ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিবেশী 

মিয়ানমারে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বৈশ্বিক বিপদ

মিয়ানমারে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বৈশ্বিক বিপদ
×

সাইমন টিসডাল

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৬ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৮:০০

শিশুরা যখন ঘুমাচ্ছিল তখন আকাশ থেকে মৃত্যু ভেসে এলো। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানালেন, একটি সামরিক যুদ্ধবিমান তাদের বোর্ডিং স্কুলে দুটি ৫০০ পাউন্ড বা ২৩০ কেজি ওজনের বোমা ফেলেছে। কল্পনা করুন, সেই হত্যাকাণ্ড ও ভয়াবহতা কেমন হতে পারে। ১৮ জন মারা গেছেন।

অন্যরা জীবন তছনছ হয়ে যাওয়ার মতো আঘাত পেয়েছেন। শাসকগোষ্ঠী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার দাবি করে। তবুও প্রায়ই নিরীহ, নির্দোষ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা, পঙ্গুত্ব ও ভিটেছাড়া করা হয়। না, এটি গাজা নয়; ইউক্রেন নয়। এটি মিয়ানমার, যেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধসহ ভয়াবহ নৃশংসতা প্রায়ই প্রতিবেদনে উঠে আসে না এবং শাস্তির আওতার বাইরে থাকে। 

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখলে বলা যায়, এটি জাতিসংঘ নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থা, আঞ্চলিক সংস্থা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অভিন্ন আইন ও মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে ‘পরাশক্তি’গুলোর ক্ষমতা হ্রাসের একটি নিদর্শন। এটি এমন এক পরীক্ষা, যেখানে তারা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। আর যখন চীন, রাশিয়া এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা চলে আসে, তখন ব্যর্থতা ইচ্ছাকৃত। অন্যান্য তথাকথিত সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের মতো মিয়ানমারে দিনের পর দিন যা ঘটছে, তা মূলত একটি অকথিত আন্তর্জাতিক দুর্দশা। চ্যাপলিনের সিনেমায় অযৌক্তিকভাবে নন্দিত যে একনায়কের কথা বলা হয়েছে, মিন অং হ্লাই সে রকমই একনায়ক। তাঁর নেতৃত্বাধীন জান্তা সরকার সম্পূর্ণ অবৈধ।

নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি পরিচালিত সরকারকে উৎখাত করার পর দেশব্যাপী যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা নির্মমভাবে দমন করা হয়েছিল। বৈরিতাপূর্ণ জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর কাছ থেকে বিশাল এলাকা দখল করে, যার মধ্যে পশ্চিম রাখাইন রাজ্যের বেশির ভাগ অংশও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ অঞ্চলে চলতি মাসে স্কুলে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। মিন অং হ্লাইং নিজেকে সংযত না করে ডিসেম্বরে তাঁর শাসন ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং শাসন জোরদার করার জন্য নির্বাচনের পরিকল্পনা করছেন। এটা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট, যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে প্রায় নিশ্চিতভাবেই তা প্রহসনে রূপ নেবে। নির্বাচনের ফলাফল সম্ভবত আগে থেকেই নির্ধারিত। 

জান্তার টিকে থাকার জন্য প্রতিবেশী চীনের সমর্থন খুব গুরুত্বপূর্ণ। বরাবরের মতোই বেইজিং প্রকৃত গণতন্ত্রের চেয়ে ‘শক্তিশালী’ শাসন, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি এবং এর অবকাঠামো, জ্বালানি ও খনিতে বিনিয়োগকে প্রাধান্য দেয়। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই মাসে তাঁর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বার্ষিকীর কুচকাওয়াজে মিন অং হ্লাইংকে স্বাগত জানিয়েছেন, যাঁর বিরুদ্ধে আইনজীবীরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অভিযোগ দিয়েছেন। 

মিয়ানমারে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি একই রকম উপেক্ষা দেখিয়ে ভারতীয় নেতা নরেন্দ্র মোদিও স্বৈরশাসককে বরণ করে নিয়েছেন এবং তাঁর জাল নির্বাচন সমর্থন করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংগঠন আসিয়ানের সভাপতি হিসেবে মালয়েশিয়া জোর দিয়ে বলে, যে কোনো ভোটের আগে যুদ্ধবিরতি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া তাতে বাগড়া দিয়েছে।

মিয়ানমারের জনগণের দুর্ভোগের কোনো সীমা নেই। অভ্যুত্থানের পর থেকে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ মারা গেছে; আরও হাজার হাজার মানুষকে বিচার ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে। গত মাসে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বলেছিলেন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় বিচার সম্পন্ন না করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া এবং আটক ব্যক্তিদের ‘পরিকল্পিত নির্যাতন’, যার মধ্যে যৌনাঙ্গ পুড়িয়ে দেওয়া, দলবদ্ধ ধর্ষণ, শ্বাসরোধ, মারধর এবং বৈদ্যুতিক শক দেওয়া অন্তর্ভুক্ত ‘দেশজুড়ে তীব্রতর হওয়া নৃশংসতার একটি ধরন’-এরই অংশ। এ ছাড়া ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যার মতো আগের অপরাধও, যার ফলে রাখাইন রাজ্যের ৭ লাখেরও বেশি মুসলিম রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল, যা ক্রমশ বাড়ছে। চলমান লড়াই ও বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিলিশিয়া বাহিনীর বিদ্বেষমূলক আক্রমণ, ২০২৪ সাল থেকে আরও এক লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সম্ভাব্যভাবে যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সাহায্য কমে আসার অর্থ হলো বাংলাদেশি শিবিরে থাকা ১০ লাখেরও বেশি নির্বাসিতর জন্য খাদ্য সরবরাহ ও চিকিৎসা সহায়তা ফুরিয়ে আসছে। বর্তমান প্রবণতা অনুসারে ডিসেম্বরের মধ্যে কোনো খাবার থাকবে না।

প্রায় যে কোনো বিচারেই মিয়ানমারের সংকট মানে সবার সংকট, যা অকার্যকর বিশ্বের ব্যর্থতা তুলে ধরে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার ‘আওতাভুক্ত’ হিসেবে দেশটির ব্যাপারে আরও কিছু করতে হবে; অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা অপরিহার্য। তবুও আসিয়ান বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরও হস্তক্ষেপমূলক অবস্থান গ্রহণ করবে, অথবা চীনের হঠাৎ বোধোদয় ঘটতে পারে। 

সাইমন টিসডাল: গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমেন্টেটর; দ্য গার্ডিয়ান থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×