ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

পরাশক্তির শৃঙ্খলে মানবিক আকুতি

জাতিসংঘ দিবস

পরাশক্তির শৃঙ্খলে মানবিক আকুতি
×
×

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫০ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর। দুটি বিশ্বযুদ্ধে কয়েক কোটি মানুষের লাশ পেরিয়ে পৃথিবী এক প্রতিজ্ঞা করল– আর কোনো প্রজন্ম যেন যুদ্ধের আগুনে না পোড়ে। সেই প্রতিজ্ঞার নাম জাতিসংঘ। সনদের প্রথম কথাই ছিল, ‘আমরা জাতিসংঘের জনগণ’। রাষ্ট্র নয়, রাজা নয়, জনগণ। ৮১ বছর পর ২০২৬ সালের জাতিসংঘ দিবসে তাই প্রশ্নটা খুব সোজা। সেই জনগণ আজ কোথায়?

জাতিসংঘের গড়নে দুটি আলাদা দর্শন পাশাপাশি বসানো। সাধারণ পরিষদে ১৯৩টি দেশের প্রত্যেকের একটি করে ভোট। সেখানে বাংলাদেশ আর যুক্তরাষ্ট্র সমান। এটাই বিশ্বসভার গণতান্ত্রিক মুখ। অন্যদিকে নিরাপত্তা পরিষদে পাঁচ স্থায়ী সদস্যের হাতে ভেটোর ক্ষমতা। যুদ্ধজয়ী শক্তিগুলো নিজেদের জন্য এ রক্ষাকবচ রেখে দিয়েছিল। শান্তি রক্ষার দায় আর সিদ্ধান্তের চাবি দুটোই থাকল তাদের মুঠোয়। গণতন্ত্রের ঘরে লাগানো হলো এক অভিজাত তালা। আজকের সংকটের বীজ ওই নকশাতেই পোঁতা।

তবু জাতিসংঘের অবদান অস্বীকার করা যায় না। জন্মের সময় সদস্য ছিল ৫১টি দেশ। আজ ১৯৩টি। মাঝের এই দীর্ঘ পথ আসলে উপনিবেশ ভাঙার ইতিহাস। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার অনেক জনগোষ্ঠী স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে বিশ্বসভায় আসন পেয়েছে। ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা মানুষের মর্যাদাকে আন্তর্জাতিক ভাষা দিয়েছে। নারীর অধিকার, শিশুর অধিকার, শরণার্থীর সুরক্ষা নিয়ে সনদ হয়েছে। শতাধিক দেশে নির্বাচন আয়োজনে সহায়তা করেছে সংস্থাটি।

১৯৭৪ সালে সদস্যপদ পাওয়া বাংলাদেশ আজ শান্তিরক্ষায় সবচেয়ে বেশি সৈন্য পাঠানো দেশগুলোর একটি। ছোট রাষ্ট্রের কণ্ঠ বড় রাষ্ট্রের সমান উচ্চতায় শোনার যে মঞ্চ, তা পৃথিবীতে একটাই। কিন্তু মঞ্চ থাকলেই কণ্ঠ পৌঁছায় না। গাজা তার নির্মম প্রমাণ। নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ১৫ সদস্যের ১৪টিই পক্ষে ভোট দিয়েছে। একা যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিয়ে তা আটকে দিয়েছে। এভাবে ছয়বার। জাতিসংঘের নিজস্ব তদন্ত কমিশন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনেছে। তবু কিছুই থামেনি। চলতি অক্টোবরে গাজায় মৃতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ছাড়িয়েছে। যদিও এ সংখ্যা কেবলই দাপ্তরিক। প্রকৃত চিত্র আরও অনেক বেশি ভয়াবহ। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করা হলো। সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা যেখানে একজনের আঙুলের চাপে মুছে যায়, সেখানে গণতন্ত্রের কথা বলা কঠিন।

এরপর এলো টাকার অস্ত্র। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এর অর্ধেকের বেশি জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা। নিয়মিত বাজেটে দেশটির বকেয়া প্রায় ২১৯ কোটি ডলার। শান্তিরক্ষায় আরও ২৪০ কোটি। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস প্রকাশ্যে আর্থিক ধসের আশঙ্কা জানিয়েছেন। খাদ্য সহায়তা, শরণার্থী সেবা, শিশুর টিকা– সবখানে সংকট স্পষ্ট।

এবার হিসাবটা পাশাপাশি রাখা যাক। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের নিয়মিত বাজেট ৩৪৫ কোটি ডলার। অথচ ২০২৫ সালে পৃথিবীর সামরিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৮৮ হাজার কোটি ডলারের বেশি। অর্থাৎ শান্তির প্রতিষ্ঠানের তুলনায় যুদ্ধের পেছনে খরচ ৮০০ গুণেরও বেশি। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের সামরিক বাজেটই এক লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। যুদ্ধ থামানোর প্রতিষ্ঠান অনাহারে, যুদ্ধ চালানোর কারখানা ফুলেফেঁপে উঠছে। এটা দুর্ঘটনা নয়। এটা একটা ব্যবসার যুক্তি। যুদ্ধ যত দীর্ঘ, অস্ত্রের বাজার তত চাঙ্গা।

সেই যুক্তির নতুন রূপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’। স্থায়ী সদস্য হতে চাইলে দিতে হবে ১০০ কোটি ডলার। শান্তি এখন চাঁদা দিয়ে কেনার আসন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থাকে সেকেলে বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। যে ব্যবস্থা তারা নিজেরাই গড়েছিল, স্বার্থ ফুরোলে তা ছুড়ে ফেলতে দেরি হয়নি।

তাহলে জাতিসংঘের সম্ভাবনা কোথায়? উত্তর লুকিয়ে আছে তার গণতান্ত্রিক অংশে। ১৯৫০ সালের ‘শান্তির জন্য ঐক্য’ প্রস্তাব বলে, নিরাপত্তা পরিষদ অচল হলে সাধারণ পরিষদ ব্যবস্থা নিতে পারে। এই পথ আরও শক্ত করতে হবে। ভেটোর ব্যবহারে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নে ভেটো নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব অনেক দিন ধরে টেবিলে পড়ে আছে। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো এক হলে সংখ্যার জোর তাদেরই। অর্থায়নও কয়েকটি ধনী দেশের মর্জি থেকে মুক্ত করার বিকল্প খুঁজতে হবে।

জাতিসংঘ নিজে ব্যর্থ হয়নি। তাকে ব্যর্থ করা হচ্ছে। যারা তাকে দুর্বল করছে, তারাই আবার তার অকার্যকারিতা নিয়ে উপহাস করছে। এ দিবসে তাই উৎসবের চেয়ে জরুরি একটা দাবি তোলা। সনদের প্রথম শব্দগুলো ফিরিয়ে দিতে হবে তাদের হাতে, যাদের নামে তা লেখা হয়েছিল– জনগণের হাতে।

আরও পড়ুন

×