যাদের রাজনৈতিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ হয়েছি
তোফায়েল আহমেদ
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০১৯ | ১৫:১৭
যেদিন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়, সেদিন আমি ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দি। ভয়ঙ্কর-বিভীষিকাময় দুঃসহ জীবন তখন আমাদের! ময়মনসিংহ কারাগারের কনডেম সেল- ফাঁসির আসামিকে যেখানে রাখা হয়, সেখানেই আমাকে রাখা হয়েছিল। সহ-কারাবন্দি ছিলেন 'দি পিপল' পত্রিকার এডিটর আবিদুর রহমান, যিনি ইতোমধ্যে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন। আমরা দু'জন দুটি কক্ষে ফাঁসির আসামির মতো জীবন কাটিয়েছি। হঠাৎ খবর এলো- কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে! কারাগারের সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে। কারারক্ষীরা সতর্ক। ময়মনসিংহ কারাগারের সুপার ছিলেন শ্রী নির্মলেন্দু রায়; চমৎকার মানুষ। পরবর্তীকালে শুনেছি, সেনাবাহিনীর একজন মেজর, নাম আরিফ; সে-ই জেলখানার সামনে এসে কারাগারে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নির্মলেন্দু রায় বলেছিলেন, 'আমি অস্ত্র নিয়ে কাউকে কারাগারে প্রবেশ করতে দেব না।' কারাগারের চতুর্পাশে সেদিন যারা আমাকে রক্ষার জন্য ডিউটি করছিলেন, তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে আমার সহপাঠী ওদুদ- আমরা একসঙ্গে এমএসসি পাস করেছি এবং দেশ স্বাধীনের পর ৭৩-এ যিনি সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেছিলেন, তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কারাগারকে রক্ষা করার জন্য। আমি নির্মলেন্দু রায় ও ওদুদের কাছে ঋণী।
ছাত্রজীবন থেকে আমি জাতীয় চার নেতাকে নিবিড়ভাবে দেখেছি। তাঁদের আদর-স্নেহ আর রাজনৈতিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ হয়ে জীবন আমার ধন্য। '৭৫-এর ১৫ আগস্ট যেদিন জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়, আমরা সেদিন নিঃস্ব হয়ে গিয়েছি। যাঁর নেতৃত্বে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি, যাঁর জন্ম না হলে এ দেশ স্বাধীন হতো না, তাঁকে বাংলার মাটিতে এভাবে জীবন দিতে হবে- এটা আমরা কখনোই ভাবিনি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জাতীয় চার নেতাসহ আমরা ছিলাম গৃহবন্দি। ১৫ আগস্টের পরদিন আমার বাসভবনে খুনিরা এসে আমাকে তুলে রেডিও স্টেশনে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমার ওপর অকথ্য নির্যাতন করা হয়। পরবর্তীকালে জেনারেল সফিউল্লাহ এবং ব্রিগেডিয়ার শাফায়াত জামিল (প্রয়াত), তিনি তখন ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার- তাদের প্রচেষ্টায় রেডিও স্টেশন থেকে আমাকে বাড়িতে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। আমাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় মা বেহুঁশ হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। মায়ের শরীরের ওপর দিয়েই আমাকে টেনে নিয়েছিল ঘাতকের দল। ময়মনসিংহে কারারুদ্ধকালে জেলখানার জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ডের নিষ্ঠুর দুঃসংবাদটি শুনে মন ভারাক্রান্ত হয়। অতীতের অনেক কথাই মানসপটে ভেসে ওঠে। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতীয় চার নেতার কত অবদান! স্মৃতির পাতায় তার কত কিছুই আজ ভেসে ওঠে! সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ পরম নিষ্ঠার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। আমরা '৬৬-এর ৭ জুন হরতাল পালন করেছিলাম। সফল হরতাল পালন শেষে এক বিশাল জনসভায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম যে ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তা আজও আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বাঙালির ছয় দফা তথা স্বাধিকার কর্মসূচি বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ করে অপূর্ব সুন্দর বক্তৃতা করেছিলেন। তিনি ছিলেন অনলবর্ষী বক্তা, তাজউদ্দীন আহমদ দক্ষ সংগঠক এবং কামারুজ্জামান সাহেব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য (এমএনএ) হিসেবে পার্লামেন্টে প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ তথা স্বাধিকারের দাবি তুলে ধরতেন। '৬৮তে কারাগারে থাকা অবস্থাতেই তাজউদ্দীন ভাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে পুনঃনির্বাচিত হন। '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ফলে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। '৬৯-এর গণআন্দোলনের সময় দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ কারাগারে বন্দি ছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন বাইরে। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড সুচারুরূপে পরিচালনা করেছেন অসহযোগের প্রতিটি দিন। আমাদের প্রয়াত নেতা খুলনার মোহসীনের লালমাটিয়াস্থ বাসভবনে বসে আমরা কত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি! অসহযোগ আন্দোলন চলাকালেই বঙ্গবন্ধু ঠিক করে রেখেছিলেন আমরা কে কোথায় গেলে কী সাহায্য পাব। '৭১-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি আমাদের চারজনকে বঙ্গবন্ধু ডেকে পাঠালেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে। সেখানে জাতীয় চার নেতাও ছিলেন। বঙ্গবন্ধু আমাদের বললেন, 'পড়ো, মুখস্থ করো।' আমরা মুখস্থ করলাম একটি ঠিকানা- 'সানি ভিলা, ২১, রাজেন্দ্র রোড, নর্দার্ন পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা।' ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখব, স্বাধীনতা ঘোষণার পর যখন বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়, তখন এই জাতীয় চার নেতাই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অপূর্ব দক্ষতার সঙ্গে স্বাধীন বাংলার প্রথম সরকার পরিচালনা করেন ও বিজয় ছিনিয়ে আনেন। '৭১-এর ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে 'বাংলাদেশ গণপরিষদ' গঠন করে, সেই পরিষদে 'স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র' অনুমোদন করে তারই ভিত্তিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ গঠন করেন। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং উপ-রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী এবং এএইচএম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্র ও পুনর্বাসনমন্ত্রী হিসেবে ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করেন এবং পরম নিষ্ঠার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে '৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদারমুক্ত করেন।

মানুষের জীবন যে কত কঠিন হয়, আমি তা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করি। '৭৫-এর ১১ জুলাই আমার বড় ভায়ের মৃত্যু হয়। বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন, জানাজা পড়ে তার মরদেহ হেলিকপ্টারে করে ভোলায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি নিজে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন। কত মহান নেতা তিনি, এসব ঘটনায় উপলব্ধি করা যায়। আমি যখন '৭৪-এ চাঁপাইনবাবগঞ্জে গাড়ি দুর্ঘটনায় নিপতিত হই, তখন আমার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। বঙ্গবন্ধু হেলিকপ্টার পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। রাতের বেলায় সেই মাঠের চারপাশে কোনো বিদ্যুৎ ছিল না। হ্যাজাক বাতি জ্বালিয়ে চতুর্দিক আলোকিত করার ব্যবস্থা করে আমাকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে বঙ্গবন্ধু আমাকে নিয়ে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে গিয়েছিলেন এবং পঙ্গু হাসপাতালের বিখ্যাত ডাক্তার গ্রাসকে ডেকে আমার চিকিৎসা করিয়েছিলেন। আমার ভায়ের মৃত্যুর পর ও ১৫ আগস্টের পর আমার ওপর অমানুষিক নির্যাতন নেমে এসেছিল। আমাকে তখন ময়মনসিংহ কারাগারের কনডেম সেলে ফাঁসির আসামির মতো রাখা হয়েছে। একদিন হঠাৎ আমার পরিবার- স্ত্রী ও ৭ বছর বয়সী মেয়ে তখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে, সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিল। ওই দিনই আমি খবর পাই, আমাদের বাড়ির কাছে একটা বাজার আছে, সেই বাজারেই আমার সেজো ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর খুনি ক্যাপ্টেন মাজেদ, এখন পলাতক; সে-ই ভোলায় গিয়ে তাকে হত্যা করার ব্যবস্থা করেছিল। ভাবতে কেমন লেগেছিল! আমার মা তখন জীবিত। দুই ছেলে মৃত, আরেক ছেলে কারাগারে। তখনকার দিনগুলোর কথা মনে হলে এখনও আবেগাপ্লুত হই, খুব খারাপ লাগে। তিন ছেলের একজন জেলে, আর দু'ছেলে বেঁচে নেই। মায়ের সেই করুণ দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। আমি যখন জেলে, কী অপরিসীম কষ্ট করেছে আমার স্ত্রী! আমার স্ত্রীর নামে কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে চায়নি। যখনই শুনেছে, তোফায়েল আহমেদের স্ত্রী, তখনই বলেছে- 'না, বাড়ি ভাড়া দেওয়া সম্ভবপর হবে না।' কলাবাগানে আমার ভাগ্নি জামাইয়ের নামে গোপনে একটি বাড়ি ভাড়া করে আমার স্ত্রী সেখানে দেড় বছর কাটিয়েছে। ফ্যান, ফার্নিচার, খাট- কিছুই ছিল না। কারণ, আমি ছিলাম সরকারি বাসভবনে। সবই দেওয়া ছিল সরকারের। সে ফ্যান ছাড়াই এক বছর কাটিয়েছে। আমার বাসায় তখন আত্মীয়স্বজন মিলে আটজন। তারা স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে। করুণ দিন অতিক্রম করেছে আমার স্ত্রী।
জীবনসায়াহ্নে এসে ৭৬ পেরিয়ে ৭৭ বছরে পদার্পণ করেছি। আমার এই ক্ষুদ্র জীবন বিশ্নেষণ করে দেখি, জীবন আমার ধন্য। আমি ইতিহাসের মহামানব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর-স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছি। মায়ের দোয়া পেয়েছি। বাংলাদেশের মানুষের স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছি। আমার জীবন তৃপ্ত, কানায় কানায় পরিপূর্ণ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে আমি যা চেয়েছি, তাই পেয়েছি। এখন আমার একটিই কামনা, যা আমার মা বলেছিলেন- মৃত্যুর আগে আমি যখন মাকে নিজ হাতে খাওয়াচ্ছিলাম, বলেছিলেন, 'তুমি কি আমাকে মরতে দেবে না?' আমি বলেছিলাম, 'মা, আপনি যদি চলে যান, আমাকে দোয়া করবে কে?' তখন তিনি বলেছিলেন, 'আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে রেখে গেলাম। তিনিই তোমাকে দেখবেন।' এটিই ছিল মায়ের সঙ্গে আমার শেষ কথা। সেই মায়ের দোয়ায় খুব ভালো আছি। মাত্র ২৮ বছর বয়সে প্রতিমন্ত্রী হয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি; ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী; আবার ২০১৩ সালে শিল্প ও গৃহায়নমন্ত্রী; এরপর ২০১৪ সালে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এখন সুন্দর সময় কাটাচ্ছি। আমার মনে কোনো দুঃখ নেই। এখন লেখাপড়া করছি, আত্মজীবনী লেখার কাজ শুরু করেছি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধ করে আমরা এই দেশ স্বাধীন করেছি। বঙ্গবন্ধুর দুটি স্বপ্ন ছিল- একটি স্বাধীনতা, তিনি পূরণ করেছেন। আরেকটি অর্থনৈতিক মুক্তি। ৭ মার্চের বক্তৃতার শেষে তিনি বলেছিলেন- 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আজ তার স্বপ্নের বাংলাদেশকে যে তিনি সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা; ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশে পরিণত করতে চেয়েছিলেন, সেই কাজটি বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজকে এগিয়ে চলেছে। এই জেলহত্যা দিবসে আমার দৃঢ়বিশ্বাস, সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশ হবে একটা দারিদ্র্যমুক্ত শস্য-শ্যামলা সোনার বাংলা।
আওয়ামী লীগ নেতা; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় সংসদ
[email protected]
- বিষয় :
- জেলহত্যা দিবস
- তোফায়েল আহমেদ