ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বন্যপ্রাণীর নিভৃত বন্ধু

বন্যপ্রাণীর নিভৃত বন্ধু
×

বিভিন্ন স্থান থেকে শতাধিক সাপ উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করেন শ্রীবাস নাথ

 মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১০ | আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ১২:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাণ, প্রকৃতি আর অবলা প্রাণীর প্রতি তাঁর অসামান্য মায়া। ক্ষণস্থায়ী জীবন শেষে তিনি বেঁচে থাকতে চান মানুষের স্মৃতির মণিকোঠায়, একজন নিবেদিতপ্রাণ প্রকৃতিযোদ্ধা হিসেবে। এ আকাঙ্ক্ষা থেকেই নিজের মন-প্রাণ উজাড় করে বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন শ্রীবাস নাথ।

সুনামগঞ্জে শিকড় হলেও বর্তমানে চাকরির সুবাদে তাঁর বসবাস সিলেটে। একটা সময় ছিল যখন আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই সাপ নিয়ে তাঁর মনেও কাজ করত তীব্র ভীতি। এই ভয়ের প্রাচীর ভেঙে যায় ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে ‘স্নেকস অব দ্য সিটি’ নামের একটি অনুষ্ঠান দেখার পর। সাপের প্রতি সেই পুরোনো ভয় পরিণত হয় প্রবল কৌতূহল ও আগ্রহে। এরপর ইউটিউবে বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারীদের ভিডিও দেখতে শুরু করেন। রোমাঞ্চকর অভিযান দেখে সিদ্ধান্ত নেন সাপ উদ্ধারের (রেসকিউ) এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটার। সময়ের পরিক্রমায় গভীরভাবে অনুধাবন করেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপের মতো প্রাণীদের বেঁচে থাকা কতটা জরুরি।

শ্রীবাসের এই অদম্য আগ্রহ দেখে তাঁকে পথ দেখাতে এগিয়ে আসেন ‘স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সিদ্দিকুর রহমান রাব্বি এবং জুবাইদুর রহমান মেহেদী। সিলেটে এসে তারা শ্রীবাসকে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেন। প্রশিক্ষণের হাত ধরেই ২০২১ সালে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ‘স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন তিনি। সিলেটের মীরাবাজার এলাকা থেকে একটি ময়াল (অজগর) উদ্ধারের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর এই রোমাঞ্চকর জীবনের পথচলা।

এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে শতাধিক সাপ সফলভাবে উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করেছেন শ্রীবাস। তাঁর উদ্ধার করা সাপের তালিকায় রয়েছে বিষধর এবং নির্বিষ– উভয় প্রজাতির সাপ। এর মধ্যে জলঢোঁড়া, তামাটেমাথা দুধরাজ, দাঁড়াশ, ইন্দোচীনা দাঁড়াশ, বেত আঁচড়া, হেলে, দেশি অজগর, পদ্মগোখরা, শঙ্খিনী, পাতি দুধরাজ উল্লেখযোগ্য। তবে তাঁর এ ভালোবাসার পরিধি কেবল সাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বনবিড়াল, মেছোবিড়াল, বিভিন্ন প্রজাতির পাখিসহ ২০টিরও বেশি অন্যান্য বন্যপ্রাণী লোকালয় থেকে উদ্ধার করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি।
লোকালয়ে চলে আসা বন্যপ্রাণীরা অনেক সময় মানুষের নির্মম আঘাতের শিকার হয়। মুমূর্ষু সেই প্রাণীগুলোকে উদ্ধার করে পরম মমতা ও সুচিকিৎসায় সুস্থ করে তোলেন তিনি। গত বছর সিলেটের লাক্কাতোড়া এলাকা থেকে একটি শঙ্খিনী সাপকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করেছিলেন। পরে অ্যানিম্যাল কিপার মাসুদ হাওলাদারের সহায়তায় দীর্ঘ চিকিৎসার পর সাপটিকে পুরোপুরি সুস্থ করে পুনরায় বনে ছেড়ে দেন এই প্রকৃতিপ্রেমী।

এ সমাজে সাপ উদ্ধার বা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের এ কাজটিকে অনেকেই সহজভাবে মেনে নিতে পারেন না। শ্রীবাসকেও শুনতে হয়েছে বহু মানুষের বাঁকা কথা ও কটূক্তি। তবে নিজের লক্ষ্যের প্রতি অবিচল এ মানুষটি কখনোই সেসব নেতিবাচক কথায় কান দেননি।

সাপ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক প্রাণী হওয়ায় উদ্ধারের সময় সুরক্ষার বিষয়টিতে তিনি সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেন। অভিযানকালে গ্লাভস, স্নেক টং (স্টিক) এবং পায়ে গামবুট বা কেডস পরা তাঁর নিত্যদিনের নিয়ম। পেশাগত ব্যস্ততার কারণে সিলেটের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কম হলেও, সময় পেলেই তিনি ছুটে যান সুনামগঞ্জ, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর কিংবা মৌলভীবাজারের বিভিন্নপ্রান্তে।

উদ্ধার অভিযানে গিয়ে প্রায়ই নানা রোমাঞ্চকর ও বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন তিনি। একবার খবর পেলেন, সিলেটের শাহপরাণ এলাকায় বসতবাড়ির পাশের উঁচু গাছে একটি অজগর আশ্রয় নিয়েছে। মাথায় হেলমেট পরে মই বেয়ে সেই উঁচু গাছে উঠে সাপের মুখোমুখি হন শ্রীবাস। প্রায় ২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস চেষ্টার পর সাপটিকে নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনেন। অপেক্ষমাণ উৎসুক জনতার ভালোবাসা আজও তাঁর হৃদয়ে অম্লান।

বন্যপ্রাণী উদ্ধারে গিয়ে নিজের পকেটের টাকা খরচ হলেও, কারও কাছ থেকে একটি পয়সাও পারিশ্রমিক নেন না শ্রীবাস। উল্টো তিনি মানুষকে একটি শর্ত জুড়ে দেন–উদ্ধার কাজের বিনিময়ে সংশ্লিষ্টদের অন্তত দুটি করে ফলের গাছ লাগাতে হবে! প্রকৃতির সুরক্ষায় নিজের এই অভিনব অবদানেই তিনি অসীম আনন্দ খুঁজে পান। যারা বন্যপ্রাণী উদ্ধারের এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে নতুন পা রাখতে চান, তাদের প্রতি শ্রীবাসের সোজা পরামর্শ–‘সর্বোপরি নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করে কাজ করতে হবে। নিজে সুস্থ ও নিরাপদ থাকলে তবেই হাজারো বন্যপ্রাণীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব।’

আজীবন বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির সেবা ও সুরক্ষায় মানুষকে সচেতন করাই তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য। অদূর ভবিষ্যতে আরও প্রাণ ও প্রকৃতি নিয়ে বিস্তৃত পরিসরে কাজ করতে চান প্রকৃতির এই নীরব পাহারাদার।

আরও পড়ুন

×