লাঠিয়াল পালনের অপরাজনীতি
ড. মইনুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:০৫
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় স্বাক্ষরিত কয়েকটি চুক্তির
সমালোচনা করে প্রদত্ত ফেসবুক পোস্টিংয়ের অপরাধে বাংলাদেশ প্রকৌশল
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার ফাহাদকে হলের আরেকটি কক্ষে নিয়ে ছাত্রলীগের
নেতাকর্মীরা পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনাটি দেশ-বিদেশে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি
করেছে। ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষায় ব্যর্থ
হয়েছে বললে গুরুতর অপরাধ হবে কেন? বিশেষত, ভারত যেভাবে বাংলাদেশকে তিস্তা
নদীর পানি থেকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করে চলেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ
ভারতকে কেন 'একতরফা মনে হওয়া সুবিধা' দেবে? বর্তমানে দেশের মূল রাজনৈতিক
দলগুলোর লেজুড়বৃত্তির যে ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষক রাজনীতি
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্রদের (এমনকি ছাত্রীদেরও) রাজনৈতিক দলগুলোর
বিবেক-বর্জিত লাঠিয়ালে পরিণত করেছে এবং শিক্ষকদের একাংশকে পদলোভী তদবিরবাজ
হিসেবে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের পদলেহী স্তাবকে রূপান্তরিত করেছে, অবিলম্বে
তার অবসান হোক। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর এই জনপ্রিয় অবস্থানের বিরুদ্ধে
সোচ্চার হওয়াই স্বাভাবিক।
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ফার্স্টবয় হিসেবে এসএসসি পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান
অধিকার করে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ১৯৬৫ সালে 'যাত্রিক'-এর
মাধ্যমে আমার ছাত্র রাজনীতিতে আসা। চট্টগ্রাম কলেজে তখন ছাত্রলীগ কিংবা
ছাত্র ইউনিয়ন সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে স্বনামে রাজনীতি করতে পারত না।
ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম কলেজের নাম ছিল 'যাত্রিক', আর ছাত্র ইউনিয়নের নাম ছিল
ইউএসপিপি। আমাদের ঠিকই জানা ছিল, ছাত্রলীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক
রয়েছে এবং ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপের সম্পর্ক আছে।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ঘোষণার পর যাত্রিকে আমার সক্রিয়তা বেড়ে
গিয়েছিল; কারণ তখন বুঝতে শুরু করেছিলাম পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শোষণ-লুণ্ঠন
থেকে বাঙালির মুক্তি-সনদ হলো এই ছয় দফা। অবশ্য রাজনৈতিক সক্রিয়তা বাড়ানো
সত্ত্বেও আমার পড়াশোনায় বা পরীক্ষা-প্রস্তুতিতে কোনো ব্যাঘাত ঘটতে দিইনি
কখনোই। ১৯৬৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার
করে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি অনার্সে ভর্তি হয়েছিলাম, তখন
আইয়ুব-মোনায়েমের মাসলম্যানদের সংগঠন এনএসএফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাসের
রাজত্ব কায়েম করেছিল। আমি ভর্তি হওয়ার কিছুদিন আগেই দেশবরেণ্য অর্থনীতিবিদ
ড. আবু মাহমুদ এনএসএফের গুণ্ডাদের হাতে প্রহূত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে
বিদেশে চলে গিয়েছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার সুবিচার
না করায় দেশের আরেকজন বরেণ্য অর্থনীতিবিদ ড. মুজাফ্ফর আহমদ বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে পদত্যাগ করে ব্যাংকের চাকরি নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালেই আমি হলের
নির্বাচনে সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে এনএসএফের নির্বাচনী-মনোনয়ন প্রত্যাখ্যান
করায় তাদের কোপদৃষ্টিতে পড়ে গিয়েছিলাম। আমাকে জোর করে এনএসএফের সভাপতি
সাইফুল্লাহ মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করার পর আমি হলের হাউস টিউটর
ড. মাজহারুল হকের সহায়তায় প্রভোস্টের বাসায় গিয়ে প্রত্যাহারপত্র জমা দিয়ে
এসেছিলাম।
হাউস টিউটর সঙ্গে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সরকারপন্থি প্রভোস্ট প্রত্যাহারপত্র
গ্রহণ করতে বাধ্য হলেও টেলিফোনে খবরটি আমার হলে পৌঁছার আগেই এনএসএফের
নেতাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন। 
১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে যখন বিশ্ববিদ্যালয় খুলল, তখন গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারে
ছাত্র রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টে গেল। ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়ন
তখন গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী প্রবল জনপ্রিয় ছাত্র সংগঠন, এনএসএফের
মাসলম্যানরা পালিয়ে পগারপার। আমাকে নির্যাতনকারী এনএসএফের এক মাস্তান একদিন
আমার কাছে মাফ চাইল ওই ঘটনার জন্য। জিজ্ঞেস করল- তাকে আমি হলে থাকতে দেব
কি-না। বললাম, 'আমি তো মাস্তান নই। কোনো অসুবিধা হবে না।' এর কিছুদিনের
মধ্যে একদিন মাহবুব ভাই (আ ফ ম মাহবুবুল হক) আমাকে এবং আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু
সুজনকে (প্রয়াত পদার্থবিজ্ঞানী ড. রিজওয়ানুল করিম) ডাকসু অফিসে ডেকে নিয়ে
গেলেন। ওখানে ছাত্রলীগের আরও অনেককে দেখলাম। আমাদের বলা হলো, ওই সভা
সম্পর্কে কারও কাছে কিছু বলা যাবে না। নিজেদের মধ্যেও আলাপ-আলোচনা করা যাবে
না। ওখানে দীর্ঘ স্টাডি সেশন পরিচালনা করলেন ছাত্রলীগের কাজী আরেফ ও
মার্শাল মনি। এ রকম মোট পাঁচটি সভায় অংশগ্রহণ করেছিলাম আমরা ১৯৬৯-৭১ সময়ে।
মাহবুব ভাইসহ অনেকেই স্টাডি সেশনগুলো পরিচালনা করেছেন। তাদের নির্দেশ
অক্ষরে অক্ষরে পালন করতাম আমরা। পরে জেনেছি, সভাগুলো পরিচালনা করত
'স্বাধীনতা নিউকিয়াস'। আর আমাদের নিউক্লিয়াসের সদস্য করা হয়েছিল বাংলাদেশকে
সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন করার সৈনিক হিসেবে বাছাই করে। আমরা শুধু
মাঠ পর্যায়ের কর্মী নই, দল আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করছে
জানার পর নিজেদের আরও একাগ্র ও সাহসী করে তুলেছিলাম। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের
মার্চ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের
পাইওনিয়ার ও ভ্যানগার্ড, আর আমরা ছিলাম স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রসেনানী। সে
জন্যই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর প্রধান
টার্গেট হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরা। ১৯৭১ সালের
১ মার্চ স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সলিমুল্লাহ হলের
সীমানা প্রাচীরের একটি লোহার রড খুলে মিছিলে শরিক হয়ে মতিঝিলের পূর্বাণী
হোটেলে চলে গেলাম বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ শোনার জন্য। ওখান থেকে গেলাম পল্টন
ময়দানে। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড়ালেন আ স ম রবের
নেতৃত্বে ছাত্রলীগের চার নেতা; পতাকাটি গোপনে তৈরি করা হয়েছিল স্বাধীনতা
নিউক্লিয়াসের উদ্যোগেই। আমরা ইতিহাস রচনা করলাম ওই সভায় অংশগ্রহণ করে।
পরদিন ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণার জনসভায়ও যোগ দিলাম
মিছিল নিয়ে। খরচের টাকা ফুরিয়ে যাওয়ায় পরদিন ৪ মার্চ যখন ঢাকা-চট্টগ্রাম
ট্রেন চলাচল শুরু হলো, তখন চট্টগ্রাম চলে আসতে হলো। আমার দুর্ভাগ্য,
স্বাধীনতা নিউক্লিয়াসের সদস্য হয়েও পারিবারিক কারণে মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণের সুযোগ পেলাম না। আমাদের পরিবারের তখন একমাত্র আয়-উপার্জনকারী
ছিলেন বড়দা। তিনি টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্পে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত
ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার দিনগুলোয় সিলেট-সুনামগঞ্জ রোডের অনেক সেতু
তিনি ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অগ্রযাত্রা
বাধাগ্রস্ত করতে। তাই সুনামগঞ্জ দখল হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভারতে
গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। ওদিকে চট্টগ্রামে জটিল অপারেশনের কারণে
শয্যাশায়ী বৃদ্ধ মা-বাবা এবং তিন বোনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হলো
আমাকে। আমি আটকে গেলাম।
কিন্তু ১৯৭২ সালে ছাত্রলীগের ভাঙনের পথ ধরে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাস ও
পেশিশক্তি ফিরে এসেছিল। মাস্টারদা সূর্যসেন হলে প্রতিপক্ষের এক আক্রমণের
সময় হলের ছাদের পানির ট্যাঙ্কের তলায় লুকোতে হয়েছিল আমাকেও। ১৯৭৩ সালের
ডাকসু নির্বাচনের ব্যালট ছিনতাই এবং ১৯৭৪ সালের মুহসীন হলের সাত হত্যাকাণ্ড
লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতির অধঃপতনের সাক্ষ্য দিয়ে চলেছে এখনও। ১৯৭৬ সাল
পর্যন্ত ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে মূল রাজনৈতিক দলের অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক
থাকত কয়েকজন উঁচু স্তরের নেতার মাধ্যমে; ইসলামী ছাত্র সংঘ ছিল ব্যতিক্রম
(ছাত্র সংঘের ক্যাডাররা ছিল জামায়াতে ইসলামীর সরাসরি নির্দেশাধীন। সে জন্যই
তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের নির্দেশে 'আলবদরের' খুনির ভূমিকা পালন
করেছিল)। জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দলবিধি আদেশ জারির মাধ্যমে সব
রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে ছাত্র সংগঠনগুলোর আইনি গাঁটছড়া বেঁধে
দেওয়ার সর্বনাশা ব্যবস্থাটি চালু করার পর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ছাত্র
সংগঠনগুলোর সম্পর্ক দলীয় ক্যাডার পোষণের অচ্ছেদ্য শৃঙ্খলে পরিণত হলো।
স্বাধীনতা নিউক্লিয়াসের সদস্য হয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্সে
ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে ১৯৭৩ সালের ১ আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি
বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের তারিখেই আমি শপথ নিয়েছিলাম- যতদিন
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করব, ততদিন দলীয় রাজনীতি করব না; যদিও রাজনীতি
শিক্ষকদের জন্য নিষিদ্ধ হয়নি। আমার যুক্তি ছিল :একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
তার শিক্ষকতা, গবেষণা, প্রকাশনা ও সভা-সেমিনারের বক্তব্যে শুধু বিবেকের
দ্বারাই পরিচালিত হবেন, কোনো রাজনৈতিক দলকে তুষ্ট করা তার জন্য অবমাননাকর ও
অবিবেকী কাজ (আমার সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ আছে, যা থেকে গত ৪৬ বছরে
আমি একচুলও বিচ্যুত হইনি)। কোনো পদের জন্য তদবির করা বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষককে মানায় না, রাষ্ট্রের নীতি প্রণেতারা যদি কোনো শিক্ষকের বিশেষজ্ঞ
জ্ঞান ও দক্ষতাকে অপরিহার্য মনে করেন, তাহলে তারা নিজেরাই ওই শিক্ষককে
অনুরোধ করে যথাযোগ্য পদে যোগদানে রাজি করাবেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত
সামরিক শাসকদের সময় শাসকদের দালালি করতে উন্মুখ শিক্ষকরা কিছুটা রাখঢাক
করতেন। কিন্তু ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতাসীন হওয়ার পর গত ২৮ বছর ধরে
কিছু শিক্ষকের কাছে দলীয় রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও নানা পদের জন্য তদবির হয়ে
গেছে প্রধান ধান্দা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি ও
শিক্ষক রাজনীতি জাতির সর্বনাশ করে চলেছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন,
লেজুড়বৃত্তির শৃঙ্খল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের মুক্তি দিন।
লাঠিয়াল পালনের অপরাজনীতি পরিত্যাগের ঘোষণা দিন। সার্চ কমিটির মাধ্যমে
উপাচার্য নিয়োগ দিন।
একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ