ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

টাকার খনি

টাকার খনি
×

বাসায় দেয়ালে ঝুলছে স্ত্রী স্মৃতি বণিক ও স্বামী রাজীব বিশ্বাস ছবি -সমকাল

--

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:০১

চমক যেন ফুরাচ্ছেই না! পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ভাড়া নিয়ে ক্যাসিনো চালানো দুই ভাইয়ের আক্ষরিক অর্থেই 'যেখানে হাত দেওয়া হচ্ছে', সেখানেই মিলছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। সর্বশেষ বুধবার তাদের একটি বাড়ির ভল্টে নগদ ২৪ কোটি টাকা মিলেছে। সঙ্গে এক কেজি স্বর্ণ। এর আগেও তাদের আরেকটি আস্তানা থেকে পাওয়া গিয়েছিল এমন কোটি কোটি টাকা ও কেজি কেজি স্বর্ণ। বাংলা ভাষায় 'টাকার গরম' বলে একটা ধারণা রয়েছে। যেসব 'নিরীহ' মানুষ এসব আস্তানায় থাকা কোটি কোটি টাকা 'পাহারা' দিত, তারা কীভাবে এই 'গরম' সামাল দিত!
আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার প্রবাদ আমরা জানি। কিন্তু পুরান ঢাকার দৃশ্যত আওয়ামী লীগ নেতা, মূলত জুয়াড়ি এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়ার সম্পত্তির উত্থান যেন এই প্রবাদকেও হার মানিয়েছে। বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে- ঢাকা নগরীতে এ পর্যন্ত তাদের ২২টি বাড়ি ও ১২২টি ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে; কিন্তু শনাক্ত বাড়ি বা ফ্ল্যাটের সংখ্যাই যেন অবিশ্বাস্য। অনেকের সম্পত্তি সংগ্রহের নেশা থাকে, আমরা জানি। কিন্তু তাই বলে শতাধিক ফ্ল্যাট! তাদের হাজার কোটি টাকার ব্যাংক হিসাবও কম কীসে? কোনো ব্যক্তির শতাধিক ব্যাংক হিসাব থাকতে পারে- রীতিমতো গিনেস রেকর্ডের বিষয় হতে পারে।
ব্যক্তিবিশেষের এমন 'উত্থান' বিরল নয়; কিন্তু দুই সহোদরের একই সঙ্গে এত উল্লম্ম্ফন আগে কখনও দেখা গেছে বলে মনে নেই। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনসূত্রে জানা যাচ্ছে- আশির দশকেও এ দুই ভাইয়ের পিতা খুলনা শহরে পুরোনো বইয়ের দোকান চালাতেন। কারও কারও এমন ধারণা অমূলক হতে পারে না যে, সেই পুরোনো বইয়ের স্তূপে কোনো জাদুর কিতাব মিলেছিল। সেই জাদু দিয়েই ধুলো কিংবা হাওয়া থেকে দুই ভাই বানিয়েছে কোটি কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবতাও আমরা জানি। দেশের হাজার হাজার মানুষের মধ্যে জুয়ার নেশা ছড়িয়ে দিয়ে, তাদের সর্বস্বান্ত করে গড়ে উঠেছে অর্থের এই অবৈধ পাহাড়।
কথিত রয়েছে- বঙ্গবন্ধু একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আরব শেখরা যেখানে সোনার খনি পেয়েছে, সেখানে তিনি পেয়েছেন 'চোরের খনি'। সদ্য স্বাধীন দেশে যেখানে সবারই দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করার কথা ছিল, সেখানে একটি অংশ নিজেদের আখের গোছাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশের সূচনালগ্নে এমন চিত্র দেখে জাতির পিতার মনে আক্ষেপ অসঙ্গত ছিল না। বলা বাহুল্য, তখন অর্থনীতি অনেক ছোট ছিল। অনিয়মের সুযোগও ছিল সীমিত। সেখান থেকে নয়ছয় করা অর্থের পরিমাণও নিশ্চয়ই বড় ছিল না। সে তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন কতটা বড় হয়েছে, জাতীয় বাজেটের অঙ্ক তুলনা করলে খানিকটা বোঝা যায়। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের বাজেট ছিল নেহাত তিন অঙ্কের- ৭৮৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সেই অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ছয় অঙ্কে- ৫,২৩,১৯০ কোটি টাকায়। জাতীয় বাজেটের অনুপাত অনুসারে অনিয়ম বেড়েছে কিনা, তা অবশ্য অঙ্ক দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
আমরা দেখছি, যেসব দেশে কোটিপতির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, তার শীর্ষ সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। সেই হিসাব অবশ্য 'বৈধ' সঞ্চয় ও লেনদেনের। এনু-রুপনের মতো 'অর্থশালীদের' হিসাব করলে বাংলাদেশের অবস্থান নিশ্চয়ই আরও উঁচুতে থাকত। তাদের অর্থ নিছক সঞ্চালনার বিষয় নয়, যেন খনির মতো। হাত বাড়ালেই মিলছে বান্ডিল।
বঙ্গবন্ধু 'চোরের খনি' নিয়ে আক্ষেপ করেছিলেন। আমরা যেন সেই চোরদেরই আরও বৈচিত্র্যময় রূপ দেখছি। তারা কত অভিনব কায়দায় যে মানুষের পকেট কেটে নিচ্ছে! গড়ে তুলছে 'টাকার খনি'।

আরও পড়ুন

×