ঢাকা শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

খারাপ মুহূর্ত যেন খারাপ দিন না হয়

খারাপ মুহূর্ত যেন খারাপ দিন না হয়
×
×

মডেল :: সারিকা তাবাসসুম ছবি :: সাকিব আদনান অভি

 হিল্লোল চৌধুরী

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সকালে বাসে উঠতেই ভাড়া নিয়ে কন্ডাক্টরের সঙ্গে কথা কাটাকাটি। মহাখালীতে এক ঘণ্টার জট। অফিসে ঢুকতেই বসের কড়া কথা। দুপুরে বাসা থেকে ফোন এলো, গ্যাস নেই, রান্না হয়নি। সন্ধ্যায় বাজারে গিয়ে দেখা গেল পেঁয়াজের দাম আবার বেড়েছে। ফেরার পথে বৃষ্টিতে জুতা জোড়া ছিঁড়ল। রাতে মনে হয়, আজকের দিনটাই অভিশপ্ত।
এমন দিন সবার জীবনে আসে। এ শহরে হয়তো একটু বেশিই আসে। প্রশ্ন হলো, পুরো দিনটা কি সত্যিই খারাপ ছিল? নাকি একটা খারাপ মুহূর্তকে আমরা নিজেরাই টেনে লম্বা করেছি?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দ্বিতীয়টাই বেশি সত্য। যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী ম্যাথিউ লেহি, প্যাট্রিস লে গয় এবং স্নায়ু-মনোবিজ্ঞানী সানাম হাফিজের সঙ্গে কথা বলে সম্প্রতি এ বিষয়ে প্রতিবেদন করেছে রিডার্স ডাইজেস্ট। তাদের মতে, প্রথম ধাক্কাটা বাইরে থেকে আসে। এরপর মস্তিষ্ক নিজেই প্রমাণ জোগাড় করতে থাকে যে সারাদিনটাই মাটি।

মস্তিষ্ক কেন এমন করে
মানুষ বিপদ খুঁজে বেড়ানো প্রাণী। টিকে থাকার তাগিদে বিবর্তন আমাদের এভাবেই গড়েছে। তাই ভালো খবরের চেয়ে খারাপ খবর মনে বেশি দাগ কাটে। মনোবিজ্ঞানে একে বলে নেতিবাচকতার ঝোঁক। মন যখন একবার ধরে নেয় দিনটা খারাপ, তখন চোখ শুধু খারাপটাই খোঁজে। কথাবার্তা রুক্ষ হয়। মানুষের সঙ্গে ঠোকাঠুকি বাড়ে। আশঙ্কা নিজেই সত্যি হয়ে ওঠে। শরীরের ভেতরেও চলে আরেক খেলা। মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা বিপদের ঘণ্টা বাজায়। বুক ধড়ফড় করে; পেশি শক্ত হয়ে আসে। বাড়ে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল। মন শান্ত রাখার রাসায়নিক গাবা তখন চাপা পড়ে। যুক্তি আর সংযমের জায়গা প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স হাল ধরতে পারে না। এ কারণেই বিকেলের তৃতীয় ঝামেলাটা সকালের প্রথম ঝামেলার চেয়ে অনেক ভারী লাগে। সামান্য কথাও তখন বড় ঝামেলা হয়ে দাঁড়ায়।

ঘুরে দাঁড়ানোর পথ
সুখবর হলো, ঘুরে দাঁড়াতে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। স্নায়ুতন্ত্র প্রতি মুহূর্তে বাস্তব প্রেক্ষাপটে সাড়া দেয়। বিপদ কেটে গেছে–এমন সংকেত পেলেই সে শান্ত হতে শুরু করে।
প্রথম কাজ সুস্থির হওয়া। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখা। ‘সব শেষ’ না বলে বলা, ‘আমি এখন অস্থির’। আর ‘আজ দিনটা এলোমেলো যাচ্ছে’ এই কথা ঠিক নয়। ‘দিনটা জঘন্য’ না বলে বলুন, ‘গত ২০ মিনিট জঘন্য গেছে’। শুনতে হাস্যকর মনে হলেও তা কিন্তু কাজ করে। ৯৯টি গবেষণার এক পর্যালোচনা বলছে, যারা চাপের ঘটনাকে নতুন চোখে দেখতে পারেন, তারা কম উদ্বিগ্ন ও কম বিষণ্ন থাকেন। সপ্তাহখানেকের চর্চাতেই এ অভ্যাস খানিকটা রপ্ত করা যায়।

দ্বিতীয় কাজ জায়গা বদলানো। ঘর ছেড়ে বের হন। ছাদে উঠুন, পাশের গলিতে একটু হাঁটুন। ২০২৩ সালের এক গবেষণায় ১০০ জন মানুষ আধা ঘণ্টা হেঁটেছিলেন। কেউ সবুজে, কেউ শহরের রাস্তায়। দুই দলের মনই সমান ভালো হয়েছে। তার মানে, পার্ক না থাকলেও চলে। দরকার পরিবেশের বদল আর শরীরের নড়াচড়া।
তৃতীয় কাজ শরীরকে কাজে লাগানো। জিম লাগে না। জোরে হাঁটা কিংবা একটু হাত-পা নাড়িয়ে খালি হাতের ব্যায়ামই যথেষ্ট। জমে থাকা চাপ খরচ হওয়ার পথ পায়। তবে যিনি সারাদিন ইট টানেন, রোদে ধান কাটেন বা মেশিনে সেলাই করেন, তাঁর হিসাব আলাদা। তাঁর দরকার একটু জিরিয়ে নেওয়া, এক কাপ চা, সহকর্মীর সঙ্গে দুটো সুখ-দুঃখের কথা।
চতুর্থ কাজ প্রাণ ভরে শ্বাস। ধীরে নিন, আরও ধীরে ছাড়ুন। স্ট্যানফোর্ডের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় প্রতিদিন ৫ মিনিট লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ার চর্চা ধ্যানের চেয়েও বেশি মন ভালো করেছে। শরীর বুঝে নেয়, জরুরি অবস্থা শেষ।

যা করবেন না
সবচেয়ে বড় ভুল জোর করে ভালো থাকার চেষ্টা। ‘এখনও মন খারাপ কেন? এতক্ষণে তো ঠিক হওয়া উচিত ছিল।’ এই ‘উচিত’ শব্দটাই নতুন চাপ তৈরি করে। খারাপ লাগাকে কিছুক্ষণ থাকতে দিন। জীবন চলুক, অনুভূতি নিজের মতো থিতিয়ে আসুক।
কখনও হাল ছেড়ে দেওয়াও জীবনেরই অংশ। দিনটা জোর করে উদ্ধারের চেষ্টা থামান। গোসল করুন, খেয়ে নিন, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলুন, তাড়াতাড়ি ঘুমান। মাঝরাতে শুয়ে সারাদিনের হিসাব কষে লাভ নেই। আগামীকালের সকাল গতদিনের সমাধান চায় না। নিজের সঙ্গে কথা বলুন বন্ধুর মতো। যে কথা প্রিয় বন্ধুকে বলতেন না, তা নিজেকেও বলবেন না।

ব্যক্তির সীমা, রাষ্ট্রের দায়
তবে এসব কৌশল ব্যক্তির হাতিয়ার মাত্র। আমাদের অনেকের খারাপ দিন একদিনের নয়। দ্রব্যমূল্য, অনিশ্চিত চাকরি, যানজট আর নিরাপত্তাহীনতা রোজ চাপ বাড়ায়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন আর আক্রান্তদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো সেবাই নেন না। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মাত্র একজন। সেবাও আটকে আছে রাজধানী ও বিভাগীয় শহরে।
তাই খারাপ দিন যদি সপ্তাহ পেরিয়ে ঘুমহীনতা, ক্লান্তি বা হতাশায় গড়ায়, তখন শ্বাসের ব্যায়ামে হিসাব মিলবে না। লজ্জা ঝেড়ে বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে। রাষ্ট্রকেও সেবা পৌঁছে দিতে হবে উপজেলা পর্যন্ত। 

আরও পড়ুন

×