ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাকিবের সাজা: আইসিসি নিজেই আইন মানেনি!

সাকিবের সাজা: আইসিসি নিজেই আইন মানেনি!
×

একরামুল হক শামীম

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০১৯ | ১২:৫৯

ম্যাচ ফিক্সারের হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ পাওয়ার বিষয়টি আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী ইউনিটের কাছে না জানানোর কারণে সাকিব আল হাসানকে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আইসিসি। আইসিসি অ্যান্টিকরাপশন কোড অনুযায়ী এ সাজা প্রদান করা হয়েছে। তবে সাকিব অভিযোগ স্বীকার করে নেওয়ায় এবং তদন্ত কাজে সহযোগিতা করায় শাস্তির মেয়াদের এক বছর শর্তসাপেক্ষে স্থগিত রাখা হয়েছে। সাকিবের বিরুদ্ধে আদেশের সম্পূর্ণ অংশ আইসিসির ওয়েবসাইটে রয়েছে।

যে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাকিবকে সাজা প্রদান করা হয়েছে, তা সিদ্ধান্তের ১১নং অনুচ্ছেদে উলেল্গখ করা হয়েছে। তাতে বলা হয় :২০১৭ সালের নভেম্বরে সাকিব আল হাসান ঢাকা ডায়নামাইটসের হয়ে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে অংশগ্রহণ করেন। তখন সাকিবের পরিচিত এক ব্যক্তি 'আগারওয়াল' নামের একজনকে সাকিবের টেলিফোন নম্বর দেয়। ২০১৭ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি আগারওয়ালের সঙ্গে সাকিবের বেশ কিছু হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ চালাচালি হয়, যেখানে আগারওয়াল সাকিবের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সাকিব বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও জিম্বাবুয়ের ত্রিদেশীয় সিরিজে অংশগ্রহণ করেন। সেই সিরিজ চলার সময় আগারওয়ালের সঙ্গে সাকিবের হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা বিনিময় হয়। ২০১৮ সালের ১৯ জানুয়ারি আগারওয়াল সাকিবকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠায়- 'ডু উই ওয়ার্ক ইন দিস অর আই ওয়েট টিল দ্য আইপিএল'। ২৩ জানুয়ারি আগারওয়াল আবার সাকিবকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠায়, যাতে উলেল্গখ ছিল- 'ব্রো এনিথিং ইন দিস সিরিজ।' সাকিব এসব মেসেজ পাওয়ার কথা আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী ইউনিট বা অন্য কোনো দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানকে জানাননি। ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল সাকিব সানরাইজার হায়দরাবাদের হয়ে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে আইপিএল ম্যাচ খেলেন। সেদিন আগারওয়াল হোয়াটসঅ্যাপে সাকিবকে মেসেজ করে নির্দিষ্ট একজন খেলোয়াড় খেলবে কি-না জানতে চান। এসব মেসেজ পাওয়ার কথাও সাকিব আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী ইউনিট বা অন্য কোনো দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানকে জানাননি।

আইসিসি তাদের সিদ্ধান্তে এটি স্পষ্ট করেছে যে, সাকিব আল হাসান আগারওয়ালের কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করেননি এবং তার কথা অনুযায়ী কোনো ধরনের কাজ করেননি কিংবা কোনো ধরনের তথ্য সরবরাহ করেননি। তবে আইসিসির অ্যান্টিকরাপশন কোড অনুযায়ী এসব হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা সম্পর্কে আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী ইউনিটকে জানানোর বাধ্যবাধকতা ছিল। তাই সাকিবের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে আইসিসি। তদন্ত কমিটি ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি ও ২৭ আগস্ট সাকিবকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তদন্ত কাজে সাকিব তদন্ত কমিটিকে পূর্ণ সহযোগিতা করে। হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ পাওয়ার পরও তা আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী ইউনিটকে না জানানোর বিষয়টিতে ভুল হয়েছে মর্মে সাকিব তদন্ত কমিটির কাছে স্বীকার করেন।

আইসিসি সাকিবের বিরুদ্ধে আইসিসি অ্যান্টিকরাপশন কোডের অনুচ্ছেদ ২.৪.৪ অনুযায়ী ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর তিনটি ঘটনায় চার্জ আনে। ২৯ অক্টোবরের লেটার এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে সাকিব আল হাসান আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী কোডের অনুচ্ছেদ ২.৪.৪ তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেন। সাকিব নিজে ভুল স্বীকার করায় দুর্নীতিবিরোধী কোডের অনুচ্ছেদ ৫.১.১২-এর বিধান বিবেচনায় নিয়ে একই কোডের অনুচ্ছেদ ৬.২ অনুযায়ী সাকিবকে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়।

এই হলো ঘটনাক্রমের সংক্ষেপিত রূপ। আইসিসির এই সিদ্ধান্তের কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা প্রয়োজন।

১. আইসিসি যে অ্যান্টিকরাপশন কোডের অনুচ্ছেদ ২.৪.৪ লঙ্ঘনের জন্য সাকিবকে সাজা দিয়েছে, তা কার্যকর হয়েছে ২০১৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে। আইসিসির অ্যান্টিকরাপশন কোডের ১১.৩ অনুচ্ছেদে উলেল্গখ রয়েছে :The Anti-Corruption Code shall come into full force and effect on 9 February 2018 (the ÔEffective DateÕ). It shall not operate to disturb any decisions and/or sanctions previously made under predecessor versions of the Anti-Corruption Code (including the Code of Conduct) or anti-corruption rules of National Cricket Federations. Nor shall its substantive provisions apply retrospectively to matters pending before the Effective Date. Instead, any case pending prior to the Effective Date, or brought after the Effective Date but based on acts or omissions that occurred before the Effective Date, shall be governed (a) as to substance, by the predecessor to the Anti-Corruption Code that was in force at the time of the alleged offence, subject to any application of the principle of lex mitior by the hearing panel determining the case; and (b) as to procedure, by this Anti-Corruption Code.

অর্থাৎ এই কোডের কোনো সাবস্ট্যানটিভ প্রভিসনস কার্যকরের তারিখের পূর্বের ঘটনার ক্ষেত্রে রেট্রোসপেক্টিভলি প্রয়োগ করা যাবে না। পদ্ধতিগত বিষয়ে (তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ ইত্যাদি) বর্তমান কোড ব্যবহার করা যায় বটে; কিন্তু পূর্বের ঘটনার জন্য বর্তমান কোডের অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাজা প্রদান যৌক্তিক বিবেচিত হয় না।

সাকিবের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ঘটনার তারিখগুলো হলো, ১৯ জানুয়ারি ২০১৮, ২৩ জানুয়ারি ২০১৮ এবং ২৬ এপ্রিল ২০১৮। দুটি ঘটনা আইসিসির অ্যান্টিকরাপশন কোডের কার্যকরের অর্থাৎ ২০১৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারির আগের। ফলে ওই দুটি ঘটনার ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের কোড অনুযায়ী অভিযোগ গঠনপূর্বক একই কোড অনুযায়ী শাস্তি প্রদান আইনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ, ১৯ জানুয়ারি ও ২৩ জানুয়ারির ঘটনার সময় ২০১৮ সালের আইসিসির অ্যান্টিকরাপশন কোডের অনুচ্ছেদ ২.৪.৪ এবং ৬.২-এর অস্তিত্ব ছিল না। ফলে ওই দুটি ঘটনার ক্ষেত্রে সাকিব ২০১৮ সালের আইসিসি অ্যান্টিকরাপশন কোডের অনুচ্ছেদ ২.৪.৪ লঙ্ঘন করেছেন মর্মে আইসিসির সিদ্ধান্ত এবং ৬.২ অনুযায়ী সাজা প্রদান বেআইনি। উলেল্গখ্য, আইসিসির ২০১৪ সালের একটি আইসিসি অ্যান্টিকরাপশন কোড ছিল। তবে ওই কোড অনুযায়ী সাকিবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তবে ২৬ এপ্রিলের ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযোগ গঠন ঠিক আছে।

২. আইসিসির সিদ্ধান্তের ১৭ দফায় উলেল্গখ করা হয়েছে- আইসিসি এবং ভারতের ক্রিকেট বোর্ড এ ব্যাপারে একমত হয়েছে যে, সাকিবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এ ব্যাপারে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে কিছু করতে পারত কি-না।

সাকিবের বিরুদ্ধে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আইসিসির এগ্রিমেন্ট না হলে আইপিএলের ঘটনার জন্য আইসিসি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারত না। অন্যদিকে যেহেতু বর্তমান আইসিসি অ্যান্টিকরাপশন কোড অনুযাযী কেবল ২৬ এপ্রিল অর্থাৎ আইপিএল সংক্রান্ত ঘটনার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, তাই এ ক্ষেত্রে আইসিসির অ্যান্টিকরাপশন কোডের অনুচ্ছেদ ১.৭.৩.৪ প্রযোজ্য হয়। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল। আইসিসির উচিত ছিল অনুচ্ছেদ ১.৭.৩.৪ অনুসরণ করা।

৩. আইসিসির সিদ্ধান্তের মূল কথা হলো- সাকিব আল হাসান আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিটের কাছে অপরাধ স্বীকার ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করেছেন। সাকিব অভিযোগের নোটিশ দ্রুতই গ্রহণ করেছেন। অপরাধের ব্যাপারে তার অনুতাপ ও অনুশোচনা রয়েছে। সাকিবের পূর্বে শৃঙ্খলা বজায় রাখায় ভালো রেকর্ড রয়েছে। তার অপরাধের কারণে সংশ্নিষ্ট ম্যাচের কোনো ধরনের ক্ষতি হয়নি। ম্যাচকেও তা প্রভাবিত করেনি।

এতগুলো মিটিগেটিং ফ্যাক্টর উলেল্গখ করার পরও আইসিসির দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা হতাশাজনক। যেহেতু বর্তমান কোড অনুযায়ী কেবল ২৬ এপ্রিলের ঘটনা প্রযোজ্য; তাই এই কোডের ৬.২ অনুযায়ী ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞার সাজাই যৌক্তিক হতে পারত।

৪. আইসিসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাকিব আপিল করতে পারবেন না। সিদ্ধান্তের ৩২ দফায় উলেল্গখ রয়েছে :আইসিসি অ্যান্টিকরাপশন কোডের ৭.২ মতে, সাকিব আল হাসান কিংবা আইসিসি কেউই এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন না।

সেক্ষেত্রে সাকিব আল হাসানকে কমপক্ষে এক বছর ক্রিকেট থেকে বাইরে থাকতে হচ্ছে। দেশের ক্রিকেটের জন্য এটি মারাত্মক দুঃসংবাদ।

বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে কর্মরত

আরও পড়ুন

×