ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দেশে দেশে নববর্ষ ও মেলা

দেশে দেশে নববর্ষ ও মেলা
×

চীনের নববর্ষ উদযাপন

ইমরান উজ-জামান

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জাতির রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ক্যালেন্ডার। ধর্ম বিশ্বাস, সামাজিকতা, প্রকৃতি, আচার কোনো জাতির সংস্কৃতি প্রভাবিত; যার ওপর ভিত্তি করে নববর্ষ বা নতুন বছর উদযাপন করে থাকে। যার কারণে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু, সুমেরীয়, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলগুলোর সংস্কৃতির বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো। বিশ্বব্যাপী বর্ষগণনায় নানা পদ্ধতি চালু আছে। চান্দ্র, সূর্য, মৌশম, খ্রিষ্টীয়, শকাব্দ, বঙ্গাব্দ–এমন নানা বর্ষগণনা হয়ে থাকে। প্রতিটি বর্ষ শুরুতে মেলা আয়োজনের ঐতিহ্য আছে। 

সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে নানা ধরনের ক্যালেন্ডার বা বর্ষপঞ্জি প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। প্রধান ক্যালেন্ডারগুলো মধ্যে সৌরকেন্দ্রিক, চান্দ্রকেন্দ্রিক আবর্তনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি পৃথিবীর প্রধান ক্যালেন্ডারগুলো। এ ছাড়া আছে বঙ্গাব্দ, চায়না লুনিসোলার ক্যালেন্ডার, ইহুদি ক্যালেন্ডার, ভারতীয় জাতীয় ক্যালেন্ডার শকাব্দ, জুলিয়ান ক্যালেন্ডার, ফার্সি ক্যালেন্ডার। 

ইরান ও আফগানিস্তানে ফার্সি বর্ষবরণ উপলক্ষে বসে মেলা। ইথিওপিয়ান ক্যালেন্ডারের বর্ষপঞ্জি অনুসরণে বর্ষ শুরুর দিন বসে মেলা। মিয়ানমার বা বার্মিজ ক্যালেন্ডার গণনায় মিয়ানমারে নববর্ষের দিন বসে মেলা। জাপানি ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ান হলেও সম্রাটদের আমলে নিজস্ব নিয়মে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান ও মেলা বসে জাপানে। 

প্রায় চার হাজার বছর আগে ব্যাবিলনে নবর্বষ উদযাপনের তথ্য পাওয়া যায়। হজরত ঈসা (আ.)-এর জন্মের প্রায় ২০০০ বছর আগে বসন্ত শুরুর পর যেদিন আকাশে প্রথম নতুন চাঁদ উঠত সে দিনকে নতুন বর্ষের প্রথম দিন হিসেবে গণ্য করা হতো। কারণ, এ সময় মৌসুমের প্রথম ফসল বোনা হতো। ব্যাবিলনে নতুন বর্ষ উদযাপনের অনুষ্ঠান ১১ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হতো বলে জানা যায়। 

প্রাচীন মেলার উদাহরণ দিতে গিয়ে ‘মেলা বিচিত্রা’ প্রবন্ধে আতোয়ার রহমান লিখেছেন, ‘প্রথমে বলবো যে মেলার কথা, তার বিচিত্রতার তুলনা নেই। বসতো অনেক আগে, ইংল্যান্ডে, টেমস নদীর বুকে’...

‘১৫৬৪ সালের কথা। ইংল্যান্ডে সেবার পড়েছে প্রচণ্ড শীত। হাড়-মাংস জমে যাওয়ার দশা। বাইরে শুধু বরফ আর বরফ। টেমস নদীতে নৌকো, স্টীমার, কিছু চলে না। পুরু নিরেট বরফ জমে সে-নদী লম্বা এক সমতল মাঠ।’ 

কায়কারবার ও উৎসব আয়োজনের নিমিত্তে জমে যাওয়া সেই নদীর বুকে বসানো হলো মেলা। ‘দেখতে দেখতে নদীর ওপর বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে সারি সারি গড়ে ওঠে ছোট ছোট ঘর, মেলায় যাকে বলে স্টল। সেই সব স্টলে জমা হয় নানা রকম পণ্য। নিত্যদিনের নানা রকম জিনিসপত্র তো বটেই।’ ইতিহাসের প্রামাণিক সেই মেলা চলেছিল নদীর বরফে ফাটল ধরা পর্যন্ত, প্রায় তিন মাস। এই মেলার নাম দেওয়া হয়েছিল বরফ মেলা ‘ফ্রস্ট ফেয়ার’।

চৈত্র-বৈশাখ মিলে মেলার এক অভয়ারণ্য হয়ে ওঠে বাংলায়। বরুণ বরণ বা বারুণি স্নানের মেলা শেষ হতেই শুরু হয়ে যায় পার্বতীর বীরগাথা। মহাদেবের স্মরণ বা পাট। বাড়ি বাড়ি গিয়ে গাওয়া হয় পাঠ, যাকে পাট সন্ন্যাসও বলা হয়। চৈত্র মাসের মধ্য ভাগ থেকে সন্ন্যাসী দল বাড়ি বাড়ি ঘুরে সনাতনী জীবনের নানা জিনিস নিয়ে সংকীর্তনে যান। ধূপ, শাঁখা, সিঁদুর, ত্রিশুল, কাঁচা আম–এমন ষোলোটি বিষয়ের ওপর সংকীর্তন পাঠ করে সন্ন্যাসী দল। যাকে নীলপাঠ, নীল সন্ন্যাস, সংক্রান্তি গীত, পাট সন্ন্যাস নানা নামে ডাকা হয় অঞ্চলভেদে। চৈত্রের শেষ দিন খেজুর ভাঙা ও চড়কের মধ্য দিয়ে ষোলো পাঠের সমাপ্তি হয়। 

পরদিন সকালে নতুন পরিধানে, পাড়ার ছেলে-বুড়ো একত্র হয় হালখাতা অনুষ্ঠানে। এখন ঢাকায় হয় রমনা বটমূলের ছায়ানটের অনুষ্ঠান আর চারুকলা থেকে হয় ইউনেস্কো স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মঙ্গল শোভাযাত্রা–যার এ বছরের নাম আনন্দ শোভাযাত্রা ও পরে নাম দেওয়া হয় বৈশাখ বরণ শোভাযাত্রা; যা দেশব্যাপী উদযাপিত হয়।

শকাব্দ বা শক যুগ ভারতবর্ষে প্রচলিত একটি প্রাচীন সৌর অব্দ, যা ৭৮ খ্রিষ্টাব্দে কুষাণ সম্রাট কণিষ্কের রাজ্যাভিষেকের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল; যা শকদের ওপর বিজয়ের স্মারক হিসেবেও গণ্য করা হয়। শকাব্দ শুরু হয় ২২ মার্চ। বাংলা সাল প্রচলনে বাংলার সুলতান হোসেন শাহ ও মোগল সম্রাট আকবরের নাম আসে। ৯০৩ হিজরি অর্থাৎ ৪৯৭ খ্রিষ্টাব্দে হোসেন শাহের রাজত্বের শুরু। তখন থেকেই হিজরি বা চান্দ্র বছর অনুসারে নতুন করে বঙ্গাব্দের সূচনা করা হয়। হোসেন শাহই বাংলা সালের প্রকৃত প্রবর্তক। আকবরের সময় তা পেয়েছে শাসনতান্ত্রিক সালের মর্যাদা। তিনি প্রজা ও কৃষকদের মধ্যে ঋণ বিতরণ, খাজনা আদায় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে বাংলা বর্ষপঞ্জিকে কার্যকর করেন। বাদশা আকবর বেশ জাঁকজমকে নতুন বর্ষ শুরুর ঘোষণা দিয়ে, তা উদযাপন করেছিলেন। প্রজা সাধারণের জন্য আয়োজন করেছিলেন বিশাল অনুষ্ঠানের, সেই ছিল প্রথম বৈশাখী মেলা। মানুষের অভিলাষ শান্তি ও স্বস্তিপূর্ণ নতুন আগামীর ডাক নববর্ষ। অতীতের দুঃখ-গ্লানি ধুয়ে মুছে নতুনভাবে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখায় নববর্ষ। জগৎজুড়ে জাতিতে জাতিতে নববর্ষের একই আবেদন। 

আরও পড়ুন

×