ইটভাটার আগুনে পুড়ছে বান্দরবান
এম. ডি জিয়াবুল
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বান্দরবানের পাহাড় প্রকৃতির এক দুর্লভ কাব্য। এখানে মেঘ পাহাড় ছুঁয়ে নামে, বৃষ্টি ঢাল বেয়ে গড়িয়ে যায়, বন তার নিজস্ব ছন্দে নিশ্বাস নেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই নৈসর্গের ভেতর লামা উপজেলার এক ফাইতং ইউনিয়নেই ত্রিশের অধিক ইটভাটায় ব্যবহারের জন্য পাহাড় থেকে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এটি শুধু একটি পাহাড় বা একটি ইউনিয়নের পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাটির জোগান এবং সেই জোগানের পরিবেশগত মূল্য।
ইট আমাদের সভ্যতার নির্মাণে বহুল ব্যবহৃত উপকরণ। ঘর, দেয়াল, প্রতিষ্ঠান, সড়ক–অসংখ্য স্থাপনার সঙ্গে ইটের সম্পর্ক। কিন্তু একটি ইটের জন্মকথা আমরা খুব কমই ভাবি। চুল্লির আগুনে পুড়ে শক্ত হয়ে ওঠার আগে তার শরীর আসে মাটি থেকে। সেই মাটি যদি আসে পাহাড়ের বুক চিরে, তাহলে প্রতিটি ইটের আড়ালে একটি অদৃশ্য প্রশ্ন থেকে যায়, এই নির্মাণের জন্য প্রকৃতির কাছ থেকে আমরা কতটা নিয়েছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে মাটি সংগ্রহের উৎস। ফাইতংয়ের কোন কোন পাহাড় থেকে মাটি নেওয়া হচ্ছে, কত পরিমাণে নেওয়া হচ্ছে, কারা নিচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের বৈধ অনুমোদন আছে কিনা–এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রয়োজন। কারণ, পাহাড় কাটার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে অনুমান, গুজব কিংবা বিচ্ছিন্ন অভিযোগ দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি চোখের সামনে দৃশ্যমান পরিবর্তনকে উপেক্ষা করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
পাহাড়ের মাটি সমতলের সাধারণ মাটির মতো নয়। পাহাড়ের ঢাল, মাটির স্তর, গাছের শিকড় এবং বৃষ্টির প্রবাহ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি ঢাল থেকে মাটি সরিয়ে দিলে সেখানে থাকা গাছপালার স্বাভাবিক ভিত্তি দুর্বল হয়। মাটির ওপরের স্তর সরে গেলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচের দিকে নেমে যেতে পারে। ফলে মাটিক্ষয় বাড়ে, জলধারায় পলি জমতে পারে, নিচু এলাকার জমি ও পথঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এখানে স্থানীয় মানুষের স্বার্থও বিবেচনায় আসতে হবে। পাহাড়ের সঙ্গে তাদের জীবনযাত্রার সম্পর্ক গভীর। জলধারা, কৃষিজমি, বন, যোগাযোগব্যবস্থা সবকিছুর ওপর পাহাড়ের প্রভাব রয়েছে। পাহাড়ের পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রথম অভিঘাত অনেক সময় স্থানীয়
জনগোষ্ঠীকেই বহন করতে হয়। তাই মাটি উত্তোলনের অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি এর সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্যও হিসাবের মধ্যে রাখা দরকার।
ইট তৈরির জন্য বিকল্প ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি জরুরি। প্রযুক্তির উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার এবং মাটির উৎস নিয়ন্ত্রণ এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ভাবনা দরকার।
এম. ডি জিয়াবুল: বান্দরবান
পার্বত্য জেলা
- বিষয় :
- ইটভাটা