ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এক অদম্য অভিযাত্রীর গল্প

এক অদম্য অভিযাত্রীর গল্প
×

ইকরামুল হাসান শাকিল

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৫ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম বাগচালা। চারদিকে শালবন, বর্ষায় বন্যা হলেও লালমাটির গ্রামটা থাকে শুকনো ও স্থির। এই গ্রামের এক দুরন্ত ছেলে একদিন নিজের দেশ তো বটেই, পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেবে তেমনটা কেউ ভাবতেও পারেননি হয়তো। সেই ছেলেটিই এভারেস্টজয়ী ইকরামুল হাসান শাকিল। যিনি শুধু একজন পর্বতারোহী নন; তিনি একাধারে পরিবেশকর্মী, থিয়েটারকর্মী, লেখক এবং বিশ্বরেকর্ডধারী অভিযাত্রী। তাঁর জীবনের গল্প লিখেছেন শাহেরীন আরাফাত

শৈশব ও শিকড়ের টান
শাকিলের জন্ম ও বেড়ে ওঠা গাজীপুরের বাগচালা গ্রামে। শৈশব কেটেছে দুরন্তপনায়। তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি ছিলেন ‘একজন ডানপিটে ছেলে’। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির সঙ্গে গভীর বন্ধন ছিল তাঁর। বাবা ছিলেন পরিশ্রমী কৃষক, যিনি ২০১৯ সালে প্রয়াত হন।
শাকিল গর্বের সঙ্গে বলেন, ‘আমরা এখনও নিজেদের জমিতে চাষ করি, নিজেদের ধানেই পুরো বছর চলে।’ তাঁর মা-কে তিনি বলেন ‘একজন শিক্ষিত কৃষক’; যিনি সংসার, কৃষি আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ সবকিছু সামলেছেন অসাধারণভাবে।

বাবা মায়ের সঙ্গে শাকিল
পড়াশোনার শুরু বাগচালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বাবার ইচ্ছায় উচ্চাভিলাষ নয়, বরং কর্মমুখী শিক্ষায় মন দেন এবং পরে টেক্সটাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেন। ছোটবেলায় তাঁর স্বপ্নগুলো ছিল অদ্ভুত ও মজার। একসময় তিনি হতে চেয়েছিলেন সাপুড়ে, বেদেদের সাপের খেলা তাঁকে মুগ্ধ করত। কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে কেঁচো ধরে সেগুলোকে সাপ ভেবে বাড়ি আনতেন। ফলে মায়ের হাতের মারও জুটত বেশ! পরে চেয়েছিলেন গ্রাম পুলিশ হতে। কারণ তাঁর চোখে চৌকিদারের লাঠিই ছিল ‘ক্ষমতার প্রতীক’। এই দুটি স্বপ্নই ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, আর ভাগ্য নিয়ে আসে তাঁকে ঢাকায়। নতুন জীবনের সূচনায়।

থিয়েটারে আত্মপ্রকাশ
২০০৯ সালের শেষদিকে ঢাকায় এসে যোগ দেন ‘পদাতিক নাট্য সংসদ বাংলাদেশ’-এ। লাজুক ও অস্পষ্ট উচ্চারণের এক গ্রামের ছেলে থেকে তিনি হয়ে ওঠেন আত্মবিশ্বাসী, সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল একজন মানুষ।
থিয়েটার তাঁকে শিখিয়েছে চোখে চোখ রেখে কথা বলা, মানুষের সঙ্গে মিশে কাজ করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিজের কাজ নিজে করা ও চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার নাগরিক বোধ।

পর্বতারোহণে প্রথম পদক্ষেপ
২০১২ সালে পর্বতারোহী এম এ মুহিত ও নিশাত মজুমদারের এভারেস্টজয়ের পর গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেখে শাকিলের জীবনে স্বপ্নে মোড় আসে। সাক্ষাৎকারে মুহিত বলেছিলেন, ‘পর্বতারোহণ একটি খেলা, আমাদের একটি ক্লাব আছে, সেই ক্লাবে তরুণদের আমরা সুযোগ দিচ্ছি।’
এই এক কথাই তাঁর মনে আগুন জ্বেলে দেয়। দীর্ঘ এক বছর চেষ্টার পর নিশাত মজুমদারের মাধ্যমে মুহিতের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং প্রথমেই ফোনে সরাসরি বলেন, ‘মুহিত ভাই, আমি এভারেস্টে যেতে চাই।’ মুহিত পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি কখনও দিনভর হেঁটেছেন? ৪০-৫০ কিলোমিটার?’
প্রশ্ন শুনেই শাকিলের জেদ জেগে ওঠে। এক ভোরে উত্তরা থেকে সালনা পর্যন্ত হেঁটে যান প্রায় ৪০ কিলোমিটার! এই অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাঁকে নিয়ে আসে বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্র্যাকিং ক্লাব (বিএমটিসি)-এ। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকা পর্যন্ত ১১ দিনে একা হেঁটে আসেন, যা ছিল তাঁর প্রথম কোনো অভিযান। এর পর ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হকের সুপারিশে তাঁকে ক্লাবের সদস্য করে নেওয়া হয়।
২০১৪ সালে ক্লাবের উদ্যোগে তিনি ভারতের উত্তর কাশির নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং-এ মৌলিক প্রশিক্ষণ নেন, যেখানে তিনি ‘এ’ গ্রেড অর্জন করেন এবং একই প্রতিষ্ঠান থেকে ২০১৮ সালে পর্বতারোহণের উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন। ২০১৫ সালে মুহিতের নেতৃত্বে নেপালের মাউন্ট কেয়াজো-রি (২০ হাজার ২৯৫ ফুট) অভিযানে অংশ নিয়ে প্রথমবারেই সফলভাবে চূড়া স্পর্শ করেন।

স্বপ্নপূরণের অভিযানে শাকিল
 

সংগ্রাম ও সমর্থনের গল্প
শাকিলের পথ মোটেও সহজ ছিল না। সবচেয়ে বড় বাধা অর্থ ও প্রশিক্ষণ সুবিধার সীমাবদ্ধতা।
পর্বতারোহণ ব্যয়বহুল; এক মাসের প্রশিক্ষণেই খরচ হয় লাখ টাকার বেশি। স্পন্সর না পেয়ে অনেকেই মাঝপথে থেমে যান। তাছাড়া বাংলাদেশে উচ্চতর পর্বত বা বরফচূড়া না থাকায় প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে যেতে হয়। তবুও তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পরিবার। বিশেষ করে বাবা, যিনি সব সময় জিজ্ঞাসা করতেন, ‘তুমি আবার কবে পাহাড়ে যাবা? এভারেস্টে কবে যাবা?’ এবং তিনি বলতেন, ‘তুমি যখন এভারেস্ট জয় করে ফিরবে, তখন ব্যান্ডপার্টি বাজিয়ে গ্রামের সব মানুষ নিয়ে গিয়ে তোমাকে বিমানবন্দরে রিসিভ করব, প্রয়োজনে জমি বিক্রি করে হলেও।’ বাবার মৃত্যুর পর মা-ই ধরে রেখেছেন সেই সাহস ও প্রেরণার উত্তরাধিকার।

সি টু সামিট
এক নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়ার তাড়নায় নয়, বরং নিজের দেশকে গর্বিত করতে তিনি শুরু করেন এক ব্যতিক্রমী অভিযান, ‘সি টু সামিট: এভারেস্ট অভিযান’।
অভিযান: সমুদ্র সমতল (ইনানী, কক্সবাজার, বাংলাদেশ) থেকে হেঁটে এভারেস্টের চূড়া পর্যন্ত আরোহণ।
দূরত্ব: প্রায় ১ হাজার ৩৭২ কিলোমিটার।
সময়: ৮৪ দিন।
উদ্দেশ্য: ‘বিট প্লাস্টিক পলিউশন’–এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।
ইউএনডিপির ইয়ুথ অ্যাডভোকেট হিসেবে তিনি এই দীর্ঘ যাত্রাপথে সমুদ্র থেকে হিমালয় পর্যন্ত প্লাস্টিক সংগ্রহ করেছেন, মানুষকে সিঙ্গেল-ইউজড প্লাস্টিক পরিহারে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষ যেখানে যায় সেখানে প্লাস্টিকও পৌঁছে যায়। সমুদ্র, নদী, সমতল, এমনকি এভারেস্টের চূড়াতেও।
চূড়ার পথে মৃত্যু ও লক্ষ্যের যুদ্ধ
এভারেস্ট অভিযানের সামিট পুশে পৌঁছান যখন ‘ডেথ জোন’-এ, তখন ঝোড়ো আবহাওয়া ও শারীরিক অবসাদ তাঁকে টলিয়ে দেয়। সেই মুহূর্তে তাঁর সঙ্গী গ্যালজেন শেরপা জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কী করবে? সিদ্ধান্ত তোমার।’ চোখের সামনে বহু বাধা, ঋণের বোঝা, আর পরিবার-বন্ধুদের প্রত্যাশা মনে পড়ে যায়। মনে প্রশ্ন জাগে, ‘এত দূর এসে কি এখন ফিরে যাব?’ নিজেকেই উত্তর দেন, ‘না, আমি ইতিহাস নিয়েই ফিরব।’
হিলারি স্টেপ পার হওয়ার সময় পায়ের পাশে পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো মুহূর্তের জন্য মন ভেঙে দেয়, কিন্তু ভয় জয় করে এগিয়ে যান। নেপালের সময় সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে তিনি পৌঁছান পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায়। মাত্র ১৩ মিনিট ছিলেন সেখানে। বাংলাদেশের পতাকা তুলেছিলেন, আর মনের ভেতর কাজ করছিল একটাই ভাবনা ‘এখন শুধু বেঁচে ফিরতে হবে।’
ফিরে আসাটাই আসল বিজয়
শাকিল বলেন, ‘চূড়ায় ওঠা যতটা কঠিন, তার চেয়েও কঠিন বেঁচে ফেরা।’ চূড়া থেকে নামার সময়ই অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। তাই তিনি নিজেকে বোঝান ‘এটা একদম সাধারণ পাহাড়, শান্তভাবে নামতে হবে।’ এই মানসিক স্থিরতাই তাঁকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনে। তিনি বলেন, ‘পর্বতের প্রতি প্রেমই আমাকে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে সেখানে নিয়ে যায়। চূড়ায় পৌঁছানো নয়, ফিরে আসাটাই আমার সবচেয়ে বড় বিজয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বপ্নের ওজন হিমালয়ের থেকেও বেশি, যদি তুমি তা বয়ে নিয়ে চলার সাহস রাখো।’ 

উল্লেখযোগ্য অভিযান
২০১৩: কলকাতা থেকে ঢাকা সলো হাইকিং।
২০১৫: মাউন্ট কেয়াজো-রি (সামিট, ২০ হাজার ২৯৫ ফুট), নেপাল।
২০১৭: লারকে পিক (২০ হাজার ৫০২ ফুট), নেপাল।
২০১৮: দ্রৌপদি-কা-ডান্ডা-২ (সামিট, ১৮ হাজার ৭১১ ফুট), ভারত।
২০১৯: হিমলুং হিমাল (সামিট, ২৩ হাজার ৩৮০ ফুট), নেপাল।
২০২২: দোগারি হিমাল (২১ হাজার ৪৪৩ ফুট), নেপাল।
২০২২: ডোলমা খাং (সামিট, ২০ হাজার ৭৭৪ ফুট), নেপাল।
২০২২-২৩: দ্য গ্রেট হিমালয় ট্রেইল (১৭০০ কিলোমিটার), নেপাল।
২০২৫: সি টু সামিট: এভারেস্ট, নেপাল।

প্রকাশিত গ্রন্থ
হেয়ালী ফেরা (২০১১)
মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (২০১৬)
পদচিহ্ন এঁকে যাই (২০১৮)
পর্বতাভিযানে শ্বাসরুদ্ধকর ১৫ ঘণ্টা (২০১৯)
হিমলুং শিখরে (২০২২)
দেবী (২০২২)
দোগারি (২০২৪)
গোমতী থেকে হিমালয় (২০২৪)

আরও পড়ুন

×