ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

পানির নিচে বিশ্বরেকর্ড

পানির নিচে বিশ্বরেকর্ড
×
×

১ ঘণ্টায় ২৮ জনের চুল কেটে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস গড়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার আন্দ্রে গ্রোনেওয়াল্ড

হিল্লোল চৌধুরী

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৯ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

চুল কাটার দোকানের দৃশ্যটা সবার চেনা। চেয়ারে বসা মানুষ, সামনে আয়না, পেছনে কাঁচি হাতে কারিগর। চিরুনি টানলে চুল নিচে নামে, কাঁচি চলে মাপমতো। দক্ষিণ আফ্রিকার আন্দ্রে গ্রোনেওয়াল্ড এ চেনা দৃশ্যটাই নিয়ে গেছেন পানির তলায়। সেখানে আয়না নেই। চুল নিচে নামে না, চারদিকে ভেসে বেড়ায়। তবু ১ ঘণ্টায় ২৮ জনের চুল কেটে তিনি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস গড়েছেন।

ঘটনা গত বছরের ২৯ নভেম্বর। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় স্কুবা ডাইভিংয়ের সরঞ্জাম গায়ে চাপিয়ে পানিতে নামেন ৪৯ বছর বয়সী আন্দ্রে। আগের রেকর্ড ছিল যুক্তরাজ্যের ডেভিড রের। ২০০৭ সালে তিনি ১ ঘণ্টায় পানির নিচে ২৭ জনের চুল কেটেছিলেন। ১৮ বছর টিকে থাকা সেই রেকর্ড আন্দ্রে ভাঙলেন মাত্র একজনের ব্যবধানে।

এটি তাঁর দ্বিতীয় বিশ্বরেকর্ড। ২০২৪ সাল থেকে ২৪ ঘণ্টায় একক হাতে সবচেয়ে বেশি চুল কাটার রেকর্ডও তাঁর দখলে। সেবার কেটেছিলেন ৫৪৩ জনের চুল। হিসাব কষলে আড়াই মিনিটের সামান্য বেশি সময়ে একজন। এবার পানির নিচে সময় লেগেছে জনপ্রতি গড়ে ২ মিনিটের মতো। ডাঙার চেয়েও দ্রুত, অথচ পরিবেশ ঢের কঠিন।

৩০ বছর ধরে চুল কাটছেন আন্দ্রে। কাঁচি তাঁর আঙুলের মতোই চেনা। কিন্তু পানি তাঁর চেনা নয়। নিজেই স্বীকার করেছেন, পানিতে তিনি স্বচ্ছন্দ নন। ডুব দেওয়া কখনও পছন্দের কাজ ছিল না। রেকর্ডের জন্যই স্কুবা ডাইভিং শিখেছেন। বাধ্যতামূলক প্যাডি সনদ পেয়েছেন রেকর্ড চেষ্টার মাত্র তিন মাস আগে। ঝুঁকি এড়াতে পুরো সময় পাশে ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ডুবুরি। পানির নিচের লড়াইটা টের পাওয়া যায় আন্দ্রের কথাতেই। তাঁর মাস্ক ঠিকমতো আটকাচ্ছিল না। ভেতরে পানি ঢুকছিল বারবার। ডুবুরিরা তখন নাক দিয়ে বাতাস ছেড়ে মাস্কের পানি বের করেন। প্রতিবার এতে কয়েক সেকেন্ড খরচ হচ্ছিল। ঘড়ি তো থেমে নেই।

শ্বাস নেওয়াও ছিল আরেক পরীক্ষা। স্কুবায় শ্বাস নিতে হয় রেগুলেটরে, মুখে কামড়ে রাখা নলের ভেতর দিয়ে। উত্তেজনায় শ্বাস দ্রুত হয়। দ্রুত শ্বাস মানে ট্যাঙ্কের বাতাস দ্রুত ফুরানো, শরীরে অস্থিরতা বাড়া। চাপের মধ্যেই আন্দ্রেকে শ্বাসের ছন্দ বেঁধে রাখতে হয়েছে।

তার ওপর ঠান্ডা। পানি শরীর থেকে বাতাসের চেয়ে বহুগুণ দ্রুত তাপ টেনে নেয়। ঠান্ডায় আঙুলে রক্ত চলাচল কমে, আঙুল আড়ষ্ট হয়ে আসে। যার পুরো কাজটাই আঙুলের সূক্ষ্ম নড়াচড়ায়; তাঁর জন্য এ বড় দুশ্চিন্তা। শরীরের তাপ ধরে রাখা আর হাতের সচলতা না হারানো নিয়ে আন্দ্রেকে আলাদা করে ভাবতে হয়েছে।

সবচেয়ে বড় ধাঁধা ছিল চুল নিজেই। ডাঙায় মাধ্যাকর্ষণের টানে চুল ঝুলে থাকে। কারিগর টেনে ধরে মাপ নেন। পানিতে প্লবতার কারণে চুল আর ঝোলে না। স্রোতের সঙ্গে দোলে, এদিক-ওদিক ভেসে যায়। মাস্কের কাচে দৃষ্টিও সীমিত। ফলে মাপ নিতে হয়েছে অনেকটা হাতের অনুভবে। আন্দ্রে আগে জানতেনই না, পানিতে চুল কেমন আচরণ করবে, তাঁর শরীরই বা চাপ কীভাবে সামলাবে। পুরো অভিজ্ঞতাকে তিনি বলেছেন স্বপ্নের মতো অবাস্তব।

চুল কাটাতে যারা পানিতে নেমেছিলেন, তারাও কম সাহসী নন। সবাই প্রশিক্ষিত ডুবুরি। প্রিটোরিয়ার রিফ ডাইভারস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখে তারা নাম লেখান। এ প্রতিষ্ঠানই পুরো আয়োজনে আন্দ্রের পাশে ছিল। শেষে দেখা গেল, নতুন ছাঁট নিয়ে কারও আপত্তি নেই।

এই রেকর্ড শুধু নাম কামানোর জন্য নয়। আন্দ্রে তহবিল তুলেছেন জোহানেসবার্গের আব্রাহাম ক্রিয়েল বাম্বানানি শিশু নিবাসের জন্য। প্রতিষ্ঠানটির শিকড় এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। ১৯০২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রেভারেন্ড আব্রাহাম ক্রিয়েল লাংলাগতে এতিমখানাটি চালু করেন দক্ষিণ আফ্রিকার যুদ্ধে মা-বাবা হারানো শিশুদের আশ্রয় দিতে।

আজও প্রতিষ্ঠানটি সেই কাজ ধরে রেখেছে। দুটি ক্যাম্পাস ও বিভিন্ন স্যাটেলাইট হোমে শিশুদের আবাসিক পরিচর্যা আর দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেয় তারা। সোয়েটো, ওয়েস্টবেরি, ইওভিল ও লাংলাগতে এইচআইভিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় দুই হাজার শিশুর জন্য রয়েছে বাড়িভিত্তিক সেবা ও ড্রপ-ইন সেন্টার। একজন কেশশিল্পীর কাঁচির অর্জন তাই ঘুরেফিরে পৌঁছে গেছে এই শিশুদের খাবারের থালায়, বইয়ের পাতায়। 

আন্দ্রে থামছেন না। তৃতীয় বিশ্বরেকর্ডের জন্য নতুন প্রকল্পে হাত দিয়েছেন। সেটি কী এখনও খোলাসা করেননি। গল্পটার আসল জোর অবশ্য রেকর্ডের সংখ্যায় নয়। যিনি পানিকে ভয় পেতেন, তিনিই পানির নিচে কাঁচি ধরলেন। ৩০ বছর কাঁচির সঙ্গে সখ্যের সঙ্গে মিশল তিন মাসের নতুন শেখা। ভয়কে সরিয়ে নয়, পাশে বসিয়েই কাজটা করেছেন তিনি। অচেনা জগৎ এভাবেই একদিন কর্মশালা হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

×