তব বন্ধুত্বের জন্য অবসর কমে যায়। ফলে মানুষ এমন বন্ধুত্ব খুঁজে, যেখানে ঝামেলা কম, ব্যাখ্যা কম, প্রত্যাশা কম। অনলাইন সম্পর্ক সেই সহজতা দেয়, যদিও সেই সহজতাই তার দুর্বলতা। কারণ কম প্রত্যাশা মানে কম দায়িত্ব; কম দায়িত্ব মানে কম গভীরতা। ফলে সম্পর্ক সহজেই ছিঁড়ে যায়, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে না। বাস্তব বন্ধুত্বে ঝগড়া মানে বিচ্ছেদ নয়; অনলাইনে ঝগড়া মানে ব্লকড বা আনফ্রেন্ডেড।

বাস্তব জগতে যে কথা সহজে বলা যায় না, সমাজ, পরিবার বা আত্মীয়ের চাপে সেগুলো অনলাইনে সহজে বলা যায়। ফলে অনলাইন বন্ধুত্ব অনেকের জন্য মানসিক সেফ স্পেস হয়ে ওঠে। এখানে সমস্যাটা ফাঁপা নয়, বরং নিরাপত্তাহীনতা। কারণ সেই সেফ স্পেস প্রায়ই অস্থায়ী। বাস্তব সম্পর্ক ভাঙলে মানুষ কারও মুখোমুখি হয়, অভিযোগ করতে পারে, গুছিয়ে নিতে পারে; অনলাইনে সম্পর্ক ভাঙে নিঃশব্দে, চিহ্ন ছাড়া।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অনলাইনে মানুষ নিজের এমন সংস্করণ দেখায়, যা সে দেখাতে চায়। সে তার দুর্বলতা লুকাতে পারে, সাফল্য বড় করে বলতে পারে, ছবি বাছাই করে আপলোড করতে পারে কিংবা কণ্ঠস্বর সামলে নিতে পারে। ফলে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এডিটেড সেলফের ওপর, যা বাস্তবে একেবারেই ভিন্ন রকম। এ ধরনের বন্ধুত্বে ফাঁকিবাজি তাই অনিবার্য।
অনলাইন বন্ধুত্ব একদিকে এটি মানুষের নিঃসঙ্গতা কমাবে, অন্যদিকে মানুষকে আরও একা করে ফেলতে পারে। কারণ সঙ্গ পাওয়া গেলেই একাকিত্ব দূর হয় না; সঙ্গের স্থায়িত্বই একাকিত্বকে প্রতিস্থাপন করে। 

আরিফুল ইসলাম রাফি: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×