বাংলাদেশ যেভাবে সিঙ্গাপুরের চেয়েও শক্তিশালী
কাওসার চৌধুরী
প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:০৫
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বলেছেন, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এখন সিঙ্গাপুরের চেয়েও শক্তিশালী। বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন- 'সিঙ্গাপুর ছোট দেশ, জনসংখ্যাও খুব কম। সেখানে শৃঙ্খলা আছে। সিঙ্গাপুরে বিরোধী দল বা অন্য কোনো কিছু নেই। একটি পত্রিকা, সরকার দ্বারা চলে। সেখানকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ যে রকম, তাতে উন্নয়ন করাটা অনেক সহজ। আর বাংলাদেশ আয়তনে ছোট; কিন্তু জনসংখ্যা অনেক বেশি। এখানে প্রতিনিয়ত অগ্নিসন্ত্রাস, খুন-খারাবি, অত্যাচার- এগুলো মোকাবিলা করতে হয়। এখানে উন্নয়ন করা কঠিন কাজ।'
প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, বড় বড় জ্বালাও-পোড়াওয়ের মতো ঘটনা, এমনকি মানুষ পোড়ানোর মতো নির্মম ঘটনাকে শক্ত হাতে সামাল দিয়েই তো এই বর্তমান সরকার এতদূর পর্যন্ত এসেছে। বাংলাদেশে চলমান সরকার তো 'বকুল বিছানো পথ' কোনোদিন পেয়েছে বলে মনে হয় না! কিন্তু এখানে কয়েকটি ব্যাপার খুব সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করা প্রয়োজন- প্রথমত, ১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পায় সিঙ্গাপুর। সেদিন এই সিঙ্গাপুরেই ব্রিটেনের পতাকাটি নেমেছে আর সিঙ্গাপুরের পতাকাটি উত্তোলন করা হয়েছে আপসে। এই স্বাধীনতা লাভের জন্য সিঙ্গাপুরকে ব্রিটেনের সঙ্গে কোনো যুদ্ধ করতে হয়নি। এর পর একই বছরে মাত্র এক মাস পর, ১৯৬৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার সঙ্গে একীভূত হয়; কিন্তু ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট আবার পৃথক হয়ে যায়। লি কুয়ান ইউ সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং ৩০ বছর ধরে তিনি সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। স্মর্তব্য, লি কুয়ানকে কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে গড়ে তুলতে হয়নি। মোকাবিলা করতে হয়নি স্বাধীনতার প্রতিপক্ষকে। দ্বিতীয়ত, বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন- সিঙ্গাপুর কিন্তু একটি নগর রাষ্ট্র। বলা হয়ে থাকে, সিঙ্গাপুর প্রকৃতপক্ষে 'একটি নগর (দ্বীপ), একটি দেশ'। সিঙ্গাপুরের আয়তন সাত হাজার ১০২ বর্গকিলোমিটার, যা বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তনের প্রায় সাত ভাগের এক ভাগ। সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৫৬ লাখ। লি কিউ যখন ক্ষমতায় আসেন (১৯৬৩), তখন সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যা ছিল ১৭ লাখ মাত্র। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় আমাদের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। আজ সেটা বেড়ে হয়েছে ১৭ কোটি। এর মাঝে শুধু রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাই বর্তমানে দেড় কোটির মতো। বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জগুলো সেই নিরিখে অনেক বেশি; তৃতীয়ত, বাংলাদেশকে আজ থেকে ৪৯ বছর আগে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে, যে কাজটি (যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন) সিঙ্গাপুরকে করতে হয়নি। বাংলাদেশের লড়াই-সংগ্রামের এখানেই শেষ নয়। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছর পরে পঁচাত্তরের জঘন্য হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে- দেশ স্বাধীন হলেও বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি নির্মূল তো হয়ইনি, বরং গোপনে তারা প্রচণ্ড শক্তি সঞ্চয় করে সুযোগের অপেক্ষাতেই যে আত্মগোপনে ছিল, সেটা তারা প্রমাণ করেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি যে উদ্দেশ্যে এবং যে চেতনার ভিত্তিতে স্বাধীন হয়েছিল (চার মূল নীতি), সেটাকেই মুছে ফেলার চেষ্টা হলো। ইতিহাস-ঐতিহ্যের মূল চাকাকে ঘুরিয়ে দেওয়া হলো উল্টোদিকে। সেই বিপরীত সময় থেকে বেরিয়ে আসতেই তো বাংলাদেশের চলে গেল প্রায় দুই যুগ; 
চতুর্থত, পক্ষান্তরে লি কুয়ান সিঙ্গাপুর রাষ্ট্রের অভ্যুদয় থেকে পরবর্তী ৩০ বছর টানা প্রধানমন্ত্রীর আসনে আসীন থেকে রাষ্ট্রের স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ করেছেন। ১৯৯০ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদে ইস্তফা দিলেও সিনিয়র মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন ২০০৪ সাল পর্যন্ত। এরপরে লি কুয়ান তার নিজের সন্তান লি সিয়েন লংয়ের অধীনে মিনিস্টার মেন্টর বা অ্যাডভাইজারি হিসেবে ছিলেন ২০১১ সাল পর্যন্ত। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, লি কুয়ান সর্বমোট প্রায় ৫৪ বছর মন্ত্রিত্ব করেছেন। শুধু দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারাটাই উন্নয়নের একমাত্র পূর্বশর্ত নয় নিশ্চয়। আমাদের দেশে কোনো ইতিবাচক কাজ করতে হলে কর্ম সম্পাদনের পাশাপাশি উল্টো স্রোতকে সামাল দিতে হয় মূল কাজের চেয়েও দ্বিগুণ শক্তি দিয়ে।
সিঙ্গাপুরের কিংবদন্তি প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ানের সমালোচনাও কিন্তু কম নেই! ইন্টারনেটের এক জায়গায় দেখা যায়, একজন লিখেছেন- Lee’s rule was criticized for curtailing civil liberties (media control and limits on public protests) and bringing libel suits against political opponents. He argued that such disciplinary measures were necessary for political stability which, together with the rule of law, was essential for economic progress. Once he said- anybody who decides to take me on needs to put on knuckle-dusters. If you think you can hurt me more than I can hurt you, try. ঠান্ডা মাথায়, খুব শক্ত হাতে সিঙ্গাপুরকে শাসন করে গড়ে তুলেছেন লি কুয়ান ইউ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর মাঝেই দেশের অনেক ইতিবাচক কর্মকাণ্ড দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় মর্যাদার যে আসনে আসীন করেছেন, সেটা অনন্যসাধারণ। শুধু সিঙ্গাপুরই নয়, ইদানীং ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশকে তুল্যমূল্য বিচারে অগ্রগামী বলে অভিহিত করছেন অনেকেই। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এই সমকাল পত্রিকার শেষ পাতায় একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে 'বাংলাদেশ যেভাবে ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে' শিরোনামে। হিন্দুস্তান টাইমসের একটি নিবন্ধে ভারতের সাংবাদিক উপস্থাপক ও লেখক করণ থাপার লেখার উদ্ধৃতি- সংবাদদাতা সরাসরি উপস্থাপন করেছেন এইভাবে- 'প্রথমত, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি যে হারে এগোচ্ছে তা নিয়ে আমরা ভারতে হিংসা করতে পারি। আমরা রয়েছি ৫ শতাংশের নিচে আর বাংলাদেশ ৮ শতাংশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।' শুধু এখানেই শেষ নয়, করণ থাপা বিদেশি বিনিয়োগ, জীবনযাপন, নারী-পুরুষের সম্ভাব্য আয়ুস্কাল- এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে বেশ এগিয়ে আছে বলেই উলেল্গখ করেছেন। শিশুমৃত্যুর হার ঠেকানোতে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে বলেই তিনি দাবি করেন। এ ছাড়াও নারীর অগ্রগতি বাংলাদেশকে উন্নয়নের যে উচ্চতায় চড়তে সহায়তা করেছে, সেটাও তুলে ধরেন করণ থাপা।
বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়ে বলতে চাইলে অনেক কিছুই বলা যায়। কিন্তু পত্রিকারও তো একটি স্থান সংকুলানের ব্যাপার আছে। আজ না হয় এটুকুই থাক, বাকি কথা পরে হবে।
চলচ্চিত্র নির্মাতা
- বিষয় :
- রাষ্ট্র ও সমাজ
