ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কূটনীতি

ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি

ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি
×

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫৫

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেন। গত ২১ জুন মালয়েশিয়ার পর ২২ জুন তিনি চীনে পৌঁছেন। সেখানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’ সভায় যোগদান ছাড়াও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং, পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোয়োইংসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়। ২৬ জুন যৌথ ঘোষণায় উভয় দেশের ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ ও ‘অংশীদারিত্ব’ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করা হয়। এ ছাড়া ‘চীন বাংলাদেশকে জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা সমুন্নত রাখতে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করতে সমর্থন করে।’ 

সাক্ষাৎকালে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং বলেন, বিশ্বে যে কোনো পরিবর্তন আসুক; চীন বাংলাদেশের ‘বিশ্বস্ত ভালো বন্ধু, সুপ্রতিবেশী এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে পাশে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আশা প্রকাশ করেন, মূল্যবান ও বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে চীন ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানেও চীন পাশে থাকার আশ্বাস দেয়। 

চীনের প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়বে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে। এ সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক  স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আভাস পাওয়া যায়, এ সফর শেষে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ সহায়তা ও সরাসরি অনুদান বাবদ তিন বিলিয়ন ডলার পাওয়া যেতে পারে।

গণচীন ১৯৭৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের মৌলিক নীতি হচ্ছে সব ধরনের সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সবার ওপরে জায়গা দেওয়া। ১৯৭৫ সালের অক্টোবরে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের মৌলিক চরিত্র বদলায়নি। 

২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ঢাকা সফরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে। এ সফরে বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্প খাতে চীনের অর্থায়নে বেশ কটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সামরিক, স্বৈরাচার বা গণতান্ত্রিক যে কোনো সরকার থাকুক না কেন; বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক কখনও খারাপ হয়নি। 

চীন বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ২২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ চীনে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আমদানির বেশির ভাগই শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি এবং মধ্যবর্তী শিল্পপণ্য। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে চীনের প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। বেশির ভাগ ঋণ ছিল অবকাঠামো উন্নয়নে। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং কর্ণফুলী টানেল ছিল চীনের ঋণ সহায়তায় বাস্তবায়িত উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলো। 

অনেকের মতে, চীন সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে নির্মিত বেশ কটি প্রকল্প ছিল অতিমূল্যায়িত। ইতোমধ্যে পদ্মা সেতু দিয়ে রেল সংযোগ এবং কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের আয় থেকে ঋণ পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান হচ্ছে না। চীনের জি টু জি ঋণের আওতায় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রশাসনিক দক্ষতায় দরকষাকষি না করলে ভবিষ্যতেও অতিমূল্যায়িত প্রকল্প গ্রহণের ঝুঁকি থাকতে পারে।

চীনের ঋণ সহায়তায় বেশ কটি উন্নয়ন প্রকল্প এখনও চলমান। এগুলো যেন বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে বাংলাদেশ ও চীন সরকারকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যেহেতু সরকার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক প্রকল্পের কাজ স্থগিত রয়েছে, এসব প্রকল্প চালু করে ঋণের সুদহার কমানো এবং পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার চীনের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে।

চীন থেকে আমদানির তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি খুবই সামান্য। আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার। যদিও বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যে চীন শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা প্রদান করেছে; অপ্রতুল চাহিদার কারণে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা চীনের বাজারে তেমন সুবিধা করতে পারছে না। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে উচ্চমানের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক মাছ, পাট ও পাটজাত দ্রব্য ইত্যাদি রপ্তানি বাড়ানোর জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তা ছাড়া নতুন সমঝোতা অনুযায়ী কৃষিপণ্য ও ওষুধ রপ্তানি শুরু হলে বাণিজ্য ঘাটতি ২ থেকে ৩ শতাংশ কমতে পারে। ঋণ সহায়তা ছাড়াও চীন সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অনুদান সহায়তায় নির্মাণ করে দিয়েছে। 

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন খাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তৈরি পোশাক, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নির্মাণ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে চীনা বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত শিল্প প্রতিষ্ঠানে বহু লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।

ডিজিটাল রূপান্তরেও চীনের অবদান দৃশ্যমান। টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, ফাইবার অপটিক অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চীনা প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। দেশের ইলেকট্রনিক পণ্য, ল্যাপটপ কম্পিউটার, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনে চীনা প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল একচেটিয়া ব্যবহৃত হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রে চীনের সরবরাহকৃত উন্নতমানের প্রযুক্তি, উচ্চফলনশীল বীজ এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্র বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের উল্লেখযোগ্য অর্জন হচ্ছে– বেশ কিছু প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগের চুক্তি এবং চলমান স্থগিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন নিশ্চিত করা। চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে আশ্বস্ত করেছে, বাংলাদেশ চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে থাকবে। উপরন্তু বিএনপি সরকার নতুনভাবে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। তবে ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। মোংলা সমুদ্রবন্দরের আধুনিকায়ন এবং তিস্তা প্রকল্প চীনের সহায়তায় করার আগ্রহ ভারত ইতিবাচকভাবে নিচ্ছে না। বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়নের উদ্যোগও ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

চীনের বৃহৎ বিনিয়োগ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রকল্পের অনুকূল অর্থনৈতিক রিটার্ন প্রাপ্তির বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। চীনের কাছ থেকে বিপুল ঋণ গ্রহণ করে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ঋণের ফাঁদে পড়ে গেছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। বিনিয়োগ আকর্ষণই বড় কথা নয়; সেই বিনিয়োগ যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বিবদমান সমস্যা নিরসন করে সম্পর্ক উন্নয়ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। তা ছাড়া ইতোমধ্যে বাংলাদেশ আমেরিকার সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে; চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক স্থাপনে সেটাও মাথায় রাখতে হবে। 

পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে আস্থার সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশের ‍স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক স্থাপনে প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক সামর্থ্য এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া: সাবেক সিনিয়র সচিব ও সাবেক রাষ্ট্রদূত

আরও পড়ুন

×