ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

হারানোর পথে বাংলার আরেক ঐতিহ্য

ফরিদপুরী সরার শেষ শিল্পী

ফরিদপুরী সরার শেষ শিল্পী
×
×

নিরঞ্জন পাল ও ফরিদপুরী সরা

ইমরান উজ-জামান

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫১ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় কুমার নদের পারে ছোট্ট গ্রাম সিঙ্গারিয়া। লোকে চেনে পালপাড়া নামে। একসময় এ গ্রামের উঠানে উঠানে মাটি ছানার শব্দ শোনা যেত। চাক ঘুরত দিনভর, সন্ধ্যায় ভাটার ধোঁয়া উঠত আকাশে। নদের পার আর কৃষকের ক্ষেতের এঁটেল মাটি, কুমারের জল আর মানুষের হাতের ঘাম মিলে এখানে গড়ে ওঠে এক মৃন্ময় জনপদ।

এই পাড়ার সবচেয়ে প্রবীণ শিল্পী নিরঞ্জন পাল। জন্ম ১৯৬২ সালে, এ গ্রামেই। বাবা নিতাই পাল ছিলেন নামকরা কারিগর। মাও দিন কাটাতেন মাটি নিয়ে। নিরঞ্জন পালের হিসাবে তাদের বংশে সাত প্রজন্ম ধরে চলছে এ পেশা। প্রতিমা গড়ার ওস্তাদ কারিগরকে পালপাড়ায় বলা হয় গুনরাজ। নিরঞ্জন পাল সেই গুনরাজ। তবে তাঁর বড় পরিচয় অন্যখানে। তিনি ফরিদপুরী সরার শেষ দিকের একজন বড় শিল্পী।

এ বছর সেই কাজের স্বীকৃতি এসেছে। দুর্গাপূজার সপ্তমীর দিন বরিশালের রজনীগন্ধা কমিউনিটি সেন্টারে বসেছিল ‘চারুকলা বরিশাল’ আয়োজিত মৃৎশিল্পী সম্মেলন ও সম্মাননার ১৭তম আসর। সেখানে সরাশিল্প বিভাগে তিনি পেয়েছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আজীবন সম্মাননা। শিল্পাচার্যের কনিষ্ঠ পুত্র প্রকৌশলী ময়নুল আবেদিন তাঁর হাতে তুলে দেন সম্মাননা স্মারক ও অর্থমূল্য। এবার দেশের নানা প্রান্তের ১৮ জন মৃৎশিল্পীকে সম্মান জানানো হয়েছে। মৃৎশিল্প সংরক্ষণ ও প্রসারে ভূমিকার জন্য বিশেষ সম্মাননা পেয়েছেন মৃন্ময়ের প্রধান নির্বাহী শাহজাহান মৃধা বেনু।

সরা আসলে মাটির ঢাকনা। হাঁড়ির মুখ ঢাকার সেই সাধারণ পাত্রটিই শিল্পীর তুলিতে হয়ে ওঠে দেবীর আসন। কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার রাতে ঢাকা, বিক্রমপুর আর ফরিদপুর অঞ্চলের ঘরে ঘরে চিত্রিত সরা রেখে আরতি দেওয়ার রীতি অনেক পুরোনো। সরার গোল জমিনে আঁকা হয় পেঁচার পিঠে লক্ষ্মী, ধানের শিষ, কখনও রাধাকৃষ্ণ কিংবা দুর্গার মুখ।

লোক গবেষকরা নকশা আর অঞ্চল ধরে সরাকে কয়েক ভাগে ভাগ করেছেন। ঢাকাই সরা, ফরিদপুরী সরা, সুরেশ্বরী সরা আর গণকী বা আচার্যী সরা। ঢাকাই সরার খোঁজ এখন মিলবে মুন্সীগঞ্জে। এ ধারার এখনকার ওস্তাদ সিরাজদিখানের বাসাইল গ্রামের অর্জুন পাল। সুরেশ্বরী সরার ঠিকানা শরীয়তপুর। গণকী সরা খুঁজে পাওয়া কঠিন, তবু বিক্রমপুরে কেউ কেউ এখনও আঁকেন আর ফরিদপুরী সরার জীবন্ত দলিল সিঙ্গারিয়ার নিরঞ্জন পাল।

একসময় সিঙ্গারিয়ার পালপাড়ার জীবন চলত নদীর স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। নিজের হাতে গড়া হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে নিরঞ্জন পাল ঘুরতেন ঘাটে ঘাটে, গ্রামে গ্রামে। সেই দিনের কথা মনে করলেন তাঁর ছোট ছেলে রতন পাল। এখন তিনি করপোরেট অফিসে চাকরি করেন। বললেন, ‘অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার সঙ্গে হাঁড়ি, ঘটি, বাসন, খেলনা বানাতাম। নদীর পারে বা ক্ষেতে এঁটেল মাটি থাকলে কৃষকরাই ডেকে বলতেন নিয়ে যেতে। সেই মাটি ছেনে জিনিস গড়তাম, রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে পাকা করতাম। তারপর ঝাঁকায় তুলে গ্রামে গ্রামে বেচতে যেতাম।’

সোম আর শুক্রবার নৌকাবোঝাই করে মাল যেত ভাঙ্গার হাটে। কখনও বেচাকেনায় দুই-তিন দিন লেগে যেত। তখন নৌকাতেই রান্না, নৌকাতেই ঘুম। বাড়ির পাশে মুনসুরাবাদে হাট বসলেও সেখানে যাওয়ার দরকার পড়ত না। আশপাশের গ্রামের মানুষ উঠান থেকেই কিনে নিত দরকারি পাত্র। বরিশালের পাইকাররা বড় বাণিজ্য নৌকা নিয়ে ঘাটে ভিড়তেন; মাটির জিনিস বোঝাই করে ফিরে যেতেন দক্ষিণে। সেই দিন আর নেই। প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম আর মেলামাইনের দাপটে মাটির হাঁড়ি রান্নাঘর থেকে প্রায় বিদায় নিয়েছে। নিরঞ্জন পালের উঠানেও দইয়ের হাঁড়ি আর নিত্যদিনের পাত্র গড়া কমে এসেছে। এখন মূল কাজ মাছ ধরার জালের কাঠি। বৈশাখী মেলা, পৌষ-পার্বণ, দুর্গাপূজা আর লক্ষ্মীপূজার মেলার আগে একটু বাড়তি ব্যস্ততা আসে। তখন গড়া হয় পুতুল আর খেলনা।

শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না নিরঞ্জন পালের। তাই দিনভর মাটি নিয়ে বসেন স্ত্রী যমুনা পাল। মাঝেমধ্যে শাশুড়ির সঙ্গে হাত লাগান ছেলের বউ। তিন ছেলে নিখিল, রবি আর রতনের কেউ এ পেশায় নেই। কেউ স্বর্ণকারের কাজ করেন, কেউ চাকরি। একমাত্র মেয়ে সাথী পালের বিয়ে হয়েছে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর এক পালবাড়িতে। সেখানেও মাটির কাজ টিকে আছে কোনোমতে।

এখানেই নিরঞ্জন পালের দীর্ঘশ্বাস। তিনি জানেন, তাঁর পরে এই ভিটায় আর মাটি ছানা হবে না, চাক ঘুরবে না, ভাটায় আগুন জ্বলবে না। তাঁর হাতে ফরিদপুরী সরার যে ধারা টিকে আছে, উত্তরসূরি না থাকলে তাঁর সঙ্গেই তা হারিয়ে যেতে পারে। তখন একজন শিল্পীর বিদায় আর কেবল একজন মানুষের বিদায় থাকে না। হারিয়ে যায় একটা গোটা ঘরানা।

এই প্রেক্ষাপটে বরিশালের মৃৎশিল্পী সম্মাননা আয়োজনের মূল্য আলাদা করে চোখে পড়ে। সিনেমা, গান, নাটক বা খেলার মানুষ যেভাবে পুরস্কার আর পরিচিতি পান, মাটির কারিগরের ভাগ্যে তা জোটে কম। ১৭ বছর ধরে নিয়মিত এ আয়োজন করে বরিশালের আয়োজকরা দেখিয়েছেন, মৃৎশিল্পীরাও তারকা হতে পারেন। দেশে মৃৎশিল্পীদের নিয়ে এমন ধারাবাহিক আয়োজন সত্যিই বিরল।

তবে সম্মাননা এক সন্ধ্যার আলো। মৃৎশিল্প বাঁচে প্রতিদিনের ব্যবহারে। মানুষ যতদিন মাটির জিনিস কিনবে, ঘরে রাখবে, পূজায় তুলবে, ততদিন চাকও ঘুরবে। দেশের পালপাড়াগুলোকে এক সুতায় গাঁথা গেলে সেগুলো হয়ে উঠতে পারে একেকটি জীবন্ত জাদুঘর। কাচের আড়ালে রাখা প্রাচীন হাঁড়ি দেখার পাশাপাশি মানুষ যেতে পারবে সিঙ্গারিয়ার উঠানে। বসতে পারবে নিরঞ্জন পালের মতো প্রবীণ শিল্পীর পাশে। দেখতে পারবে, কাদামাটি কীভাবে একসময় দেবীর মুখ হয়ে ওঠে। পর্যটন, প্রশিক্ষণ আর ন্যায্য বাজারের সঙ্গে এ পাড়াগুলো জুড়ে দিলে নতুন প্রজন্মও হয়তো ফিরে তাকাবে পূর্বজদের পেশার দিকে।

শিল্পী আর সাধারণ মানুষের পুরোনো সম্পর্কটা নতুন করে গড়া গেলে কুমার নদের পারে আরও কিছুকাল জ্বলবে ভাটার আগুন। না হলে নিরঞ্জন পালের তুলির টানই হয়ে থাকবে ফরিদপুরী সরার গায়ে শেষ টান।

আরও পড়ুন

×