ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

সব বাদ্য একসঙ্গে না থামলে থামে না ওয়ানগালা

সব বাদ্য একসঙ্গে না থামলে থামে না ওয়ানগালা
×
×

মধুপুরের চুনিয়ায় আদি সাংসারেক রীতিতে তিন দিনের নবান্ন উৎসব ‘ওয়ানগালা’

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ১৯:১৯

মাঠের ধান ঘরে উঠেছে। কিন্তু সেই ধান মুখে তোলার আগে গারোদের একটা দায় মেটাতে হয়। এই দায় সূর্যের কাছে, মাটির কাছে, তাদের বিশ্বাসের দেবতা মিসি সালজংয়ের কাছে। এই কৃতজ্ঞতার নামই ওয়ানগালা। কেউ বলেন ওয়ান্না, কেউ ওয়ানমা রংচুয়া। আচিক ভাষায় ‘ওয়ানা’ মানে দেবতার দেওয়া দান, আর ‘গালা’ মানে উৎসর্গ। দেবতা যে ফসল দিয়েছেন, তার প্রথম ভাগ আগে তাঁকেই ফিরিয়ে দেওয়া। তারপর উঠবে নিজেদের পাতে। প্রথা অনুযায়ী ওয়ানগালার আগে নতুন শস্য খাওয়া বারণ।

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার চুনিয়া গ্রামে এবারও এই উৎসব হলো আদি সাংসারেক রীতি মেনে। ২২ থেকে ২৪ অক্টোবর (বৃহস্পতি থেকে শনিবার) তিন দিন ধরে চুনিয়া বনানী আচিক (গারো) সাংস্কৃতিক ক্লাবের প্রাঙ্গণে চলল পূজা, গান, নাচ আর চু পানের আসর। উৎসব পরিচালনা করেন খামাল বা পুরোহিত নকুল নকরেক। তাঁর সহকারী, অর্থাৎ মাদ্দক ছিলেন এলিসন মৃ।

যে গ্রামে আদি ধর্ম এখনো টিকে আছে
সাংসারেক গারোদের আদি ধর্ম। এই ধর্মে মিসি সালজং সূর্য, শস্য ও উর্বরতার দেবতা। ওয়ানগালা মূলত তাঁরই আরাধনা। বাংলাদেশ ও ভারতের মেঘালয়ে গারোদের বড় অংশ এখন খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী। ফলে অনেক জায়গায় ওয়ানগালা টিকে আছে সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে। শহরের মাঠে বা গির্জার আঙিনায় এক-দুই দিনের অনুষ্ঠান হয়। সেখানে নাচ-গান থাকে, কিন্তু পুরোনো আচারের অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

চুনিয়া এখানেই আলাদা। মধুপুর গড়কে গারোরা বলেন ‘আবিমা’। এই আবিমা অঞ্চলের সাংসারেক গারোদের খামাল ছিলেন চুনিয়ার প্রয়াত জনিক নকরেক। তাঁর গ্রামে এখনো তিন দিন ধরে আদি নিয়মে ওয়ানগালা হয়। কবি রফিক আজাদ এই গ্রাম নিয়ে লিখেছিলেন ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’।

তবে চুনিয়ার মাটির ইতিহাস শুধু কবিতার নয়। ১৯৫৫ সালে মধুপুরে জুমচাষ নিষিদ্ধ হয়। পরের বছর বন বিভাগ চুনিয়ায় প্রাকৃতিক বন কেটে নতুন চারা লাগায়। যে জুমের ফসল ঘিরে ওয়ানগালার জন্ম, সেই জুম কবেই উঠে গেছে। জমি নিয়ে টানাপড়েনও থামেনি। তবু ফসলের দেবতাকে ধন্যবাদ জানানোর রীতি এখানে থামেনি। এটাই চুনিয়ার ওয়ানগালাকে আলাদা মাত্রা দেয়।

ওয়ানগালা উৎসবের একটি মুহূর্ত

প্রথম দিন: সূর্য ডোবার মুখে রুগালা
প্রথম দিনের আচার শুরু হয় সূর্য ডোবার একটু আগে। প্রথমে রাক্কাশি আমুয়া। আমুয়া মানে পূজা। এরপর পূজা পান রংদিক মিদ্দি, চালের মটকার দেবতা। যে পাত্রে সারা বছরের চাল জমা থাকে, তার রক্ষাকর্তা তিনি। ভাতের ওপর যাদের জীবন দাঁড়িয়ে, তাদের কাছে চালের পাত্রের দেবতা থাকা খুব স্বাভাবিক।

পূজা শেষে সবাই পান করেন চু। চাল থেকে তৈরি এই পানীয় গারোদের ঐতিহ্যের অংশ। চু পানের ভেতর দিয়েই শেষ হয় প্রথম দিনের আচার রুগালা। শব্দটির অর্থই চু ঢালা। নতুন ধানের প্রথম স্বাদ এভাবে আগে দেবতার কাছে যায়, তারপর মানুষের কাছে।

দ্বিতীয় দিন: সূর্যদেবতার আরাধনা
মূল উৎসব দ্বিতীয় দিনে। সকাল ১০টায় শুরু হয় মিসি সালজং মিদ্দের আমুয়া, সূর্যদেবতার পূজা। পূজা শেষে খামালের অনুমতি নিয়ে হয় গোরে রুআ। এতে অংশ নেন সাইনামারী, পেগামারী, চুনিয়া, পীরগাছা ও নয়নপুর গ্রামের নারীরা। মাতৃসূত্রীয় গারো সমাজে উৎসবের কেন্দ্রে নারীর এই উপস্থিতি প্রত্যাশিত।

এরপর মাঠ ভরে ওঠে গানে। সাইনামারী গ্রামের ওস্তাদ লেজুস রেমার দল গাইলেন রেরে, গারোদের ঐতিহ্যবাহী লোকগান। নয়নপুরের বিচিত্রা ম্রং ও পিয়া ম্রং শোনালেন চিরায়ত গান নাংগরিরি। পেগামারী গ্রামের বাসন্তী রেমা ও তাঁর দল গাইলেন লোকগান আজিয়া। লেজুস রেমা আবার মঞ্চে এলেন চাম্বল মেসা, অর্থাৎ বানর নাচ নিয়ে। বাজালেন বিশেষ বাদ্যযন্ত্র আদুরি শিক্কা। গারো চিরায়ত গান গাইলেন কয়ইনী মৃ।

থকবিরিম সম্মাননা
পরিবেশনা শেষে দেওয়া হয় ‘থকবিরিম সম্মাননা ২০২৬’। গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও লোকসংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য তিনজনকে এই সম্মান জানানো হয়। তারা হলেন গীতিকার, সুরকার ও গায়ক তীরেশ নকরেক, জীবন্ত কিংবদন্তি খামাল নরেশ মৃ এবং শিশিলিয়া স্নাল। তীরেশ নকরেকের হাতে উত্তরীয়, ক্রেস্ট ও সম্মানীর খাম তুলে দেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী ও নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন। উৎসবে অতিথি হয়ে এসেছিলেন শিল্প-সাহিত্যাঙ্গনের অনেক পরিচিত মুখ। গারো সমাজের বিশিষ্টজনেরাও ছিলেন।

চুয়ের স্বাদে সেরা কে
সম্মাননার পর শুরু হয় চুমান্থি বা চু বিচ্চির প্রতিযোগিতা। চু গারোদের প্রধান পানীয়। কার তৈরি চু সবচেয়ে ভালো, তা-ই এখানে বিচার হয়। সেরা হয়েছেন উত্তর চুনিয়া গ্রামের সন্ধ্যা রিছিল। তিনি পেয়েছেন নগদ অর্থ। অংশ নেওয়া বাকিরাও পেয়েছেন সান্ত্বনা পুরস্কার।

দুপুরে সবাই একসঙ্গে খেতে বসেন। খাওয়ার পর আবার চু, আবার আজিয়া আর রেরে। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলে সেই আসর।

ওয়ানগালা উৎসবের একটি মুহূর্ত

তৃতীয় দিন: একতালে থামার সাধনা
শেষ দিনের আচারের নাম কাত্তি গালা। সকাল ৯টায় শুরু হয় এই আমুয়া। এটি মূলত মিসি সালজংকে বিদায় জানানোর প্রার্থনা। পরিচালনায় ছিলেন খামাল নকুল নকরেক ও মাদ্দক এলিসন মৃ। খামাল দেবতাকে ধন্যবাদ জানান, কৃতজ্ঞতা জানান। নতুন বছরের জন্য আশীর্বাদ চান।

কাত্তি গালার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য বাজনায়। এ সময় দামা, রাং, আদুরি, নাটুক আর খ্রাম বাজানো হয়। বাদকেরা বাজান খুব সাবধানে। কারণ সবার বাজনা একই তালে, একই সুরে, একসঙ্গে থামতে হবে। কারও এক মুহূর্ত আগে বা পরে থামলে চলবে না। যতক্ষণ সবার বাজনা একসঙ্গে না থামে, ততক্ষণ বাজাতেই হয়। অনুষ্ঠানও শেষ হয় না। কখনো তিন-চারবার, কখনো পাঁচ-ছয়বার নতুন করে বাজাতে হয়।

সবাই একতালে থামতে পারলে খামাল কাত্তি গালার মন্ত্র পড়েন। তারপর রাং, নাটুক আর দামা বাজানোর কাঠি ফেলে দেন। এখানেই আচারের সমাপ্তি।

এবার দুয়েকবার বাজানোর পরই সবাই একসঙ্গে সবার বাজনা থামতে পেরেছে। গত বছর এতে বেশ কয়েকবার লেগেছিল। কয়েক দিনের জন্য হলেও একটা গ্রামের এতগুলো হাত এক তালে বাঁধা পড়ে। তাই এই আচার শুধু ধর্মীয় নিয়ম নয়। এটি একসঙ্গে থাকার অনুশীলনও।

নকমার ঘরে ফেরে বাদ্য
কাত্তি গালার পূজা শেষে দুপুরের খাবার পরিবেশন করা হয়। খাওয়ার পর ওয়ানগালার দামা, রাং, আদুরি, নাটুক আর খ্রাম নিয়ে যাওয়া হয় নকমার বাড়িতে। নকমা গ্রামপ্রধান। সারা বছর এই বাদ্যযন্ত্র তাঁর ঘরেই থাকে। একটি মোরগ আর চু দিক্কা দিয়ে পূজা করে বাদ্যযন্ত্রগুলো তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ঘোষণা আসে, ২০২৬ সালের ওয়ানগালা শেষ।

বাদ্যগুলো এখন নকমার ঘরে নীরব। আবার বাজবে আগামী বছর, নতুন ফসল ঘরে উঠলে। প্রশ্ন একটাই থেকে যায়। সাংসারেক মানুষ কমছে, বনের জমি কমছে। কত দিন এভাবে আদি রীতিতে বাজবে চুনিয়ার দামা? উত্তরটা নির্ভর করছে চুনিয়ার মানুষ আর তাদের মাটি কত দিন টিকে থাকে, তার ওপর।

আরও পড়ুন

×