ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত
×

রফিকুল ইসলাম

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:০৮

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ থেকেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্ন নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। প্রসঙ্গক্রমে আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র উর্দু ও বাংলা ভাষার দাবি উত্থাপন স্মরণীয়। কিন্তু নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে কোন ভাষা ব্যবহূত হবে, সে প্রশ্নে বাংলা ভাষার দাবি উত্থাপন করে। বস্তুতপক্ষে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ছয় মাসের মধ্যেই অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে বাংলা ভাষার দাবি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেন। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে পরিষদের অন্যতম ভাষারূপে বাংলা ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্নে বিতর্ক হয় ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই প্রস্তাবের ওপর- ''That in sub-rule (1) of rule 29, after the word ‘EnglishÕ in line 2 the words Ôor BengaleeÕ be inserted." এই প্রস্তাব ছিল পাকিস্তান গণপরিষদে যেসব ভাষা ব্যবহূত হতে পারবে সে সম্পর্কে। ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের রেওয়াজ তো ছিলই, সঙ্গে উর্দু ভাষা ব্যবহারের ব্যবস্থাও করা হয়। ওই সময় যদি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা ভাষার দাবি উত্থাপন না করতেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বাংলা ভাষার দাবি উত্থাপন কঠিন হতো। পাকিস্তান গণপরিষদের ভাষা সম্পর্কিত ওই প্রস্তাব উত্থাপন করে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ভাষা যেহেতু পাকিস্তানের পাঁচটি প্রদেশের (পূর্ব বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ, বেলুচিস্তান) একটিমাত্র প্রদেশের ভাষা ছিল, সে কারণে বাংলা ভাষার দাবিকে 'প্রাদেশিক' বা 'আঞ্চলিক' আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যানের সম্ভাবনা ছিল বেশি। বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম প্রাদেশিক ভাষা হওয়া সত্ত্বেও তা রাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু অধিবাসীর ভাষা। মূল প্রস্তাবটি গণপরিষদে ব্যবহার্য ভাষা সম্পর্কে হলেও তার সমর্থনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রদত্ত ভাষণ রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। প্রসঙ্গক্রমে তিনি যে যুক্তি দেন, তা অকাট্য। পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখ বাংলাভাষী।


সুতরাং যেহেতু বাংলা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা, সেহেতু তাকে শুধু প্রাদেশিক ভাষা বলা যায় না, রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাই রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। সর্বোপরি বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম সাধারণ ভাষাও বটে। কারণ, তা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ব্যবহূত ভাষা। একই ভাষণে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী মানুষের জন্য ভাষার প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা ব্যাখ্যা করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের কোটি কোটি মানুষের অনুভূতির কথা তুলে ধরে বলেন, সেখানে যখন একজন সাধারণ মানুষ পোস্ট অফিসে যান এবং একটি মানিঅর্ডার ফর্ম নেন, তখন দেখতে পান যে তা উর্দু বা ইংরেজি ভাষায় ছাপা, বাংলা ভাষায় নয়। গ্রামের একজন গরিব কৃষক যখন তার ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রকে টাকা পাঠাতে চান, তখন তা ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় ছাপা বলে তাকে দূরবর্তী শহরে যেতে এবং ওই মানিঅর্ডার অনুবাদ করিয়ে টাকা পাঠাতে হয়। যখন কোনো গরিব কৃষক একখণ্ড জমি কেনাবেচা করতে চান এবং স্ট্যাম্পভেন্ডারের কাছে যান, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে ওই স্ট্যাম্প ন্যায্যমূল্য অনুযায়ী কি-না। কারণ, ওই স্ট্যাম্পের মূল্য বাংলায় ছাপা নেই, রয়েছে ইংরেজি বা উর্দুতে। সুতরাং ওইসব সমস্যা দূর করার জন্য রাষ্ট্রের অধিকাংশ সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষাই রাষ্ট্রভাষা এবং গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হওয়া উচিত।

পাকিস্তান গণপরিষদের ওই অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক প্রস্তাব সমর্থন করে বক্তব্য দেন পূর্ব বাংলার সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত সদস্য প্রেমহরি বর্মণ। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলা যদি পাকিস্তান গণপরিষদের অন্যতম ভাষারূপে স্বীকৃতি না পায়, তখন কোনো সদস্য যদি পরিষদে তার মাতৃভাষায় বক্তব্য দেন, তাহলে তা সেই ভাষায় লিপিবদ্ধ হবে না, কেবল তার একটি ইংরেজি সারসংক্ষেপ লিপিবদ্ধ হবে। গণপরিষদে বাংলা ভাষায় প্রদত্ত ভাষণ বা আলোচনাগুলো বাংলা ভাষাতেই লিপিবদ্ধ হওয়া উচিত।



প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান যথার্থই ধরতে পেরেছিলেন যে, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবটি কেবল গণপরিষদের ভাষার প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে তা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গিত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, উপমহাদেশের দশ কোটি মুসলমানের ভাষা বা মুসলমান জাতির ভাষা উর্দু, তখন তা সত্যের অপলাপ মাত্র। অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বসবাসকারী মুসলমানরা এক ভাষাভাষী বা এক জাতির অন্তর্গত ছিল না। অবিভক্ত ভারতের দশ কোটি মুসলমানের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল বাঙালি এবং বাংলাভাষী, বাকি মুসলমান ছিল পাঞ্জাবি, পাঠান, সিন্ধি, বেলুচ, বিহারি, মারাঠি, গুজরাটি প্রভৃতি বিভিন্ন জাতি ও ভাষাভাষী। ভাষার কোনো ধর্ম নেই। ভাষা ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নিরপেক্ষ। উপমহাদেশের মুসলমানরাই শুধু উর্দুভাষী নন, বহু হিন্দুও উর্দুভাষী, যেমন মধ্যপ্রাচ্যে আরবি শুধু মুসলমানের ভাষা নয়, সঙ্গে সঙ্গে বহু আরব খ্রিষ্টান ও ইহুদিরও ভাষা। সুতরাং পাকিস্তানের উর্দুভাষী মোহাজের প্রধানমন্ত্রী (ভারতের যুক্ত বা উত্তরপ্রদেশ থেকে হিজরতকারী) নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান যখন উর্দুকে উপমহাদেশের দশ কোটি মুসলমানের ভাষা বা মুসলমান জাতির ভাষা বলেন, তখন মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগই শুধু নয়, সঙ্গে উপমহাদেশের ভাষা পরিস্থিতি সম্পর্কে অজ্ঞতাও ফুঠে ওঠে।

বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের ওই উগ্র উর্দুপ্রীতি ও বাংলা ভাষাবিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদ পূর্ববাংলা থেকে নির্বাচিত পাকিস্তান গণপরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম লীগ দলের কোনো সদস্য করেননি। লিয়াকত আলী খানের বক্তব্যের প্রতিবাদ করে পূর্ববাংলার সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত সদস্য ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত বলেন, ...I wish he had not made some of the remarks he chose to make. They will have unfortunate repurcassions else where even in certain sections in Pakistan... But here we are adopting Urdu, Urdu is not the language of any of the provinces constituting the Dominion of Pakistan. It is the language of the upper few of Western Pakistan. This opposition to the amendment proves an effort, a determined effort on the part of the upper few of Western Pakistan at dominating the State of Pakistan. This is certainly not a tendency towards democracy : it is a tendency towards domination of the upper few of a particular region of the state.

ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত তার ভাষণে শুধু ভাষার প্রশ্ন নয়, বরং তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের মুষ্টিমেয় উর্দুভাষী অভিজাত শ্রেণি কর্তৃক তদানীন্তন পাকিস্তান শাসন ও শোষণের রূপরেখা এবং নীলনকশাই তুলে ধরেছিলেন। বস্তুত তদানীন্তন পাকিস্তানের রাজধানী করাচিতে বসতি স্থাপনকারী ভারত থেকে আসা কিছু উর্দুভাষী মোহাজের ছাড়া একমাত্র পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরের অভিজাত শ্রেণি তাদের মাতৃভাষা পাঞ্জাবি ব্যবহার না করে উর্দুভাষা ব্যবহার করত। পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা পাঞ্জাবি কবি ইকবাল পাঞ্জাবি ভাষায় লেখেননি, লিখেছেন উর্দু ও ফার্সি ভাষায়। সবচেয়ে প্রগতিশীল পাঞ্জাবি কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজও প্রধানত উর্দু ভাষাতেই সাহিত্য রচনা করেন। মাতৃভাষা সম্পর্কে পাঞ্জাবি মুসলমানদের হীনমন্যতা অপরিসীম। সে কারণে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পাঞ্জাবি ভাষা বা সাহিত্য বিভাগ ছিল না। ওই সময় পর্যন্ত লাহোর বেতার ও টেলিভিশন থেকে কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান ছাড়া পাঞ্জাবি ভাষায় কোনো অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো না। পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সামরিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রথমে ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে হিজরতকারী মোহাজের ও পাকিস্তানের পাঞ্জাবিদের হাতে। পরে পাকিস্তানের সামরিক সদর দপ্তর রাওয়ালপিন্ডিতে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর থেকে ওই কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ পাঞ্জাবিদের হাতে চলে যায়। তখন থেকে দিল্লি, লক্ষেষ্টৗ বা হায়দরাবাদী উর্দুর পরিবর্তে লাহোরি উর্দু প্রাধান্য পেলেও ভাষার প্রশ্নে পাকিস্তানের শাসক সম্প্রদায়ের মনোভাবে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

খাজা নাজিমুদ্দিন যদি উর্দু সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা বলতেন, তাহলে আপত্তি ছিল না। কারণ, তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ এবং বসবাস করেও বাংলা ভাষা শেখার প্রয়োজনবোধ করেননি। তিনি যখন পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের পক্ষ থেকে উর্দুর জন্য ওকালতি করেন, তখন তা হাস্যকর বোধ হয়। পাকিস্তান গণপরিষদের ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ তারিখের অধিবেশনে যখন গণপরিষদের ভাষারূপে ইংরেজি ও উর্দুর সঙ্গে বাংলা ভাষা সংযোজনের জন্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আনা প্রস্তাবে স্পিকার মৌলবি তমিজুদ্দিন খান ভেটো দেন, তখন তা বাতিল হয়ে যায়। কারণ, তদানীন্তন পূর্ব বাংলা থেকে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম লীগ দলীয় বাঙালি সদস্যরা বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষা ব্যবহারে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব গৃহীত হয়নি; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২- ব্যবধান চার বছরের। কিন্তু এই চার বছরেও পাকিস্তানের অদূরদর্শী শাসক সম্প্রদায় বাংলা ভাষার দাবি মেনে নেয়নি। সেদিন যদি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা সম্পর্কিত সংশোধনী ও রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রস্তাব উত্থাপন না করতেন, তাহলে আমাদের ইতিহাস কী হতো কে জানে?

জাতীয় অধ্যাপক



আরও পড়ুন

×