পরিবেশ
ছবি তুলতে গিয়ে বন্যপ্রাণীরই ক্ষতি?
মোছাব্বের হোসেন
মোছাব্বের হোসেন
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৫৫
ছবি মানুষের চিন্তা বদলে দিতে পারে। সুন্দরবনের বাঘ কিংবা হাওরের পরিযায়ী পাখির ছবি প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখাতে পারে। বন্যপ্রাণীর ছবি সচেতনতা তৈরি করে; সংরক্ষণের পক্ষে জনমত গড়ে তোলে। এমনকি সরকারকেও প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন জরুরি হয়ে উঠেছে; প্রকৃতির ছবি তুলতে গিয়ে কি আমরা প্রকৃতিরই ক্ষতি করছি?
আমি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ সাংবাদিকতায় মাস্টার্স করছি। আমার প্রফেসর নাদিয়া হোয়াইট এক দিন পাখির ছবি তুলতে নিয়ে গেলেন মন্টনা শহরের একটি মহল্লায়। বড় গাছে বসে আছে প্যাঁচা। তারা দূর থেকে দেখছেন। হাতে ক্যামেরা নিয়ে কিছুটা এগিয়ে যেতেই নাদিয়া প্রায় চিৎকার করে উঠলেন– আর কাছে যেও না। আমরা চাই না পাখিটি উড়ে যাক। হয়তো পাখিটা ওখানেই ভালো আছে। ঘটনাটি আমাকে দেশের কথা ভাবাল।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গুয়ার হাওর, সুন্দরবনসহ দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকায় বড় পরিসরে পাখি ও বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, কোথাও দল বেঁধে পাখির বাসার খুব কাছে যাওয়া হয়েছে; কোথাও ড্রোন ওড়ানো হয়েছে; কোথাও হইচই ও ভিডিও তৈরির কারণে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হয়েছে।
প্রতিটি অভিযোগ অবশ্যই আলাদাভাবে যাচাই করা দরকার। যথাযথ প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী বলা ঠিক হবে না। পাশাপাশি বড় প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে জাতীয়ভাবে আলোচনা শুরু করা দরকার।
বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার ক্ষেত্রে অন্যান্য ছবির মতো প্রথম বিবেচনা– ক্যামেরা নয়, আলো নয়। এমনকি সৌন্দর্যও নয়। প্রথম বিবেচনা হওয়া উচিত প্রাণীটির নিরাপত্তা। একটি ভালো ছবি তোলার কারণে যদি পাখি বাসা ছেড়ে উড়ে যায়; ছানা আতঙ্কিত হয়; কোনো প্রাণীর খাবার সংগ্রহ বা চলাফেরা বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই আলোকচিত্রীকে দায়িত্বশীল বলা যায় না।
এই নীতি আন্তর্জাতিকভাবে বহুদিন ধরেই স্বীকৃত। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকসহ বিশ্বের বড় বড় বন্যপ্রাণী আলোকচিত্র প্রতিষ্ঠান স্পষ্টভাবে বলে– প্রাণীকে বিরক্ত করে, ভয় দেখিয়ে, আবাসস্থল নষ্ট করে, তার আচরণে বিঘ্ন ঘটিয়ে ছবি তোলা গ্রহণযোগ্য নয়। ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায় এমন ছবি বাতিল করা হয়, যা তোলার সময় প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া হয়েছে; বিরক্ত বা আবাসস্থলের ক্ষতি করা হয়েছে। বিষয়টি পরিষ্কার– ছবির চেয়ে প্রাণীর জীবন ও নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ছবি ও সামাজিক মাধ্যম
একসময় বন্যপ্রাণীর ছবি তোলা ছিল ধৈর্য, অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের কাজ। আলোকচিত্রী একটি ভালো ছবির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা; কখনও দিনের পর দিন অপেক্ষা করতেন। এখন সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। ছবি বা ভিডিও হয়ে উঠেছে সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট। এর সঙ্গে যুক্ত লাইক, শেয়ার, ভিউ, অনুসারী, পুরস্কার, স্পন্সরশিপ, কখনও কখনও অর্থ উপার্জনের সুযোগ। ফলে বন্যপ্রাণীর আরও কাছে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে; আরও নাটকীয় দৃশ্যের আশায়। এই প্রতিযোগিতা বিপজ্জনক।
বন্যপ্রাণীর বিরক্তি বা আতঙ্ক সবসময় স্পষ্ট ধরা নাও পড়তে পারে। বাইরে থেকে শান্ত দেখালেও ভেতরে চাপ তৈরি হতে পারে। পাখি বারবার বাসা ছেড়ে গেলে ডিম বা ছানা শিকারির মুখে পড়তে পারে। কোনো প্রাণী মানুষের উপস্থিতির কারণে খাবার বা বিশ্রামের জায়গা বদলে ফেলতে পারে।
ড্রোন বন্যপ্রাণীর ছবি ও ভিডিওতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আকাশ থেকে নেওয়া দৃশ্য চমৎকার হতেই পারে। কিন্তু ড্রোনের শব্দ ও চলাচলে বন্যপ্রাণী আতঙ্কিত হতে পারে; বাসা ছেড়ে যেতে পারে; স্বাভাবিক আচরণ বদলে যেতে পারে। বিশ্বের বহু জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত এলাকায় এ কারণেই ড্রোন ব্যবহার নিষিদ্ধ বা শর্তসাপেক্ষ। বাংলাদেশেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।
আইন ও প্রয়োগ
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ বন্যপ্রাণী ও তাদের আবাসস্থল রক্ষায় প্রণীত। আইনটি বন্যপ্রাণী হত্যা, ধরা, পাচারের পাশাপাশি আবাসস্থলের ক্ষতি ও সংরক্ষিত এলাকায় ক্ষতিকর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণেও প্রয়োগযোগ্য। বাস্তব সমস্যা হলো, বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার আয়োজন দ্রুত বাড়লেও সে তুলনায় নৈতিক তদারকি ও আইন শক্তিশালী হয়নি। কোনো এলাকায় কতজন একসঙ্গে ছবি তুলতে পারবেন; প্রজনন মৌসুমে কোথায় যাওয়া যাবে না; বাসা থেকে কত দূরে থাকতে হবে; ড্রোন ওড়ানো যাবে কি না– এসব বিষয়ে স্পষ্ট ও সহজ নির্দেশনা নেই।
কোনো বন্যপ্রাণী আলোকচিত্র উৎসব বা ফটোওয়াক আয়োজনের আগে জানা দরকার– কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কিনা; পাখির প্রজনন মৌসুম চলছে কিনা; কতজন অংশগ্রহণ করবেন; ড্রোন ব্যবহার করা হবে কিনা; বাসা, ছানা বা প্রাণীর খুব কাছে যাওয়া নিষিদ্ধ কিনা; অংশগ্রহণকারীদের নৈতিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কিনা। এসবের উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে সেটি দায়িত্বশীল আয়োজন নয়।
জাতীয় আচরণবিধি
বাংলাদেশে এখন জাতীয় ‘বন্যপ্রাণী আলোকচিত্র আচরণবিধি’ দরকার। বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়, পাখি বিশেষজ্ঞ, বন্যপ্রাণী গবেষক, আলোকচিত্রী, পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং ক্যামেরা কোম্পানিগুলো মিলে এটা তৈরি করতে পারে। নিয়ম ভাঙলে জরিমানা, অনুমতি বাতিল বা ভবিষ্যৎ আয়োজনের ওপর নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ ছাড়া অংশগ্রহণকারীদের জন্য সংক্ষিপ্ত কিন্তু বাধ্যতামূলক পরিবেশ ও নৈতিকতাবিষয়ক প্রশিক্ষণ থাকা উচিত। কারণ বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার উদ্দেশ্য প্রকৃতিকে জয় করা নয়; বোঝা, সম্মান করা এবং গল্প তুলে ধরা।
বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। প্রতিবছর হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি হাওর, বিল ও জলাভূমিতে আসে। সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন। আমাদের বন, নদী, হাওর ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সবুজ অঞ্চল বহু প্রাণীর শেষ আশ্রয়স্থল। এসব জায়গা আমাদের মুগ্ধ করে। কিন্তু মুগ্ধতার চেয়েও আমাদের বেশি প্রয়োজন বন্যপ্রাণীর শান্তি।
দায়িত্বশীল আলোকচিত্রী জানেন, কখন ক্যামেরা তুলতে হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি জানেন কখন ক্যামেরা নামিয়ে রাখতে হয়। কখনও কখনও সবচেয়ে নৈতিক ছবিটি হলো সেই ছবি, যেটি আমরা তুলিনি। প্রকৃতিকে সংরক্ষণ মানে আমরা কত ছবি নিয়ে ফিরলাম, তা নয়। প্রকৃতি সংরক্ষণ মানে হলো, আমরা ফিরে আসার পরও প্রাণীগুলো সেখানে নিরাপদে রয়ে গেল কিনা।
মোছাব্বের হোসেন: বন্যপ্রাণীর আলোকচিত্রী; যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মন্টনায় পরিবেশ সাংবাদিকতায় অধ্যয়নরত
- বিষয় :
- পরিবেশ