ঢাকা শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

চোখ জানালা মাত্র, দেখে মগজ

চোখ জানালা মাত্র, দেখে মগজ
×
×

 আহসান কবির

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রশ্নটা শুনে অনেকে হাসবেন। আমরা চোখ দিয়ে না দেখলে আর কী দিয়ে দেখব? চিকিৎসকদের বাইরে প্রায় সবাই এমনটাই ভাবেন। অথচ সত্যটা একটু অন্যরকম। চোখ আমাদের দেখতে সাহায্য করে ঠিকই, কিন্তু দেখার আসল কাজটা হয় মাথার পেছনে, মগজ বা মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশে। এর নাম ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স। মাথার পেছনের দিকের অক্সিপিটাল লোবে এর অবস্থান। স্নায়ুবিজ্ঞানে একে ব্রডম্যানের ১৭, ১৮ ও ১৯ নম্বর এলাকা বলা হয়।

তাহলে চোখের কাজ কী? চোখ বাইরের জগৎ থেকে আসা আলো গ্রহণ করে। সেই আলোকে সংকেতে বদলে পাঠিয়ে দেয় মস্তিষ্কে। ছবিটা তৈরি হয় সেখানে, অর্থও পায় সেখানেই।
ব্যাপারটা বোঝার জন্য পুরোনো দিনের ফিল্ম ক্যামেরার কথা ভাবা যাক। সামনের দৃশ্য থেকে আসা আলো লেন্সে বেঁকে গিয়ে পেছনের ফিল্মে পড়ে। রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ছবিটা ফিল্মে আটকে যায়। তখনও সেটা চোখে দেখার মতো ছবি নয়। ল্যাবে নিয়ে ডেভেলপ করতে হয়। চোখ হলো সেই ক্যামেরা আর মস্তিষ্ক হলো ল্যাব।
চোখের ভেতরে ঘটনাটা ঘটে এভাবে। আলো প্রথমে চোখের সামনের স্বচ্ছ পর্দা কর্নিয়া পেরোয়। তারপর লেন্স ভেদ করে গিয়ে পড়ে চোখের পেছনের পর্দা রেটিনায়। রেটিনায় আছে আলো-সংবেদী কোটি কোটি কোষ। এর মধ্যে প্রায় ১২ কোটি রড কোষ আবছা আলোয় দেখায় সাহায্য করে আর প্রায় ৬০ লাখ কোনো কোষ চেনায় রং ও সূক্ষ্ম খুঁটিনাটি। আলো এসব কোষে পড়লে একটি আলোক-রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। তাতে আলো বদলে যায় বৈদ্যুতিক সংকেতে।

এই সংকেত প্রায় ১০ লাখ স্নায়ুতন্তুর গুচ্ছ অপটিক নার্ভ ধরে এগোয়। মাথার ভেতরে দুই চোখের স্নায়ু এক জায়গায় এসে মেলে। এর নাম অপটিক কায়াজমা। এখানে প্রতিটি চোখের ভেতরের দিকের অর্ধেক তন্তু পথ বদলে চলে যায় উল্টো পাশে। ফলে ডান দিকের দৃশ্যের খবর যায় মস্তিষ্কের বাঁদিকে, বাঁদিকেরটা ডানে। এরপর সংকেত অপটিক ট্র্যাক্ট ধরে পৌঁছায় থ্যালামাসের একটি রিলে কেন্দ্রে। সেখান থেকে অপটিক রেডিয়েশন হয়ে শেষে ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সে। এই পুরো যাত্রা শেষ হয় সেকেন্ডের এক ভগ্নাংশে। তখনই আমরা দেখি।
এখানে একটা মজার ব্যাপার আছে। চোখের লেন্স দুদিকে উত্তল। এমন লেন্স যে ছবি তৈরি করে, তা উল্টো। অর্থাৎ রেটিনায় গাছের মাথা পড়ে নিচে, শিকড় ওপরে। অথচ আমরা গাছ সোজাই দেখি। কারণ মস্তিষ্ক ছবিটাকে উল্টে দেয় না, বরং ছবিটা পড়তে শেখে। জন্মের পর থেকে স্পর্শ, শরীরের ভারসাম্য আর চলাফেরার অভিজ্ঞতা মিলিয়ে মস্তিষ্ক বুঝে নেয় কোনটা ওপর, কোনটা নিচ। ১৮৯৬ সালে মনোবিজ্ঞানী জর্জ স্ট্র্যাটন এক পরীক্ষা করেন। তিনি এমন চশমা পরেন, যাতে সব দৃশ্য উল্টো দেখায়। প্রথম কদিন তিনি দিশেহারা ছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর মস্তিষ্ক নতুন নিয়মে মানিয়ে নেয়। তবে স্নায়ুর বৈদ্যুতিক সংকেত থেকে কীভাবে ‘দেখা’র অনুভূতি জন্মায়, সে প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর বিজ্ঞান আজও দিতে পারেনি। বিস্ময়টা আসলে সেখানেই।

আরেকটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ছাদের ডিশ অ্যান্টেনা আকাশ থেকে তরঙ্গ ধরে। তারের মাধ্যমে সেই তরঙ্গ যায় টেলিভিশনে। ভেতরের যন্ত্রপাতি তরঙ্গকে ছবিতে রূপ দেয়, তবেই আমরা পর্দায় দৃশ্য দেখি। অ্যান্টেনা ঠিক থাকলেও টেলিভিশন নষ্ট হলে ছবি আসবে না। চোখ আর মস্তিষ্কের সম্পর্কও তেমন।
চিকিৎসার দিক থেকে এ কথার গুরুত্ব অনেক। কারও মাথার পেছনে টিউমার হলে, স্ট্রোক বা রক্তক্ষরণ হলে কিংবা বড় আঘাত লাগলে তিনি দৃষ্টি হারাতে পারেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলে কর্টিক্যাল ব্লাইন্ডনেস। এমন রোগীর চোখ দেখতে একেবারে স্বাভাবিক। আলো ফেললে চোখের মণি ঠিকঠাক সাড়া দেয়। অথচ তিনি কিছুই দেখেন না। কোনো কোনো রোগী নিজের অন্ধত্বও টের পান না, অন্ধ হয়েও জোর দিয়ে বলেন তিনি দেখছেন। এর নাম অ্যান্টন সিনড্রোম।

চোখ থেকে মস্তিষ্ক পর্যন্ত পথের যে কোনো জায়গায় সমস্যা হলেও দৃষ্টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার অপটিক কায়াজমায় চাপ দিলে দুই চোখেরই পাশের দিকের দৃষ্টি কমে যায়। রোগী অনেক সময় বুঝতেই পারেন না। হাঁটতে গিয়ে পাশের জিনিসে ধাক্কা খান। তাই চোখ পরীক্ষায় সব ঠিক থাকার পরও কেউ ভালো না দেখলে চক্ষু বিশেষজ্ঞ দৃষ্টিক্ষেত্র পরীক্ষা বা মস্তিষ্কের স্ক্যান করাতে বলেন। এটা বাড়তি খরচ নয়, জরুরি সতর্কতা।
তাহলে দাঁড়াল এই–চোখ আমাদের জানালা। আলো সেই জানালা দিয়ে ঢোকে। কিন্তু ঘরের ভেতরে বসে যে দেখে, বোঝে, চিনে নেয়, সে আমাদের মগজ। v
লেখক: চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ, যশোর

আরও পড়ুন

×