পরিকল্পিতভাবে হত্যার দাবি পরিবারের
গ্রেপ্তারের পরদিন কারাগারে যুবলীগ নেতার মৃত্যু
পাঁচ মাসে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ৫২ জন
নুরুল আলম
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৮:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
গ্রেপ্তারের পরদিন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নুরুল আলম (৩৫) নামে এক যুবলীগ এক নেতা মারা গেছেন। গতকাল বুধবার সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। গ্রেপ্তারের সময় নুরুল সুস্থ ছিলেন বলে দাবি করেছে পুলিশ। তবে কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, শ্বাসকষ্টজনিত রোগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
নুরুল আলমের পরিবারের দাবি, জমি নিয়ে স্থানীয় কিছু লোকের সঙ্গে তাদের বিরোধ রয়েছে।
এর জেরে ‘যুবলীগ’ ট্যাগ দিয়ে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে গ্রেপ্তারের পর হত্যা করা হয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত সারাদেশে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ৫২ জন। তাদের মধ্যে বিচারাধীন বন্দি বা হাজতি ৩৩ জন; সাজাপ্রাপ্ত বন্দি বা কয়েদি ১৯ জন।
মৃত নুরুল আলম চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়নের উত্তর ঢেমশা গ্রামের প্রয়াত এবার হোসেনের ছেলে। তিনি ঢেমশা ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তাঁর দুই ছেলে এবং এক কন্যাসন্তান রয়েছে।
পুলিশ, কারা কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে নুরুল আলমকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। সেদিন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নাশকতা ঠেকাতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে তিনি গ্রেপ্তার হন। পরে তাঁকে সাতকানিয়া থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
জুলাই আন্দোলনের সময় হামলা, মারধর, হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনের এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে পরে নুরুলকে আদালতে পাঠায় পুলিশ। তবে ওই মামলার এজাহারে তাঁর নাম ছিল না বলে জানা গেছে। এ কারণে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের মধ্যে ‘তদন্তে প্রাপ্ত’ দেখিয়ে গ্রেপ্তার দেখানো হয় নুরুলকে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিটে তাঁকে কারাগারে নেওয়া হয়। রাখা হয় ৪ নম্বর সূর্য সেন ওয়ার্ডে।
কারা কর্তৃপক্ষ যা বলছে
কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, বুধবার সকাল পৌনে ৭টার দিকে বন্দি গণনার সময় শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া ও বুকে ব্যথা করার কথা জানান নুরুল। প্রথমে তাঁকে কারা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তাঁকে নেওয়া হয় চমেক হাসপাতালে। সেখানকার জরুরি বিভাগে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার ইকবাল হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে চমেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা নুরুল আলমের ‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক’ হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁকে যখন কারাগারে আনা হয়েছিল তখন সুস্থ ছিলেন। সে সময় তাঁর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্নও ছিল না। মঙ্গলবার রাতেও শারীরিক কোনো অসুবিধার কথা তিনি জানাননি।
কারাগারের জেলার সৈয়দ শাহ্ শরীফ জানান, বুধবার সকালে অসুস্থবোধ করার পর তাঁকে প্রথমে কারা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা জানান তিনি শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু নেওয়ার পথেই তিনি মারা গেছেন।
পুলিশের ভাষ্য
সাতকানিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, ডিবির একটি টিম নুরুলকে গ্রেপ্তার করে থানায় হস্তান্তর করে। পরে আমরা একটা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠাই। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তাঁর বিরুদ্ধে আগের কোনো মামলার রেকর্ড নেই।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) মোহাম্মদ ইব্রাহীম জানান, গ্রেপ্তারের সময় নুরুলকে সুস্থ দেখা যায়। এ সংক্রান্ত বেশকিছু ছবি ও ভিডিও আমাদের কাছে আছে। হাস্যোজ্জ্বলভাবে তিনি নিজেও আদালতে ছবি তোলেন। এ ধরনের ছবি তাঁর পরিবারের সদস্যরাও সামাজিক মাধ্যমে দিয়েছেন।
পরিবার যা বলছে
নুরুলের ভাই নূর মোহাম্মদ জানান, জমি নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কয়েক স্থানীয় নেতার সঙ্গে তাদের বিরোধ ছিল। গত মঙ্গলবার সাতকানিয়া ভূমি অফিসে ওই জমি নিয়ে শুনানিও হয়। শুনানিতে অংশ নিতে গিয়েছিলেন নুরুল। সেখান থেকে গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে আটক করে নিয়ে যায়। যুবলীগের পদে থাকলেও বেশ কিছুদিন ধরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন না নুরুল। নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘রাজনৈতিক তো নয়, আমার ভাইয়ের নামে থানায় কোনো মামলাও ছিল না। জায়গাজমির বিরোধেই তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফাঁসানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যুবলীগের নেতা পরিচয়কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম নগরের রেয়াজউদ্দিন বাজার এলাকায় সে ব্যবসা করত।’
তিনি আরও বলেন, ‘মঙ্গলবার গ্রেপ্তারের পর তড়িঘড়ি করে আমার ভাইকে থানার মাধ্যমে আদালতে পাঠানো হয়। সন্ধ্যার দিকে যখন তাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখনও সে সুস্থ ছিল। অথচ বুধবার সকালে কারাগার থেকে ফোন করে জানানো হয় আমার ভাই নাকি মারা গেছে।’
নূর জানান, একটা জায়গার বিরোধে তার পরিবারের ওপর অনেক দিন ধরে নির্যাতন চলে আসছে। নুরুল ১৫ বছর ধরে তামাকুমন্ডি লেইনের বিনিময় টাওয়ারে ব্যবসা করে আসছে। কয়েক মাস আগে নূর ও নুরুলকে ‘ইয়াবা ব্যবসায়ী’ বলে আরিফ উদ্দিন এসপি অফিসে অভিযোগ দিয়েছিল। তবে সাতকানিয়ার সার্কেল এসপি বিষয়টি তদন্ত করে এর সত্যতা পাননি। নূর অভিযোগ করে বলেন, ‘আরিফ উদ্দিন, নুরুল আলম মেম্বার ও মিনহাজ উদ্দিন টুটুল আমার ভাইকে খুনের পরিকল্পনা করে। এতে অর্থের জোগান দেন রফিক হাজী ও সোবহান হাজী। এ পাঁচজন মিলে আমার ভাইয়ের জীবনটা শেষ করে দিয়েছে। স্থানীয়ভাবে তারা বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থক ও রাজনীতির সাথে জড়িত হিসেবে পরিচিত।’
নুরুল আলমের বড় বোন বকুল আকতার বলেন, ‘জায়গার বিরোধেই আমার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। বুধবার সকালে মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি ও আমার ভাই নূর জেলে গিয়ে জানতে পারি, রাত ২টার দিকে নাকি আমার ভাই বমি করেছে। বমির সঙ্গে রক্তও গেছে। বমিগুলো একটা বোতলে নেওয়া হয়েছে। তবে বমি ভরা বোতলটা জেল থেকে খুঁজলেও আমাদের দেওয়া হয়নি। বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ভাইকে হত্যা করা হয়েছে।’
কেন্দ্রীয় কারাগারে কয়েদির মৃত্যু
ঢাকার কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে আবদুর রশিদ (৬৫) নামের এক কয়েদি মারা গেছেন। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
কারাগারের জেলার মোহাম্মদ মাসুদ হাসান জুয়েল সমকালকে বলেন, আবদুর রশিদের বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়। ২০০৭ সালে মুক্তাগাছা থানার একটি হত্যা মামলায় তাঁর ৩০ বছরের সাজা হয়েছিল। তিনি ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দি ছিলেন। অসুস্থতার কারণে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর তাঁকে কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। তিনি নানা রোগে আক্রান্ত ছিলেন। একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। অসুস্থতার কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
কারা হেফাজতে ১০৭ ব্যক্তির মৃত্যু
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারাদেশে কারা হেফাজতে ১০৭ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৬৯ হাজতি ও কয়েদি ৩৮ জন। ২০২৪ সালে কারা হেফাজতে ৬৫ জন মারা যান। তাদের মধ্যে হাজতি ৪২ ও কয়েদি ২৩ জন। ২০২৩ সালে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ১০৬ জন। তাদের মধ্যে হাজতি ৬৪ ও কয়েদি ৪২ জন। ২০২২ সালে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ৬৫ জন। তাদের মধ্যে হাজতি ৩৭ ও কয়েদি ২৮ জন।
বরিশালে যুবক খুন
বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায় প্রতিপক্ষের হামলায় মাহবুব আলম বাবু নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার রাতে সদর ইউনিয়নের পশ্চিম সাদেকপুর গ্রামে তাঁর ওপর হামলা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকায় নেওয়া হলে বুধবার সকালে তিনি মারা যান। মাহবুব পশ্চিম সাদেকপুর গ্রামের দুলাল রাঢ়ীর ছেলে। তাঁর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে।
মাহবুবের বাবা দুলাল জানান, সাদেকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে জমিতে দোকানঘর তোলা নিয়ে স্থানীয় শহীদ পোদ্দারের সঙ্গে তাদের বিরোধ চলছে। সেখানে মাহবুবের তোলা ঘর ভেঙে দেন শহীদ। এ ঘটনায় মেহেন্দীগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে মাহবুব একটি চায়ের দোকানে বসেছিলেন। তখন শহীদ, বজলু, নয়ন, সাইদুলসহ কয়েকজন তাঁকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম করে। মাহবুবকে প্রথমে মেহেন্দীগঞ্জ হাসপাতাল, পরে বরিশাল মেডিকেল এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতেই ঢাকায় নেওয়া হয়। বুধবার সকালে সেখানে তিনি মারা যান। দুলাল জানিয়েছেন, তার ছেলে আগে আওয়ামী লীগ করত। এখন কোনো দল করে না।
মাহবুব নিহতের বিষয়ে জানতে চাইলে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের স্থানীয় সাবেক এমপি পংকজ নাথ অভিযোগ করে বলেন, ‘মঙ্গলবার মেহেন্দীগঞ্জে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিল হয়। এর পর থেকে বিএনপি লোকজন মহড়া দিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা করছে। একটি চায়ের দোকানে মাহবুবকে পেয়ে তাঁকে কুপিয়ে জখম করেছে। এতে তাঁর মৃত্যু হয়।’ একই অভিযোগ তুলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ কর্মীরা ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন।
মাহবুব ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন উল্লেখ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের উপজেলা সভাপতি নীরব ব্যাপারী বলেন, ‘সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থাকায় মাহবুবকে কোনো পদে অধিষ্ঠিত করা যায়নি। তাকে কারা, কীভাবে হত্যা করেছে, পুলিশের তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসবে।’
গতকাল মেহেন্দীগঞ্জ থানার ওসি মোমিন উদ্দিন জানান, হত্যার ঘটনায় কেউ কোনো অভিযোগ দেয়নি।
(সমকাল প্রতিবেদক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যুরো ও প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য)
- বিষয় :
- মৃত্যু
