সুপারি গাছের খোল থেকে বাসন-কোসন
পটুয়াখালী জেলার রাজাখালী গ্রামে ‘আলপথ গ্রুপ’-এর তৈজসপত্রের এই কারখানায় কাজ করছেন দুই নারী শ্রমিক
মুফতী সালাহউদ্দিন
প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৭ | আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ২১:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
পটুয়াখালীতে সুপারি গাছের খোল সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব প্লেট, বাটি, লবণদানি, চামচ, কাঁটা চামচ, ছুরি, ট্রেসহ নানা ধরনের তৈজসপত্র; যা হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে খাবারে ব্যবহৃত হয়। প্লাস্টিক ওয়ান টাইমের বিকল্প হিসেবে মাটিতে পচনশীল এসব তৈজসপত্রের কারখানা গড়ে তুলেছেন পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের রাজাখালী গ্রামের উদ্যোক্তা তৌকির আহমেদ সাবাব। তিনি ‘প্লাস্টিক রিসাইক্লিং’-এরও কার্যক্রম শুরু করেছেন। তাঁর এ উদ্যোগ ও সম্ভাবনা একদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে, অন্যদিকে এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে।
সুপারি গাছের খোল গ্রামীণ জনপদের একটি পরিচিত জিনিস; যা গাছ থেকে ঝরে পড়ে গাছের নিচেই গলে-পচে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। আবার গ্রামবাংলার কোনো কোনো বাড়ির বউ-ঝিরা গাছের নিচ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে গৃহস্থালির রান্নার কাজে ব্যবহার করেন। সেই সুপারির খোল এখন দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। পরিবেশবান্ধব তৈজসপত্র তৈরি করতে কারখানা গড়েছেন পটুয়াখালীর উদ্যোক্তা তৌকির আহমেদ। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ‘আলপথ গ্রুপ’। তিনি খাতিব-নাসরিন দম্পতির জ্যেষ্ঠ সন্তান।
পটুয়াখালী জেলা সদর থেকে ১৮ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর দিকে এবং দুমকী উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার পূর্বে উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের রাজাখালী গ্রামে রয়েছে ‘আলপথ গ্রুপ’-এর তৈজসপত্রের এ কারখানা। ৩৫ শতক জমির ওপর নির্মিত এ কারখানাটি চলতি বছরের ২৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে উৎপাদন শুরু হয়। তৌকির আহমেদ সাবাব প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রয়েছেন আমান মেহেদী ও ফাহাদ মীর। এ কারখানায় রয়েছে ২০ জন শ্রমিক।
তৌকির আহমেদ বলেন, ‘আমাদের দেশটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে শুধু প্লাস্টিকের কারণে। দেশের প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রসহ সর্বত্র প্লাস্টিকে সয়লাব। যেটিকে আমরা ওয়ানটাইম প্লাস্টিক বলে থাকি। বাংলাদেশে অনেক কারখানা গড়ে উঠেছে বটে, পরিবেশবান্ধব কারখানা খুব কম। এখান থেকেই আমার পরিকল্পনা শুরু এবং ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগোতে থাকি। এ কারণে আমি সুপারি গাছের পরিত্যক্ত খোল ব্যবহারের চিন্তা করি। কারণ, এটি পচনশীল এবং মাটিতেই মিশে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্যই পরিবেশবান্ধব এই তৈজসপত্র বাজারজাত হবে এবং ক্রেতার হৃদয়ে স্থান করে নেবে। সুপারশপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং হোটেল-রেস্তোরাঁর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ চলছে। এসব প্রতিষ্ঠান আমাদের তৈরি পরিবেশবান্ধব তৈজসপত্র ক্রয় ও ব্যবহার করতে আগ্রহী। এটি সম্ভাবনাময় পণ্য, পরিবেশবান্ধব এ পণ্য নিয়ে আমি আশাবাদী।’
কারখানার ব্যবস্থাপক মো. জলিলুর রহমান বলেন, ‘মূলত এখানে পরিবেশবান্ধব কাজ হচ্ছে। প্রথমত আমরা প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে সুপারির খোল দিয়ে ওয়ান টাইম পরিবেশবান্ধব তৈজসপত্র তৈরি করি এবং তা দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাজারজাত করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে এ পণ্যকে মানুষের কাছে কীভাবে সহজলভ্যভাবে উপস্থাপন করা যায়। অন্যদিকে প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে নতুন প্লাস্টিক তৈরি করতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে এলাকার মানুষ উপকৃত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২০ জন শ্রমিক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে কাজ করছেন। এর মধ্যে ১৩ জন নারী এবং সাতজন পুরুষ রয়েছেন।’
প্লাস্টিক রিসাইকেল সম্পর্কে তৌকির আহমেদ বলেন, ‘আমরা বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের ফেলে রাখা প্লাস্টিকগুলো সংগ্রহ করি এবং রং অনুযায়ী বাছাই করা হয়। এরপর ওয়াশে দেওয়া হয় এবং ওয়াশিং মেশিনের পর হাইড্রো মেশিনসহ উন্নত কয়েকটি মেশিনের মাধ্যমে রিসাইক্লিং হয়ে আবার চেয়ার, টেবিল, গ্লাস, মগ, বোতলসহ প্লাস্টিক পণ্য তৈরি হয়।’
পরিবেশবান্ধব তৈজসপত্রের কারিগর মোসা. সুখি আক্তার বলেন, ‘আমরা কখনও দেখিনি সুপারির খোল দিয়ে এত সুন্দর তৈজসপত্র তৈরি করা যায় এবং কীভাবে তৈরি করে তাও জানতাম না। চট্টগ্রাম থেকে প্রশিক্ষক এনে প্রথমে আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারপর আমরা তৈজসপত্র তৈরি শুরু করি।’
আরেক কারিগর বীথি আক্তার বলেন, ‘অচেনা-অজানা মেশিনে কাজ করতে প্রথম প্রথম ভয় লাগত। এখন আর ভয় লাগে না। কাজ শিখতে শিখতে এখন ভালো লাগে। আমরা হাতে গ্লাভস পরি নিই। ফলে হাতে গরমের তাপ লাগে না। আগের চেয়ে এখন সংসারও ভালো চলে।’
শ্রমিকরা জানান, এই আয়ে সচ্ছলতা এসেছে এবং ছেলেমেয়েদের নিয়ে আগের চেয়ে ভালোভাবে চলতে পারছেন।
প্লাস্টিক রিসাইক্লিং শ্রমিক ফরিদা বেগম বলেন, ‘এখানে প্লাস্টিকের পুরোনো ও ভাঙাচোরা মালপত্র যা আসে তা বাছাই করি এবং মেশিনে ভেঙে প্যাকেট করে ঢাকায় পাঠিয়ে দিই।
এরপর সেখানে উন্নত মেশিনের মাধ্যমে নতুন পণ্য তৈরি হয়।’
