অন্যদৃষ্টি
গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা
ফাইল ছবি
জান্নাতুল ফেরদাউস পিয়াসা
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৫ | ০০:০৮ | আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৫ | ০৮:১৫
প্রতিদিন হাজার হাজার নারী ঢাকার রাস্তায় যাতায়াত করেন, কেউ কর্মস্থলে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউবা অন্য প্রয়োজনীয় কাজে যান। আমিও তেমনি একজন। প্রতিদিন ‘আলিফ’-এর একটি নির্দিষ্ট বাসে আগারগাঁও থেকে রামপুরার স্টাফ কোয়ার্টার পর্যন্ত যাতায়াত করি। এই যাত্রাপথে বহু রকম অভিজ্ঞতা হয়; কিন্তু সবচেয়ে কষ্টদায়ক বিষয় হলো–যৌন হয়রানির ঘটনা, যা এখনও অনেকের কাছে ‘তুচ্ছ’ বলে বিবেচিত হয়।
গত মে মাসের ৩০ তারিখে এমনই একটি ঘটনা ঘটে আমার চোখের সামনে। বিজয় সরণির মোড়ে বাসে লোকজন গাদাগাদি করে উঠছে। আমার পাশের সিটে বসা এক তরুণী বারবার অস্বস্তি প্রকাশ করছিলেন–একজন পুরুষ বারবার তাঁর শরীরের সঙ্গে নিজের শরীরের অংশ ঘষছিল। মেয়েটি কিছু বলছিল না, শুধু ধীরে ধীরে আমার দিকে সরে আসছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম সে ভীষণ অস্বস্তিতে আছে; কিন্তু মুখে প্রতিবাদের ভাষা নেই। কিছুক্ষণ সহ্য করার পর নিজেই প্রতিবাদ করি এবং ওই ব্যক্তিকে বাস থেকে নামিয়ে দিই।
এই একটি অভিজ্ঞতা হয়তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে অনেকে দেখবেন। বাস্তবতা হলো–এগুলো প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে; আর শত শত নারী এর শিকার হয়ে চলেছে। ভুক্তভোগী অনেকেই তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিবাদ করেন না। এমনকি পুলিশেরও কাছে মুখ খোলেন না। কখনও ভয়, কখনও লজ্জা, কখনও ‘কী হবে বললে’–এ ধরনের মানসিকতায় তারা চুপ থাকেন। যে ঘটনাটির কথা আমি বলেছি, সেখানে আমি না থাকলে কী হতো–এ প্রশ্ন তোলাই যায়। বাসের মধ্যে যেসব পুরুষ যাত্রী থাকেন, তাদের সবার মানসিকতা এক না হলেও এ সমাজেরই তো সদস্য তারা। কে না জানে, আমাদের সমাজটা মুখ্যত এক পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, যেখানে পুরুষের, বিশেষত নারীসংক্রান্ত হাজারটা অপরাধ এড়িয়ে যাওয়াই দস্তুর। ক্ষেত্রবিশেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আনা হলেও তা ক্ষমার চোখে দেখা হয়। ঠিক একই কারণে নারীদেরও মধ্যে চুপচাপ নির্যাতন-হয়রানি সহ্য করার মানসিকতা গড়ে উঠেছে।
প্রশ্ন হলো, আর কতদিন আমরা চুপ থাকব? সর্বশেষ সরকার পরিচালিত জনগণনা অনুসারে, এখানে নারী মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ; অর্থাৎ ভোটের হিসাবে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ–চাইলেই তারা নিজেদের সরকার গঠন করতে পারে। এ অবস্থায়ও নিপীড়ন নীরবে সয়ে যাওয়া কতটুকু সংগত?
আমরা যারা কর্মজীবী, প্রতিদিন তাদের রুটিরুজির জন্য বাড়ির বাইরে যাতায়াত করতে হয়, বাসে-ট্রেনে চড়তে হয়। চুপ থেকে কি সমস্যাটির সমাধান সম্ভব? কস্মিনকালেও নয়। আমরা যে নারীরা প্রতিদিন এই শহরের গণপরিবহনে চলাচল করি, আমাদেরই সাহসের সঙ্গে দাঁড়াতে হবে। হয়রানির বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদটি যদি সহযাত্রী না করেন, তাহলে হয়তো ভুক্তভোগী কখনোই কথা বলবেন না। তাই একে অপরের পাশে দাঁড়ানো, সচেতন থাকা এবং নির্ভয়ে আওয়াজ তোলা এখন সময়ের দাবি।
আমার পরামর্শ, নিজের অভিজ্ঞতা গোপন না রেখে অন্যদের জানান। বাসে বা রাস্তায় হয়রানির ঘটনার প্রতিবাদ করুন। বাস কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক পুলিশের কাছে রিপোর্ট করুন। আইনের সাহায্য নিন (যৌন হয়রানি দমন আইন অনুযায়ী)। প্রয়োজনে সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিজ্ঞতা তুলে ধরুন–অন্যরা তাহলে সচেতন হবে।
নারীর জন্য নিরাপদ নগরী গড়তে হলে শুধু আইন নয়, দরকার সামাজিক প্রতিরোধও। প্রতিবাদের ভাষা যত জোরালো হবে, হয়রানির সুযোগ তত কমবে। একটি শহর সভ্য কিনা, তা নির্ধারিত হয় তার নারীরা কতটা নিরাপদভাবে চলাফেরা করতে পারে সেটি দেখে। আমরা যারা প্রতিদিন রাস্তায় থাকি, তারাই এই পরিবর্তনের প্রথম সৈনিক। আমরা আমাদের কথা না বললে কে বলবে?
জান্নাতুল ফেরদাউস পিয়াসা: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- গণপরিবহন
- নারীর নিরাপত্তা
