ঢাকা শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

কাঞ্চনজঙ্ঘার ডাকে তেঁতুলিয়ার হোমস্টে

কাঞ্চনজঙ্ঘার ডাকে তেঁতুলিয়ার হোমস্টে
×
×

ছবি :: মারুফ হাসান আবির

  আল আমিন

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

কার্তিকের ভোর। মহানন্দার তীর থেকে কুয়াশা তখনও পুরোপুরি সরেনি। ডাকবাংলোর উঁচু চত্বরে চাদর গায়ে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন। সবার চোখ উত্তরের আকাশে। মেঘ সরে গেলেই দূরে জেগে ওঠে সাদা পাহাড়ের সারি। সূর্যের প্রথম আলো পড়লে সেই বরফচূড়া সোনালি হয়ে যায়। এ দৃশ্যের টানেই প্রতি শীতে মানুষ ছোটেন দেশের সর্ব উত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়ায়।

পঞ্চগড়ের এ জনপদে সারাবছরই পর্যটকরা যান। তবে অক্টোবর থেকে শীতের শেষ পর্যন্ত ভিড় বাড়ে কয়েক গুণ। আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট আর জেলা পরিষদের হাতেগোনা কয়েকটি ডাকবাংলো এই চাপ সামলাতে পারে না। উপজেলা প্রশাসনের এক হিসাবে অক্টোবর-নভেম্বরে এখানে দিনে গড়ে ৫০০ জন এবং ছুটির দিনে পাঁচ হাজারের বেশি পর্যটক আসেন, অথচ রাতে থাকার ব্যবস্থা ছিল মাত্র ২৫০ জনের। এ ঘাটতি থেকে জন্ম নিয়েছে এক নতুন চর্চা। ডাকবাংলো ও আশপাশের গ্রামের মানুষ নিজেদের বাড়ির খালি ঘর ভাড়া দিচ্ছেন অতিথিদের। নাম হোমস্টে। 
পৃথিবীর অনেক দেশে এ ব্যবস্থা পুরোনো। এয়ারবিএনবির মতো প্ল্যাটফর্মে ঘরে বসেই বুক করা যায় কোনো অচেনা পরিবারের অতিথি কক্ষ। তেঁতুলিয়ায় অবশ্য এখনও সবটা চলে মুখে মুখে, ভরসার ওপর।
গাজীপুর থেকে আসা শাকিল হোসেনের গল্পটা তেমনই। বন্ধুদের নিয়ে এসে কোনো হোটেল বা রিসোর্টে জায়গা পাননি। শেষে উঠেছিলেন এক গৃহস্থের বাড়িতে। আটজন মিলে দুটি ঘর। চারপাশে নিরিবিলি, উঠানে শীতের রোদ। তাঁর কাছে রাতটা ছিল রোমাঞ্চের। হোটেলের বাঁধা নিয়মের বাইরে গ্রামের মানুষের সঙ্গে থাকার স্বাদ তারা আগে পাননি।

ডাকবাংলোর পাশেই স্কুলশিক্ষক আসাদের বাড়ি। তিনি বলেন, ‘আমাদের দুটি ঘর সারাবছর ফাঁকা পড়ে থাকে। পর্যটনের মৌসুমে সেগুলো ভাড়া দিই। আমাদের জন্য এটা নতুন অভিজ্ঞতা। অতিথিরাও খুশি। এলাকার অনেকে এখন একই কাজ করছেন।’ কেউ ভাড়া নিচ্ছেন জনপ্রতি, কেউ ঘর হিসেবে। এক রাতের ভাড়া ৫০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা। গ্রামের সংসারে শীতের এই বাড়তি আয় কম কিছু নয়।
একসময়ের পতিত গোচারণ জমি এখন সবুজ চা-বাগানে ঢাকা। ২০০০ সালে কয়েকটি কোম্পানি তেঁতুলিয়ায় বাগান গড়ে তোলার পর ক্ষুদ্র চাষি পর্যায়ে চা চাষ ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৫ সালে দেশের মোট চায়ের ২১ শতাংশই এসেছে এ জেলা থেকে। কাছেই কাঞ্চনজঙ্ঘা। বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম এ শৃঙ্গের অবস্থান নেপাল ও সিকিম সীমান্তে। আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে ডিসেম্বর পর্যন্ত তেঁতুলিয়া থেকে এর চূড়া দেখা যায়। পাশে বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, মহানন্দার তীর, শতবর্ষী তেঁতুল গাছ। একটা জায়গায় এত কিছু, তবু পরিকল্পনা আর অবকাঠামোর ঘাটতি চোখে পড়ার মতো। 
হোমস্টের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও এখানেই। যারা ঘর খুলে দিচ্ছেন, তাদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। অতিথি আপ্যায়ন, পরিচ্ছন্নতা, খাবারের মান, নিবন্ধন, কিছুরই নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে সেবার মান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তেমনি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাড়ির মালিক ও পর্যটক দুই পক্ষের নিরাপত্তা। অচেনা মানুষকে ঘরে তোলা মানে আস্থার লেনদেন। সেই আস্থা টেকাতে চাই নিয়ম আর তদারকি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসাইন জানান, হোমস্টের একটি তথ্যভান্ডার তৈরির কাজ চলছে। সেবাদাতাদের আবাসন, খাদ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
উদ্যোগটি সময়োপযোগী। তবে শুধু তালিকা বানালেই চলবে না। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দরকার স্পষ্ট নির্দেশিকা, সহজ শর্তে ঋণ, প্রণোদনা এবং একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে পর্যটক আগেভাগে যাচাই করা ঘর বুক করতে পারবেন। ঠিকঠাক সাজানো গেলে হোমস্টে হয়ে উঠতে পারে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের ভিত্তি। বড় বড় ভবন না তুলেই বাড়বে থাকার জায়গা। গ্রামের নারী ও তরুণরা পাবেন নিজের উঠানেই কাজের সুযোগ। 

আরও পড়ুন

×