ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

দেশে মোটরগাড়ির বিবর্তন

দেশে মোটরগাড়ির বিবর্তন
×

মোমিন মোটরসের মুড়ির টিন

রফিকুর রহমান প্রিয়াম

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৮ | আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপের পলিমাটিতে গড়া বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে ছিল নদীপথের দেশ; যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা আর পালকি, সেখানে বিশ শতকের শুরুতে মোটরগাড়ির আবির্ভাব ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা। আজকের যানজটপূর্ণ ঢাকা দেখে বিশ্বাস করা কঠিন, একসময় এ শহরে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। ব্রিটিশ আমলের আভিজাত্য থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তানের ‘মুড়ির টিন’ বাস এবং পরবর্তী সময়ে জাপানি রিকন্ডিশনড গাড়ির মাধ্যমে মধ্যবিত্তের বাহন হয়ে ওঠার এই ইতিহাস অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। 

ঢাকায় মোটরগাড়ির ইতিহাসের সূচনা হয় ১৯০৪ সালে। সে সময় ঢাকার রাস্তাঘাট ছিল গরুর গাড়ি চলার উপযোগী। কিন্তু আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ঢাকায় প্রথম প্রাইভেটকারটি নিয়ে আসেন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ। কলকাতা থেকে কিনে আনা এ গাড়িটি ছিল তৎকালীন ঢাকাবাসীর কাছে এক জাদুর বাক্স। নবাব পরিবার গাড়ি কিনেই ক্ষান্ত হয়নি, ‘ঢাকা নবাব ফ্যামিলি অটোমোবাইল’ নামে একটি ব্যক্তিগত ডিলারশিপ এবং সার্ভিস সেন্টারও প্রতিষ্ঠা করেছিল। 

১৯৩০-এর দশকে ঢাকায় গাড়ি মেরামতের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হয়। ব্রিটিশ প্রকৌশলীদের দ্বারা পরিচালিত ‘এক্সেল মোটর ওয়ার্কশপ’ ছিল ঢাকার নবাবপুরে অবস্থিত প্রথম ওয়ার্কশপ। এখানেই গড়ে ওঠে স্থানীয় মেকানিকদের প্রথম প্রজন্ম। ১৯৩২ সালে মাওলা বক্স নামের একজন বাঙালি ফোরম্যান এই ওয়ার্কশপের দায়িত্ব পান; যিনি পরবর্তী সময়ে ধোলাইখালের অটোমোবাইল পার্টসের ব্যবসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। 

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটতে থাকে। ১৯৪০-এর দশকে মোমিন মোটর কোম্পানি ইংল্যান্ড থেকে বেডফোর্ড বাসের চেসিস আমদানি শুরু করে। স্থানীয়ভাবে কাঠ ও টিন দিয়ে এই বাসগুলোর বডি তৈরি করা হতো। দেখতে অনেকটা মুড়ি রাখার টিনের মতো হওয়ায় এগুলো লোকমুখে ‘মুড়ির টিন’ নামে পরিচিতি পায়। এই বাসগুলো ছিল অত্যন্ত টেকসই এবং ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত এগুলো ঢাকার রাস্তায় দাপিয়ে বেড়িয়েছে। 

অন্যদিকে, ব্যক্তিগত গাড়ির বাজার ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্পপতি এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দখলে। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ (পিআইএল)। যুক্তরাজ্যের ভক্সহল গাড়ি এবং বেডফোর্ড ট্রাক সংযোজনের মাধ্যমে প্রগতি যাত্রা শুরু করে; যা ছিল এই ভূখণ্ডে গাড়ি সংযোজনের প্রথম বড় উদ্যোগ।

মুক্তিযুদ্ধে দেশের পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে তখন বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট। নতুন গাড়ি আমদানি করা ছিল প্রায় অসম্ভব।
এমন সংকটময় মুহূর্তে আশির দশকের শুরুতে জাপানি গাড়ির প্রবেশ ঘটে। টয়োটা করোলা এবং নিসানের মতো গাড়িগুলো তাদের নির্ভরযোগ্যতা এবং এসি সিস্টেমের কারণে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। 

বাংলাদেশে গাড়ির বাজারে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘রিকন্ডিশনড’ বা জাপানি পুরোনো গাড়ির আধিপত্য। জাপানে ‘শাকেন’ নামক কড়া সেফটি ইন্সপেকশন আইনের কারণে ৩-৫ বছর ব্যবহারের পর গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক বেড়ে যায়। ফলে জাপানিরা খুব কম দামে নতুনের মতো গাড়ি বিক্রি করে দেয়। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এ সুযোগটি কাজে লাগান।
এই বাণিজ্যের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও ব্যবসায়ী আবদুল হক। ১৯৭৪ সালে তিনি হক’স বে অটোমোবাইলস প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরে আশির দশকে রিকন্ডিশনড গাড়ি আমদানির এক বিশাল বাজার গড়ে তোলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জাপানের ৩-৪ বছরের পুরোনো একটি গাড়ি বাংলাদেশের মানুষের জন্য নতুনের মতোই কার্যকর, অথচ দাম অনেক কম।

রিকন্ডিশনড গাড়ির ব্যবসা যখন জমজমাট হতে শুরু করে, তখন এর একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ১৯৯৪ সালে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ রিকন্ডিশনড ভেহিকলস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (বারভিডা)। তাদের নেতৃত্বে এ খাতটি একটি সুশৃঙ্খল শিল্পে পরিণত হয়। তারা সরকারের সঙ্গে শুল্ক নীতি এবং অবচয় সুবিধা নিয়ে দরকষাকষি শুরু করে। কাস্টমস ভ্যালুয়েশনের জন্য ‘ইয়েলো বুক’-এর প্রচলন এই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

২০০০-এর দশকে সিএনজি রূপান্তর প্রযুক্তির আগমন মধ্যবিত্তের গাড়ি কেনার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়। জ্বালানি খরচ কমে যাওয়ায় টয়োটা করোলা, নোয়াহ মাইক্রোবাস এবং প্রবক্সের মতো গাড়িগুলো ঢাকার রাস্তায় সয়লাব হয়ে যায়। 

গত এক দশকে বাংলাদেশের গাড়ির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সরকারের শুল্ক সুবিধার কারণে বর্তমানে টয়োটা অ্যাক্সিও, হোন্ডা গ্রেস এবং টয়োটা সি-এইচআরের মতো হাইব্রিড গাড়ির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। জ্বালানি সাশ্রয়ী হওয়ায় এগুলো এখন বাজারের বড় অংশ দখল করে আছে। ১৯০৪ সালে নবাবের সেই মোটরগাড়িটি থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ যাত্রাপথে এখন রয়েছে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক যানের হাতছানি। 

আরও পড়ুন

×