ইংলিশ চ্যানেলে সাগরের নতুন ইতিহাস
মাহফিজুর রহমান সাগর
আবু তাহের
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪১ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৫ | ১৩:৪৫
মাহফিজুর রহমান সাগর প্রথম ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন অলিম্পিক দিয়ে। ২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকে অংশগ্রহণের সুযোগ পান দেশের এ পেশাদার সাঁতারু। পরেরবার ২০১৬ সালে রিও অলিম্পিকেও অংশগ্রহণের সুযোগ আসে সাগরের কাছে। সাঁতারে পর পর দুবার অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করা দেশের একমাত্র পুরুষ অ্যাথলেট তিনি। সাগর পাবনার মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান টিংকু এবং মসকুরা খাতুন নিলুর সন্তান। এবার তিনি ইতিহাসের পাতায় উঠে এসেছেন ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে। গত ২৯ জুলাই তিনি এই গৌরব অর্জন করেন।
সাঁতারু জীবনের মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন সাগর। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নাবিক হিসেবে কর্মজীবন শুরুর পর অবসর গ্রহণ করেন ২০২৩ সালে। কাজ করেছেন বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশনের সহকারী কোচ হিসেবে। তবে কর্মব্যস্ততাময় জীবনেও থেমে থাকেনি তাঁর ইতিহাস নির্মাণের চেষ্টা। এবার পাড়ি দিয়েছেন আটলান্টিক মহাসাগরের বাহু ইংলিশ চ্যানেল, যা বিভক্ত করেছে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সকে।
ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার আগে সাগর জানান, মূলত ইংলিশ চ্যানেলের দৈর্ঘ্য ধরা হয় ৩৪ কিলোমিটার। কেউ কখনও সরাসরি ৩৪ কিলোমিটার সাঁতরাতে পারে না। কারণ এখানে স্রোত থাকে, ঢেউ থাকে। এটা কমবেশি প্রায় ৪০ কিলোমিটারের মতো হয়ে থাকে। কখনও এটা ৫০-৬০ কিলোমিটারও হয়ে যায়।
পেছনের সব সাফল্য, তিন মাসের পরিশ্রম, সাধনা ও প্রচেষ্টা সাগরকে সাহস জুগিয়েছে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে। এ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে সাগর শুনিয়েছেন তাঁর সাফল্যের কথা। তিনি বলেন, ‘সাঁতার শুরুর আগে-পরে বা মাঝে কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল, যা কিছুটা শঙ্কাও তৈরি করেছিল। রাত আড়াইটার পর সাঁতার শুরু করা অন্যরকম অভিজ্ঞতা, নতুনও বটে। পানিতে নামার পর অনুভব করলাম প্রচণ্ড ঠান্ডা, তার ওপর ঢেউয়ের বিপরীতে সাঁতার কাটতে হয়েছে। সাঁতার শুরু করার আগে বমি করছিলাম এবং সবকিছু এলোমেলো লাগছিল। শুরু করার সময় অভিজ্ঞতাও ভালো ছিল না। তার ওপর পানির মধ্যে জেলিফিশ ছিল, লবণাক্ত পানি এবং আমাকে কত ঘণ্টা সাঁতরাতে হবে সেটি জানা ছিল না। এ ছাড়া সাগরকেন্দ্রিক অসুস্থতার শঙ্কাও ছিল। সাঁতার শুরুর পর মাঝপথে ছেড়ে দেওয়ার শঙ্কাও ছিল। তবে কোনো শঙ্কায়ই শেষ পর্যন্ত আমাদের ওপর জেঁকে বসতে পারেনি। ১২ ঘণ্টা ১০ মিনিট সাঁতরে লক্ষ্যপূরণ করে মনে হয়েছে, এত দিনের পরিশ্রম সফল হলো। বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে সফলতা আনতে পেরেছি।’
সাগরের দেশীয় প্রতিযোগিতায় সাফল্যও কম নয়। তিনি ২০০১ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ভর্তি হন। অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতার ১৫০০ মিটার ফ্রি স্টাইলে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। ২০০৮ সালে বিকেএসপি থেকে জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সেরা সাঁতারুর খেতাব অর্জন করেন। ২০১০ সালে সাফ গেমসে তিনটি ইভেন্টে ৫০ মিটার ফ্রি স্টাইলে ব্রোঞ্জ, ১০০ মিটার ফ্রি স্টাইলে সিলভার এবং ৪x১০০ মিটার রিলেতে রৌপ্যপদক পান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সাঁতারে বিশ্ববিদ্যালয়কে চ্যাম্পিয়ন করেছেন। ২০১৭ সালে পঞ্চম বিশ্ববিদ্যালয় গেমস সাঁতারে রেকর্ড গড়েছিলেন। বাংলাদেশ আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া সংস্থা আয়োজিত বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় গেমসের ১২টি ইভেন্টে অংশগ্রহণ করে ১২টিতে স্বর্ণ জিতেছিলেন।
সাগর যে ইতিহাস এখন গড়লেন বাংলাদেশের জন্য, এর শুরুটা কিংবদন্তি সাঁতারু ব্রজেন দাসের হাত ধরে ১৯৫৮ সালে। তিনি শুধু বাঙালি নন, দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সাঁতারু, যিনি ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছেন। ১৯৬৫ সালে আব্দুল মালেক ও ১৯৮৮ সালে মোশাররফ হোসেন পাড়ি দেন ইংলিশ চ্যানেল। এবার লাল-সবুজের পতাকা বিশ্বের দরবারে উঁচিয়ে ধরে ইতিহাস গড়লেন সাগর।
- বিষয় :
- ইংলিশ চ্যানেল
- সাঁতার
