সমাজ গঠনে মানবিক মূল্যবোধ
নাছিমা বেগম
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:০০
সুস্থ সমাজ গঠনে মানবিক মূল্যবোধের কোনো বিকল্প নেই। পত্রিকার পাতা
খুললে প্রায়ই যেসব অমানবিক বর্বর নিষ্ঠুরতার চিত্র পাওয়া যায়, তা নিন্দা
জানানোর ভাষাও থাকে না। সম্প্রতি বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরারের
নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ড এমনই একটি ঘটনা, যা সমগ্র জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
মানবরূপী এসব দানবের প্রতি জনমনে তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ সঞ্চারিত হয়েছে। এর
রেশ কাটতে না কাটতেই আরও একটি নারকীয় হত্যাকাণ্ড। এবারের শিকার পাঁচ বছরের
শিশু তুহিন। নজিরবিহীন জঘন্য কায়দায় নৃশংস হত্যাকাণ্ড। এ কোন জিঘাংসার ফসল?
প্রাথমিক তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ঘটনাটি
বাবা-চাচাদের দ্বারা সংঘটিত। অতীতেও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য স্বজন
হত্যার বহু নজির রয়েছে। কিন্তু নৃশংসতার সব সীমা ছাড়িয়ে নিজের শিশুসন্তানকে
হত্যা করে বীভৎস কায়দায় শিশুটির বিভিন্ন স্পর্শকাতর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে
গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে কী প্রমাণ করতে চেয়েছে খুনিরা? কোনো মানুষের পক্ষে
একটা শিশুকে খুন করে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এ বীভৎস কায়দায় কর্তন করা সম্ভব?
বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। পিতার কাছে যদি সন্তানের নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে
শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয় কোথায়? আবরার কিংবা তুহিন, যারা নৃশংসতার শিকার
হলো আমি মনে করি, এ এক বিকৃত মানসিকতা-সম্পন্ন খুনিদের নিষ্ঠুর উলল্গাস।
এসবের পরিবর্তন দরকার। দরকার মনুষ্যত্ব জাগ্রত করা। মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন
সমাজ গঠনটাও আজ বড় জরুরি।
নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ হারানোর হাহাকার আজ চারদিকে। বুয়েটের ছাত্র
আবরারকে যারা পিটিয়ে মেরে ফেলল, তারা তো একই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র। তিন দফায়
আবরারকে পেটানো হয়। একজনও এগিয়ে এলো না থামাতে। একজনেরও বিবেক জাগ্রত হলো
না। আবরারের হত্যাকারীরা প্রত্যেকেই নটর ডেম কলেজের ছাত্র, মেধাবী। এই
খবরটা জেনে আমার ছেলেরও খুব মন খারাপ। কারণ সে নটর ডেমের ছাত্র ছিল। এখান
থেকে মানুষ পরিশীলিত জীবনের শিক্ষা পায়। অথচ ছাত্র নামধারী শিক্ষিত এই
খুনিদের কারণে আজ প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ হলো। আমি মনে করি, এই নৃশংস
হত্যাকাণ্ডে শুধু আবরারের বাবা-মা তাদের সন্তানকে হারিয়েছেন এমনটি নয়,
ক্ষতি হয়েছে দেশ-জাতি সবার। এই খুনিরা এতটাই ঘৃণিত হয়েছে যে, জেলখানার
কয়েদিরা পর্যন্ত তাদের ধিক্কার দিয়েছে। তাদের পিতা-মাতার অবস্থা আরও করুণ।
কীভাবে তারা সমাজে মুখ দেখাবে? প্রত্যেক বাবা-মা তাদের আদরের সন্তানদের
শিক্ষিত করার স্বপ্ন বোনেন। কারও কারও কাছে বুয়েট স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান।
এখানে ভর্তি করতে পারলে সন্তানটি সুশিক্ষা পাবে, দেশ ও দশের জন্য কাজ করবে,
নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবে- এটাই অভিভাবকের প্রত্যাশা। কিন্তু বিপরীতে আজ এ
কী চিত্র আমরা দেখলাম! আবরার পরপারে চলে গেছে। বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে তার
জন্য আফসোস। শোক প্রকাশ করছে। তার বাবা-মার প্রতি সবাই সমবেদনা জ্ঞাপন
করছে। সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবরারের মাকে বুকে টেনে
নিয়েছেন। বিচার নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। দোষীদের সর্বোচ্চ
শাস্তি দেবেন শুরু থেকেই বলে আসছেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী
আবরারের খুনিদের পরিবারগুলোর কথা চিন্তা করলে তাদের মর্মবেদনাও অনুভব করা
যায়। তাদের চোখের জল ফেলতে হয় লুকিয়ে। তারা আবরারের মায়ের মতো হাহাকার করতে
পারছে না। কী এক অসহায় অবস্থায় তাদের দিন কাটে। তাদের স্বপ্নগুলোও ধূলিসাৎ
হয়ে গেছে। কেন এই মেধাবী সন্তানগুলো এভাবে বখে গেল, তার কারণ অনুসন্ধান
করা এখন সময়ের দাবি।

আমার
শিক্ষাজীবনেও র্যাগিং দেখেছি। অশ্লীলতায় পূর্ণ কী বর্বর আচরণ ছিল কিছু
সংখ্যক র্যাগিংবাজের, যা সহ্য করার মতো ছিল না। আমরা বরাবরই এই অশ্লীল
সংস্কৃতির বিরোধিতা করেছি। নোংরামির বিরোধিতা করেছি। নির্মল আনন্দের
বিপক্ষে কেউ না; কিন্তু আনন্দের নামে অশ্লীলতা সহ্য করা যায় না। আমার
স্বামী মুহসীন হলের ছাত্র ছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'তোমাদের হলে কি
টর্চার সেল ছিল?' উত্তরে 'না' পেয়েছি। আমার ছোট ভাই ছিল এসএম হলের ছাত্র।
সে সময় অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিল। মারামারি ছিল। আমি রোকেয়া হলের ছাত্রী ছিলাম।
১৯৭৮ সালে হলের সেই মারামারি, চুলোচুলির ঘটনা দেশজুড়ে জানাজানি হয়ে গেল।
বাড়িতে গেলে বা কোথাও বেড়াতে গেলে অনেকেই ঠাট্টা করে জিজ্ঞেস করত, দেখি
মাথায় কয় গোছা চুল আছে? সে রকম পরিস্থিতিতেও কিন্তু এ রকম পিটিয়ে মেরে
ফেলার সংস্কৃতি ছিল না। মানুষের মানবিকতা এভাবে উবে গেল কেন? মানুষ কেন
অমানুষ হবে? একজন ছাত্রেরও মনে হলো না যে, ছেলেটি মরে যেতে পারে। শুনতে
পাই, গেস্টরুমে তারা আদব-কায়দা শিক্ষা দিত। আদব-কায়দার যদি এই নমুনা হয়,
তাহলে এমন আদব-কায়দা শেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই। নিজেরা সংযত হলেই ভালো।
হল কর্তৃপক্ষ এখন কী করে? এটি একটি বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তাদের কি কোনো
দায়দায়িত্ব নেই? আমাদের সময় আমরা দেখেছি, মাঝেমধ্যে হাউস টিউটর আপা
সন্ধ্যার পরে হোস্টেল কক্ষ ভিজিট করতেন। হলে-রুমে রান্না করা নিষিদ্ধ ছিল;
কিন্তু অনেক মেয়েই হলের ডাইনিংয়ের খাবার খেতে পারত না। তারা লুকিয়ে রান্না
করত। কেউ হিটারে, কেউ কেরোসিনের চুলায়। হাউস টিউটর আপা রুম ভিজিটে
বেরিয়েছেন- এই খবর পেলে সে কী তড়িঘড়ি করে চুলা লুকানো হতো। অনেক সময় গরম
চুলা খাটের নিচে লুকাতে গিয়ে কারও কারও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পুড়ে গেছে।
শিক্ষক যেমন ছাত্রকে সন্তানতুল্য দেখবেন, ছাত্রও শিক্ষককে তেমনি পিতৃতুল্য
মর্যাদায় রাখবেন। ছাত্রদের মাঝে শিক্ষকদের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা মিশ্রিত
ভয় থাকতে হবে। শিক্ষকদের চোখের সামনে দিনের পর দিন এই ঘটনাগুলো ঘটছে। তারা
কিছুই করতে পারছেন না, এটি মেনে নেওয়া যায় না। তারা যদি উপযুক্ত ব্যবস্থা
নিতে পারতেন, তাহলে মেধাবী ছাত্র আবরারের যেমন অকালে ঝরে যেতে হতো না,
তেমনি আবরারের খুনি যারা এই প্রতিষ্ঠানেরই মেধাবী ছাত্র, তাদের জীবনেও
হয়তোবা এই কলঙ্কময় অধ্যায়ের সূচনা হতো না। আমাদের সমাজব্যবস্থায় মূল্যবোধের
ধস নেমেছে। সবার মাঝে যদি মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত থাকত, তাহলে হয়তোবা এই
শিক্ষার্থীরা দানবে পরিণত হতো না। হয়তোবা এই ঘটনাটিই ঘটত না। সবার কাছে
আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ- আসুন, আমরা সবাই মিলে পারিবারিক বন্ধন মজবুত করি।
সবার মাঝে সহিষুষ্ণতা, সহনশীলতা ফিরিয়ে আনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
ফেসবুকের ব্যবহার এতটাই বেশি যে, পাশের ঘরে দাদা-দাদি, বাবা-মা কারও কথা
মনে থাকে না। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। স্মার্টফোন হাতে পেয়ে সবার
মাঝে থেকেও সবাই যেন একা। তাহলে পারিবারিক বন্ধন কার সঙ্গে হবে?
সামাজিকতাটা কার জন্য? কেন সারাক্ষণ নেশাগ্রস্তের মতো মোবাইল সেটে চোখ
রাখতে হবে? এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাটা এখন জরুরি। আমাদের পারিবারিক
বন্ধন মজবুত করা দরকার। মানবিকতার মূল্যবোধ পরিবার থেকে জাগ্রত না হলে
আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার, অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। বাঙালি পরিবারের
ঐতিহ্য হচ্ছে মায়া-মমতাঘেরা আত্মীয়তার বন্ধন। সেই মায়া-মমতা আজ যেন হারিয়ে
যাচ্ছে। পারিবারিক মূল্যবোধের পুনরুদ্ধারে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানবিক শিক্ষা দিতে হবে। শৈশবে যেমন আদর্শলিপি
দিয়ে আমাদের হাতেখড়ি হয়েছে; এখনকার শিশুদের মাঝেও শৈশব থেকেই সেই নৈতিক
শিক্ষা দিতে হবে। আমরা বাবা-মায়ের কাছে শিখেছি, মিথ্যা বলা মহাপাপ। সবসময়
সত্য কথা বলবে, অন্যের ক্ষতি করবে না। এগুলো এখনও আমাদের মনে গেঁথে আছে।
আমার স্বামী প্রায়ই বলে থাকেন, মান ও হুঁশ এই দুই শব্দের সম্মিলনে হয়
মানুষ। মানুষ শব্দের অর্থের মধ্যেই মনুষ্যত্বের বিষয়টি রয়েছে। মানুষের ভেতর
মনুষ্যত্ব তৈরি করতে হয়। পশুপাখি সে শুধুই পশুপাখি। গরুকে গরু হতে কেউ বলে
না। যার মধ্যে সম্মানবোধ এবং জ্ঞান আছে, সেই মানুষের পক্ষে কোনো অমানবিক
আচরণ করা সম্ভব নয়। তাই মানুষকে মানুষ করার জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে
হবে। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন, সভা-সেমিনার সর্বত্র সবাই মিলে
মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে হবে। বর্বর আচরণ ও
নির্মমতা-নিষ্ঠুরতা থেকে আমাদের মুক্তি পেতেই হবে। সুস্থ সমাজ গঠনে মানবিক
মূল্যবোধের কোনো বিকল্প নেই। সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার সবটুকু অধিকার আছে
প্রত্যেক মানুষের। এটা কেউ নিতে পারে না। এটা কোনো রাষ্ট্রীয় গণ্ডির মধ্যে
সীমাবদ্ধ থাকে না, বিশ্বব্যাপী সর্বত্র এই অধিকার। এটাই মানবাধিকার। এই
মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা এখন সময়ের দাবি; আর
বিলম্ব নয়।
চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সাবেক সিনিয়র সচিব
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- নাছিমা বেগম