চলনবিলের নৌকাবাইচ
সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার রাধাকান্তপুর খেয়াঘাট থেকে তোলা ছবি :: লেখক
এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৪ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৬:০৭
ইতিহাস-ঐতিহ্যের লীলাভূমি চলনবিলে বর্ষাকালে আবহমান বাংলার পাড়াগাঁয়ের মানুষের সুস্থ ও নির্মল বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ ‘নৌকাবাইচ’। চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রায় ২৯টি নদনদীর মধ্যে রয়েছে–গুমানি, আত্রাই, বড়াল, ফুলজোড়, চিকনাই, গৌর, সরস্বতী ইত্যাদি। বর্ষা মৌসুমে এখনও বিলের জলায়তন থাকে প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটার। এ বছর বর্ষা মৌসুমে চলনবিল অঞ্চলের বিভিন্ন নদী ও জলাভূমিতে বেশ কয়েকটি নৌকাবাইচ আয়োজন করা হয়। এ নিয়ে লিখেছেন এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল
------------------------------------------------------------------
নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলা সদর থেকে বিলসা বিলের দূরত্ব প্রায় ছয় কিলোমিটার। গত ১২ সেপ্টেম্বর সেখানে নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়। সকাল থেকেই বিলের ধারে লোকজন জড়ো হতে থাকেন। সাড়ে ১১টা নাগাদ তা লোকারণ্যে পরিণত হয়। কয়েক কিলোমিটার ধরে জনস্রোতের পাশে বসে ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামগ্রীর পসরা। প্রায় ৪০ বছর পর আত্রাই নদে ‘মা জননী’ সেতুর নিচে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে জেলা প্রশাসন।
আয়োজকরা জানান, এই নৌকাবাইচে নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা থেকে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়েছে। বিভিন্ন জেলার ২১টি দল প্রতিযোগিতায় নাম লেখালেও মূল প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় ১২টি নৌকা। সন্ধ্যা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় এই ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। প্রতিটি নৌকার সঙ্গে এসেছে আরও কয়েকটি নৌকাবোঝাই সরঞ্জাম। আবার অনেকে বিলে নৌকায় করে প্রতিযোগীদের পাশে চলে নৌকাবাইচ দেখেছেন।
নৌকাবাইচ দেখতে আসা তরুণী সুস্মিতা রানী জানান, চলনবিল অঞ্চলে নৌকাবাইচে এখনও লাখো দর্শকের উপস্থিতি জানান দেয়, এটি এখনও আমাদের জন্য এক নির্মল আনন্দের বিষয়। প্রথমবারের মতো নৌকাবাইচ দেখতে এসেছিলেন শিক্ষার্থী সারোয়ার আমিন। তিনি ঢাকায় এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। বলেন, এর আগে তিনি এমন অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করেননি। নৌকাবাইচে মাল্লাদের দক্ষতার চেয়েও লাখো মানুষের সমাগম দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। তাঁর পাশেই নাটোর শহর থেকে আসা চাকরিজীবী শাহেদ আলী জানান, তিনি পাশের এক আত্মীয়ের বাড়িতে গোটা পরিবার নিয়ে এসেছেন একদিন আগেই। সবাই মিলে নৌকাবাইচ দেখতে জড়ো হয়েছেন সেতুর পাশে।
এই অভূতপূর্ব দৃশ্য চলনবিলের সবগুলো নৌকাবাইচ আয়োজনেই দেখা গেছে। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার কালীগঞ্জ খেয়াঘাটে ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। রামকান্তপুর খেয়াঘাটে চূড়ান্ত পর্বের নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয় ৯ সেপ্টেম্বর। সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরে নৌকাবাইচ আয়োজন করা হয় ২৯ আগস্ট। এ ছাড়া সিংড়ার নিয়ামত খালে, পাবনার চাটমোহরের চিকনাই নদীর গুররী পয়েন্টে, ফরিদপুরের বিলে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আবার বিলপাড়ের কয়েকটি স্থানে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
তবে চলনবিল অঞ্চলের নৌকাবাইচের গল্প অনেক পুরোনো। গীত, জারি, লাছারি গেয়ে ৪০ থেকে ১২৫ জন পর্যন্ত বৈঠিয়াল বা মাল্লার সরু ৪০, ৫০ বা ১০০ ফুটের বাইচের নৌকায় গাওয়া সেই হারানো দিনের গীত বা জারি গান এখনও এই জনপদের প্রবীণ ও মধ্য বয়সীদের মুখে মুখে ফেরে। সত্তরের দশকে যখন বর্ষাকালে নৌকাবাইচ হতো তখনকার জনপ্রিয় গীত ছিল– ‘জোরে জোরে মারো টান/হেঁইও/মকসুদ মোকামে যাব হেঁইও/ আল্লাহ বলো, রসুল বলো, হেঁইও...।’ আবার এ রকম গীতও ছিল– ‘বৈঠা ঝাঁকে তোল বৈঠা ঝাঁকে তোল/মুখে আল্লাহ বোল/বাড়িত যাইয়া খাবো আমরা বাইট্কা মাছের ঝোল...।’ বর্তমানে গাওয়া হয়–‘হাতে লাগে ব্যথা রে/হাত ছাইড়া দাও সোনার দেওড়া রে...’। এগুলো বোল, গীত, জারি, সারি আবার অঞ্চলভেদে কাওয়ালি বা লাছারি নামেও পরিচিত। নৌকাবাইচের সময় বৈঠা মারার তালে তালে বৈঠিয়াল-মাঝিমাল্লারা এসব গান করেন। বাইচের সময় পিতলের তৈরি খঞ্জরি বা করতাল, ঢোল, মন্দিরার মতো লোকজ বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়। বাইচের নৌকার গলুইয়ে (নৌকার অগ্র ও পেছনের বর্ধিত অংশকে বলা হয়) থাকা অথবা মাস্তুল ধরে হাল ধরা মাঝির দিকনির্দেশক, মাল্লাদের উৎসাহ দাতাখ্যাত ‘সারেং’, যা চলনবিলাঞ্চলে ডাহক বা গায়ক নামে পরিচিত।
চলনবিলে নৌকাবাইচের সঠিক, সুনির্দিষ্ট কোনো ইতিহাস নেই। তবে নৌকাবাইচ মধ্যযুগের নবাব-সুবেদার বা ভূস্বামীদের উদ্যোগে শুরু হওয়া একটি প্রতিযোগিতা বলে ধারণা করা হয়। বিশেষ করে চলনবিলের প্রবীণ ব্যক্তিদের ভাষ্য, বিশাল জলায়তনের এ বিলে বর্ষাকালে যখন গ্রামের মানুষের হাতে কাজকর্ম কম থাকে, তখন আনন্দ ও বিনোদন পেতেই এলাকাভেদে নৌকাবাইচের আয়োজন করা হতো; যা অজপাড়াগাঁয়ের মানুষের একটি ঐতিহ্যবাহী বা প্রতিযোগিতামূলক বার্ষিক খেলা।
ইতিহাস থেকে আরও জানা যায়, ‘বাইচ’ শব্দটি থেকে ধারণা করা হয় মধ্যযুগের নবাব, সুবেদার এবং ভূস্বামীরা নৌবাহিনী ব্যবহার করতেন। তখন নৌ-সেনাদের দক্ষতা বৃদ্ধি অথবা প্রতিযোগিতামূলক আনন্দ-বিনোদনের জন্য নৌকাবাইচের সূত্রপাত করেছিলেন। তবে এর আগে থেকেই হয়তো বিলবাসী নিজেরাই প্রতিযোগিতামূলক নৌকাবাইচের আয়োজন করে আসছেন; যার জনপ্রিয়তা একুশ শতকেও একবারে গতি হারায়নি।
বলা বাহুল্য, চলনবিল অঞ্চলে নৌকাবাইচের বহু বছরের কিছু রেওয়াজ আছে। যেমন ব্যক্তির নামে নাও। মোবারকের নাও, আয়েজ উদ্দিনের নাও, কফিল মণ্ডলের নাও আবার সোনার তরী, বাংলার বাঘ, আল মদিনা, সোনার বাংলাসহ নানা নামের বাইচের নৌকা আছে। নৌকার মালিক একক ব্যক্তি হতে পারেন; অথবা গ্রামবাসী।
বাইচের নৌকা শিমুল সুন্দরী, শিলকড়ই, শাল, গামারি, সেগুন কাঠের হতে হয়। অতীতে যে কাঠগুলোর বেশির ভাগ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসত। সেটি চলনবিলের নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার আসানগঞ্জের হাট থেকে বেশির ভাগই কেনা হতো। এসব কাঠের ৫০ থেকে ১০০ ফুট দৈর্ঘ্যের বাইচের নৌকা তৈরিতে এখন ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা খরচ হয়। এখানেই শেষ নয়। বাইচের নৌকার দুই গলুইয়ে রুপা বা পিতলের তৈরি অলংকার পরিয়ে সাজগোজ করতেন শৌখিন নাইয়ারা। পাশাপাশি ১০০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি নৌকায় ৭০ জনের মতো বৈঠিয়াল বসে বৈঠা চালাতে পারেন।
চলনবিলাঞ্চলে নৌকাবাইচের নানা রেওয়াজ আছে। প্রতিযোগিতামূলক নৌকাবাইচের আগে বিলে বাইচের মাল্লা, মাঝিরা কয়েকদিন প্রশিক্ষণ নেন। পাশাপাশি নৌকার মালিক ব্যক্তি হলে তিনি বাইচের খরচ নিজেই বহন করেন। এমনকি বাইচের দিন ভালো খাবার খাওয়ানো হতো বাইচের মাল্লা, মাঝি, ডাহকসহ গ্রামের গণ্যমান্যদের। এ ছাড়া প্রতিযোগিতায় জয়ী হলে উদযাপনের জন্য ফের গরু-খাসি জবাই দিয়ে ‘মেজবানি’র আয়োজন করা হয়। নৌকাবাইচে শরিক হতে বা আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামবাসী একত্র হয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি থেকে নৌকাবাইচের খরচ বাবদ টাকা, চাল তোলার স্বতঃস্ফূর্ত রেওয়াজ আজও অমলিন।
বাইচে নৌকা থাকাটা তাদের কাছে গর্বের বিষয় বা পরিবারটি বনেদি, সম্মানিত–সেটি প্রমাণের বিষয়। নৌকাবাইচে চলনবিলাঞ্চলে পুরস্কারের ব্যবস্থাটাও বেশ প্রাচীন সত্তর থেকে আশির দশক পর্যন্ত ত্রিভুজ আকৃতির কাঠ, সোনা, রুপার মিশ্রণে তৈরি করা ছোট-বড় ‘সিল্ড’/রুপার কাপ উপহার দেওয়া হতো বাইচে বিজীত ও বিজয়ী দলকে। পরে রেডিও, টিভি, ক্যারম বোর্ড দেওয়া হতো। উপহার যা-ই হোক প্রাচীনকাল থেকে চলনবিলের নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার মানুষের প্রাণের উৎসব ছিল। নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান স্থল নদী, খাল, বিলের সেই জনপদে বসত মেলা। বাবার কাঁধে চেপে হাজার হাজার দর্শকের ভিড়ে ঘাড় উঁচিয়ে দেখা যায়, যায় না–এমন নৌকাবাইচ দেখার স্মৃতিকাতর প্রবীণরা সেই অতীতে নির্মল আনন্দ পেয়েছেন।
একুশ শতকে চলনবিলবাসী সংখ্যার নিরিখে নৌকাবাইচের চলমান আয়োজন কম হলেও নৌকাবাইচ আজও তার ঐতিহ্য ধরে রেখে ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন তুলে ধরছেন। চলনবিলে এখনও কোথাও নৌকাবাইচের আয়োজন হলে হাজার হাজার নৌকা ও নারী-পুরুষ আবালবৃদ্ধবনিতা নির্বিশেষে লাখো মানুষের উপস্থিতি জানান দেয় ‘চলনবিলের নৌকাবাইচ’ আজও বিলবাসীর সবুজ, সতেজ বিনোদনের অন্যতম উপকরণ।
