ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের এক নতুন দিগন্ত

পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের এক নতুন দিগন্ত
×

গাজীপুরের মৌচাক এলাকার বহেরারচালায় অবস্থিত এক্স সিরামিকস কারখানা

 আসাদুজ্জামান

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ২০:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

কুয়াশার চাদরে মোড়ানো শীতের সকাল। রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যখন গাজীপুরের মৌচাক এলাকার বহেরারচালায় অবস্থিত এক্স সিরামিকসের কারখানা প্রাঙ্গণে পৌঁছলাম, তখন কুয়াশা ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে রোদ। বিশাল এলাকাজুড়ে চলছে কর্মযজ্ঞ। তবে সাধারণ কোনো কারখানার চেয়ে এখানকার পরিবেশটা একটু ভিন্ন। কারখানায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল বিশাল স্তূপ করে রাখা সিরামিকের ভাঙা টুকরো বা স্ক্র্যাপ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এগুলো আবর্জনা। তবে এখানেই লুকিয়ে আছে এই কারখানার ‘সবুজ’ হয়ে ওঠার রহস্য।

কারখানার ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল, বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া সিরামিকের ভাঙা টুকরোগুলো যত্ন করে সংগ্রহ করা হচ্ছে। এরপর সেগুলোকে ক্রাশ বা গুঁড়া করে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে নতুন পণ্যের মণ্ডের সঙ্গে। 

এ নিয়ে কথা হয় এক্স সিরামিকস কারখানার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মাসুদুর রহমান তালুকদার শামীমের সঙ্গে। তিনি বলেন, “সাধারণত আধুনিক সিরামিক কারখানাগুলোয় এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য কাঁচামালের অপচয় এবং নতুন কাঁচামাল ও শক্তির ব্যবহার কমানো। ভাঙা সিরামিক পুনর্ব্যবহারের ফলে যেমন বর্জ্য হ্রাস পায়, তেমনি এটি পরিবেশ দূষণ রোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখে। আমরা পুরোদমে সেই ‘গ্রিন’ বা সবুজ পথেই হাঁটছি।’’

সম্প্রতি পরিবেশবান্ধব শিল্প উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার এক্স সিরামিকস গ্রুপকে ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড-২০২৫’ দিয়েছে। পরিবেশ সচেতন প্রযুক্তি, টেকসই উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং সবুজ শিল্প ব্যবস্থাপনার জন্য এ সম্মাননা অর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, লবলং খালের জমি দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ কারখানাটি। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, দূষণের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও একটি কারখানা কীভাবে জাতীয় পর্যায়ের এমন সম্মাননা পায়?

এই প্রশ্নের জবাবে মাসুদুর রহমান শামীম বলেন, “পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা নিয়মিত, এমনকি প্রতি মাসে আমাদের কারখানা পরিদর্শন করেন। ২০০৯ সাল থেকে আমাদের ‘এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট’ (ইটিপি) চালু আছে এবং তা ২৪ ঘণ্টাই সচল থাকে। আমাদের ইটিপির পানি শোধনক্ষমতা প্রতি ঘণ্টায় তিন লাখ লিটার। ফলে কারখানার ব্যবহৃত দূষিত পানি বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’’

লবলং খাল দখলের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘খালের সীমানা নীতি মেনেই আমরা দূরত্ব বজায় রেখেছি। অভিযোগকারীরা যে সীমানার কথা বলেন, তা বর্তমান আইন প্রণয়নের অনেক আগে তৈরি করা অবকাঠামো। বাস্তব চিত্র হলো, খালের বাইরের অংশের চেয়ে আমাদের কারখানার ভেতরের অংশের খাল আরও প্রশস্ত এবং প্রবাহ বাধাহীন। পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় তদন্ত ও পরীক্ষা করে এর সত্যতা পেয়েছে।’

সিরামিক শিল্পে প্রচুর পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়, যা সাধারণত ব্যবহারের পর খাল বা নদীতে মিশে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করে। তবে এক্স সিরামিকসে সরেজমিনে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। কারখানার প্রকৌশলীরা দেখালেন, কারখানায় ব্যবহৃত পানি যাতে বাইরে না যায়, সে জন্য তারা ‘জিরো লিকুইড ডিসচার্জ’ নীতি মেনে চলছে। মিটারের মাধ্যমে পানির প্রতিটি ফোঁটার হিসাব রাখা হচ্ছে। ব্যবহৃত পানি ইটিপির মাধ্যমে শোধন করে পুনরায় উৎপাদন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান জানান, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে পানি বারবার ব্যবহার করায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমছে এবং বাইরের পরিবেশও দূষণমুক্ত থাকছে।

প্রতিষ্ঠানের গ্রুপ সিইও আহমেদ আজিজুর রহমান বলেন, ‘এ খাতে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও আমরা এখনও ৯০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তার ওপর রয়েছে জ্বালানি ও গ্যাস সংকট। তবুও ২০০৯ সাল থেকে আমরা ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছি। ৮/১২ সাইজের ছোট টাইলস দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং অনন্য ডিজাইনের কারণে আমরা এখন সর্বোচ্চ আকারের টাইলস তৈরি করছি। অ্যান্টি-স্লিপ, জার্ম-প্রতিরোধক থেকে শুরু করে আজীবন টেকসই টাইলস এখন আমরা দেশেই তৈরি করছি।’

এক্স সিরামিকসের এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো সম্পূর্ণ রিসাইকেলড ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া। পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহ, শোধন এবং নতুন পণ্য উৎপাদন একদিকে যেমন ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ কমায়, অন্যদিকে সাশ্রয় করছে প্রাকৃতিক সম্পদ ও শক্তি। পরিবেশ রক্ষা করে অর্থনৈতিক সাশ্রয় নিশ্চিত করার মডেল দেশের অন্যান্য শিল্পের জন্যও অনুসরণীয় হতে পারে।

আরও পড়ুন

×