ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

গাছের সঙ্গে বন্ধুত্ব

গাছের সঙ্গে বন্ধুত্ব
×
×

রাতুল মুন্সী

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৭ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

পরীক্ষার চাপে কয়েক দিন ক্যাম্পাসের গাছগুলোর কাছে যাওয়া হয়নি রাতুল মুন্সীর। পরীক্ষা শেষে গিয়ে দেখেন, নিজের হাতে লাগানো ঝুমকোলতাটি মাটিতে লুটিয়ে আছে। তাঁর মনে হলো, গাছটি অভিমান করে জিজ্ঞেস করছে, ‘এত দিন কই ছিলা?’

অন্যের কানে কথাটা কল্পনা ঠেকবে। রাতুলের কাছে তা নয়। তিনি বলেন, ‘গাছ আসলেই কথা বলতে পারে। মান-অভিমান করে।’

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাবেক শিক্ষার্থী পেশায় সাংবাদিক। এক যুগের বেশি সময় ধরে তাঁর আরেকটা কাজ আছে। গাছ লাগানো, বন বাঁচানো। নিজের উদ্যোগে আর নানা সংগঠনের কর্মসূচিতে হাজারের বেশি চারা রোপণ করেছেন। দেশে বৃক্ষরোপণের সাফল্য সাধারণত মাপা হয় কত চারা লাগানো হলো তা দিয়ে। কত চারা বাঁচল, সে খোঁজ কমই পড়ে। রাতুলের হিসাব ঠিক উল্টো। চারাটা ঠিক মাটিতে পড়ল কিনা, শেষ পর্যন্ত টিকল কিনা, এটুকুই তিনি দেখেন। তাঁর কথায়, ‘সংখ্যা হিসাব করে তো আর বৃক্ষরোপণ করা যায় না। লাভ-লোকসানের হিসাব করলে তো আমি ব্যবসায়ী হয়ে গেলাম।’

ছোটবেলায় বাড়ি থেকে কিলোমিটার তিনেক দূরে ছিল ঘন শালবন। এত গহিন যে ঢুকতে ভয় করত। বছরে একবার বনভোজনে দল বেঁধে যাওয়া হতো। ফেরার সময় সবার হাতে থাকত বুনোফল। সেই বন এখন অনেকটাই ফাঁকা। খাবার আর আশ্রয় হারিয়ে বন্যপ্রাণী লোকালয়ে ঢুকছে, মানুষ তাদের পিটিয়ে মারছে। এ দৃশ্যই রাতুলকে সবচেয়ে বেশি পোড়ায়।

গাছের টান অবশ্য বাড়ির উঠান থেকেই শুরু। গোলাপ আর কামরাঙার চারা কিনবেন বলে বাবার কাছে টাকা চেয়েছিলেন। মেলেনি। শেষে নিজের মাটির ব্যাংক ভেঙে কিনে আনেন দুটি গোলাপ আর একটি কামরাঙা। কামরাঙা গাছে ঝাঁক বেঁধে টিয়া বসতে দেখেছিলেন তিনি। ঘরের চালের ওপর ঝুঁকে ছিল একটা বড় জাম্বুরা গাছ। ফুলের মৌসুমে জানালা দিয়ে গন্ধ ঢুকত, ভরে যেত গোটা বাড়ি। এখনও সেই টান কাটেনি। ‘জাম্বুরা ফুল ফোটার সময় যত ব্যস্ততাই থাকুক, বাড়িতে যাই। শুধু ফুলের গন্ধটা নেওয়ার জন্য।’

ক্যাম্পাসে তাঁর লাগানো বটগাছটিও এখন বড় হয়েছে। শিক্ষক ড. দ্রাবিড় সৈকত এর নাম রেখেছেন ‘রাতুলবট’। পরিবেশের পাঠ রাতুল এ শিক্ষকের কাছেই পেয়েছেন।

২০১৯ সালের অক্টোবরে শালবন রক্ষার আন্দোলনে নামেন রাতুল ও তাঁর সঙ্গীরা। চলে টানা ৩৭ দিন। ভবন নির্মাণের উদ্বোধনের চেষ্টা হয়েছিল দুবার। দুবারই তারা বাধা দেন। দিনভর গাছ পাহারা দিতেন। আড্ডা, বৈঠক, পরদিনের কর্মসূচি ঠিক করা, সবই চলত গাছতলায়। পূজার ছুটিতেও কয়েকজন বাড়ি যাননি। ভয় ছিল, ফাঁকা পেলেই গাছে কোপ পড়বে।

প্রশাসনের চাপ ছিল। একসময় প্রশ্ন ওঠে, আন্দোলন আর টেনে নেওয়া যাবে কিনা। সেদিনের বৈঠকে সবার চোখ ভিজে গিয়েছিল। রাতুল বলেন, ‘সেই কথা মনে হলে আর বর্তমানে গাছটা দেখলে খুব আবেগি হয়ে যাই। জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করে।’

পরের বছর তারা পথে নামেন। ক্যাম্পাস থেকে খাগড়াছড়ি। ১৫ দিনে ৫১২ কিলোমিটার হাঁটা। পথে ৪০০-এর বেশি বাজারে প্রচার চালিয়েছেন, লিফলেট বিলিয়েছেন, ২৬টি উপজেলায় মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন গাছ আর পরিবেশ নিয়ে। খাগড়াছড়ির ফলদ বাগান মালিক সমিতির সদস্যরা দুপুর পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তাদের অভিনন্দন জানাতে। এ থেকে রাতুলের শিক্ষা, ‘পরিবেশ সচেতনতায় মানুষের কাছে যেতে হবে, বুঝাতে হবে। তাহলেই পরিবর্তন সম্ভব। লোক দেখানো কাজে পরিবর্তন সম্ভব নয়।’

রাতুল লাগান মূলত ফলদ, ঔষধি আর শোভাবর্ধক গাছ। ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের ৬৪ জেলার ফলদ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিচর্যা শেখান। তাঁর দাবি, লাগানো গাছের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ এখনও বেঁচে আছে। প্রতিবছর নানা এলাকা থেকে সেসব গাছের ফল আসে তাঁর কাছে। এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি তিনি চান না।

পরিবেশ ও প্রকৃতির পাঠশালার হয়ে আরেকটি কাজ করেছেন তারা। বৈলাম দেশের সবচেয়ে উঁচু ও দীর্ঘজীবী গাছগুলোর একটি, অথচ সংখ্যায় কমে আসছে। গাছটি যাতে একেবারে হারিয়ে না যায়, সে জন্য জেলায় জেলায় একটি-দুটি করে ১০০ থেকে ১২০টি চারা লাগানো হয়েছে। বেশির ভাগই টিকে আছে। রাতুলের বাড়িরটিও।

এ পথে বাহবা কম, সন্দেহ বেশি। রাতুল বলেন, প্রকৃতি বাঁচলে মানুষও বাঁচবে– এ কথা বোঝাতে গেলে অনেকেই বিষয়টি সহজভাবে নেয়নি। হুমকিও এসেছে। পরিবারও সবসময় সহজভাবে নেয়নি। পরিবেশ ও প্রকৃতির পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা মাহবুবুল রহমান পলাশ জানান, মধুপুরের শালবন রক্ষা আর অবৈধ বৃক্ষনিধনের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে রাতুল জীবনের ঝুঁকিও নিয়েছেন।

রাতুলের ইচ্ছা, একদিন একটা পরিবেশবান্ধব বাড়ি বা আশ্রম গড়বেন। সেখানে গেলে মানুষের ভাবনা বদলাবে। তার আগে প্রতিদিনের কাজটুকু সোজা। গাছের কাছে যাওয়া। না গেলে যে গাছ অভিমান করে, সে তো তিনি ঝুমকোলতার কাছেই শিখেছেন।

আরও পড়ুন

×