ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

মুজিববর্ষ

বঙ্গবন্ধু অনির্বাণ বাতিঘর

বঙ্গবন্ধু অনির্বাণ বাতিঘর
×

ফাইল ছবি

--

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২০ | ১৩:৫০

দীর্ঘ প্রস্তুতির পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে ঘোষিত মুজিববর্ষে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করছি আমরা। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও এ সংক্রান্ত সতর্কতার কারণে নির্ধারিত আয়োজন যদিও কিছুটা সংক্ষেপ করা হয়েছে, তাতে করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর প্রিয় স্বদেশের ভালোবাসা প্রকাশে কোনো ঘাটতি থাকবে না। বস্তুত এই মহান নেতার জন্মশতবার্ষিকীতে বিশ্বজুড়েই থাকবে তাঁকে স্মরণ এবং শ্রদ্ধার আবহ। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে তাঁর প্রতি সমকাল পরিবারের পক্ষ থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। বস্তুত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে গোটা জাতিই আজ স্মরণ করবে বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র তথা বাংলাদেশের এই মহান স্থপতিকে।

এক শতাব্দী আগে অখণ্ড বাংলার প্রত্যন্ত পল্লিতে জন্মগ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন, তা বিশ্বের বিস্ময় বৈকি। শুধু উপমহাদেশে নয়, বিশ্বের শোষিত মানুষের পক্ষে সগৌরবে অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি। উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন- বিশ্ব শাসক ও শোষিত দুই ভাগে বিভক্ত, তিনি শোষিতের পক্ষে। কেবল বাংলাদেশ নয়, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণার অপর নাম ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

মাত্র সাড়ে তিন বছরের রাষ্ট্র পরিচালনায় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তার তুলনা আর কোথাও নেই। বিশ্ব পরিমণ্ডলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ যে মর্যাদা ও সম্মান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল, তা যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য ছিল ঈর্ষা ও বিস্ময়ের। আমরা দেখেছি, আয়তনে ছোট রাষ্ট্র বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের বড় পক্ষ। জাতিসংঘ, ওআইসি, কমনওয়েলথ, ন্যাম প্রভৃতি বিশ্ব সংস্থায় তিনি ছিলেন নিপীড়িত রাষ্ট্রগুলোর প্রাগ্রসর প্রতিনিধি। আজও পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে স্বাধীনতা বা স্বাধিকারের প্রশ্ন এলে একজন শেখ মুজিবের প্রয়োজনীয়তার কথা সবাই মুক্তকণ্ঠে উচ্চারণ করে।

অস্বীকারের অবকাশ নেই, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে উল্লাস ও আনন্দের মধ্যেও আমাদের হৃদয়ের তন্ত্রীতে বেজে ওঠে সকরুণ সুর। আমরা জানি, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ঘাতকরা বাংলাদেশের ললাটে যে অমোচনীয় কলঙ্ক লেপ্টে দিয়েছিল, তার অনুশোচনা থেকে আমাদের সহজে মুক্তি নেই। স্বীকার করতে হবে, পঁচাত্তরের খুনিচক্র আজ নিন্দিত ও নিশ্চিহ্ন। যদিও আইনি জটিলতার কারণে আত্মস্বীকৃত ছয় খুনিকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না; বাকিরা ইতোমধ্যে কৃতকর্মের ফল ভোগ করেছে। এমনকি যারা বিভিন্ন দেশে ফেরারি হয়ে আছে, তারাও সামাজিকভাবে মৃত সমতুল্য। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর সূচনালগ্নে আমাদের দৃপ্ত অঙ্গীকার- বাকি খুনিদেরও কৃতকর্মের ফল ভোগ করতেই হবে।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের অনির্বাণ বাতিঘর। তিনি আমাদের শক্তি ও সাহসের উৎস হয়েই থাকবেন। আমরা দেখি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সংহতির প্রতীক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখনও তাঁর জীবন, কর্ম ও বাণী দিয়ে জাতিকে শক্তি জুগিয়ে চলছেন। এ ব্যাপারে আমাদের সামান্য সন্দেহও নেই যে, ভবিষ্যতের দিনগুলোতেও বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম ও বাণী বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে পথ দেখিয়ে চলবে।

আমরা এও দেখেছি, কীভাবে দেশীয় ও বিদেশি চক্রান্তের জাল ছিঁড়ে বঙ্গবন্ধু ক্রমেই রাষ্ট্র ও সমাজে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। আমরা দেখছি, যত দিন যাচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর ছায়া যেন ক্রমেই দীর্ঘতর হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী প্রেরণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। আমরা দেখছি, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে। দক্ষিণ এশিয়ায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার এ এক অভূতপূর্ব স্বীকৃতি।

ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু কেবল ক্রমেই উজ্জ্বলতর হচ্ছেন না, তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা, তাঁর দর্শন, তাঁর মানবিকতা, তাঁর রাজনীতিও ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। পঁচাত্তরের পর ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র থেকে গণতন্ত্র, মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রীতির সুমহান আদর্শ মুছে ফেলার যে অপচেষ্টা চলেছিল, কালের পরিক্রমায় তা সর্বাংশে ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর হাতে গড়া আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর একদিকে যেমন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া অনেকাংশে সম্পন্ন হয়েছে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দৃশ্যমান অর্জন সম্ভব হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উত্তরণ ঘটেছে বাংলাদেশের। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যে প্রত্যয় ব্যক্ত করতেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ তারই সার্থক রূপায়ণ।

আমরা বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু আর কোনো নির্দিষ্ট দলের নেই। তিনি বাংলাদেশেরই অপর নাম। অনেক আঁধার রাতে তিনি আলোর আভাস। ঝোড়ো সমুদ্রে তিনি রুপালি তটরেখা। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের মধ্য দিয়ে আমরা তাঁরই প্রদর্শিত পথে চলে তাঁরই স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার শানিত করব।

আরও পড়ুন

×