ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজনীতি

মার্কায় কী আসে যায়! 

মার্কায় কী আসে যায়! 
×

হাসান মামুন 

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৯ | আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৫:১২

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিবন্ধিত হতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনে (ইসি)। একই সঙ্গে আরও কিছু দল নিবন্ধিত হবে। ফেব্রুয়ারিতে হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচন। নির্বাচনী সংলাপ শুরু করেছে ইসি। এনসিপির সঙ্গেও নিশ্চয় সংলাপ হবে। এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে ইসির সঙ্গে দলটির জটিলতা নজর কেড়েছে।

গণঅভ্যুত্থানের পর নিবন্ধন পাওয়া কিছু দলের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে প্রায় নির্বিঘ্নে। এনসিপি যে শাপলা প্রতীক চাইছে, সেটা তাদের আগে চেয়েছিল নাগরিক ঐক্য। তাদের কেন দেওয়া হয়নি; এনসিপিকে কেন দেওয়া হচ্ছে না; তার ব্যাখ্যা দিয়েছে ইসি। সম্প্রতি ১১৫ নির্বাচনী প্রতীকের যে তালিকা প্রকাশ করেছে ইসি, তাতে শাপলা রাখা হয়নি। নাগরিক ঐক্যকে দেওয়া হয়েছে কেটলি প্রতীক; দলটি প্রত্যাখ্যান করেনি।

এনসিপি মনে করছে, পছন্দের প্রতীক থেকে তাদের বঞ্চিত করতেই তালিকায় শাপলা রাখেনি ইসি। দলটির দাবি, তালিকায় শাপলা যুক্ত করে এনসিপিকেই দিতে হবে। তবে ইসি প্রতীক বাড়াতে পারলেও শাপলা যুক্ত করতে পারবে না বলেই মনে হয়। কেননা, ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল, শাপলা জাতীয় প্রতীক। এটা কোনো দলের প্রতীক হতে পারে না।

আদতে শাপলা জাতীয় প্রতীকের মূল অংশ। এটি ঘিরে অন্যান্য অনুষঙ্গ রয়েছে; যেমন ধানের গুচ্ছ, পাটপাতা, তারকা। কাছে থেকে না দেখলে শাপলাটিই চোখে পড়ে বলে সবাই ‘জাতীয় প্রতীক’ বলতে শাপলার কথা বলে। অতিশয় পছন্দ বলেই এটি কোনো দলের প্রতীক হবে কীভাবে, বোধগম্য নয়। শুরুতে এনসিপি বিকল্প হিসেবে আরও যে দুটি প্রতীকের কথা জানিয়েছিল, সেগুলোর একটিও নিতে তারা এখন অসম্মত। শাপলাই লাগবে; বরাদ্দ না হলে নির্বাচন কীভাবে হয়– সেটা দেখে নেওয়ার কথা বলেছেন এনসিপি নেতা সারজিস আলম। 

‘নির্বাচনের রোডম্যাপ’ ঘোষণার পর পিআর চালুর দাবিতেও কিছু দল মাঠে নেমেছে। সংসদের উভয় কক্ষে পিআর না হলে নির্বাচন হতে দেবে না– এমন বক্তব্যও দিচ্ছে। সময়সীমা নির্দিষ্ট হওয়ার পর সবার যখন নির্বাচনমুখী হওয়ার কথা, তাদের এমন দাবির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আন্দোলনে নামা দলগুলো ঐকমত্য কমিশনের সংলাপেও অংশ নিচ্ছে; সেখানে পিআর-সংক্রান্ত আলোচনা চলমান! অগ্রগতি বলতে হবে– জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচনের দাবি কেউ তুলছে না। এ নিয়ে মাঠ গরমের চেষ্টাও কিছুদিন ছিল। 

প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতিতে এনসিপির শাপলা প্রতীকের দাবি ঘিরে মাঠ গরম হবে? প্রতীকটি না পেলে তাদের অসুবিধাই বা কী? শাপলা পেলে সেটি দূর হয়ে যাবে? তালিকায় শাপলা যুক্ত হলেও সেটা যদি এর প্রাথমিক দাবিদার দলটির জন্য বরাদ্দ হয়, তখনই বা কী হবে? এনসিপি হয়তো বলবে, নাগরিক ঐক্যের নামে তো ইতোমধ্যে প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে। সুতরাং এনসিপিকে শাপলা দিতে সমস্যা কোথায়? ইসি অবশ্য শাপলাকে ‘জাতীয় প্রতীক’ উল্লেখ করে এটা নিয়ে নতুন করে কিছু না বলার কথা জানিয়েছে।

এ অবস্থায় নতুন কোনো প্রতীক চাওয়াটাই এনসিপির দিক থেকে সঠিক ও সময়োচিত হবে। কোনো দল ইতোমধ্যে কী প্রতীক পেয়েছে– এমন প্রশ্ন তুলেও ফায়দা হবে না। জাতীয় প্রতীকে শাপলার অনুষঙ্গ হিসেবে ধানের গুচ্ছ রয়েছে বটে; বিএনপির প্রতীক আসলে দুটি পাতাসহ ধানের ছড়া। সেটি ‘ধানের শীষ’ বলে প্রচার পেয়েছে। বিএনপি জাতীয় প্রতীকের একটি অনুষঙ্গ পেয়েছে বলে এনসিপি অবশ্য অন্য দুটি অনুষঙ্গের একটি দাবি করতে পারে। শাপলাকে দলীয় প্রতীক হিসেবে চাওয়ার বিষয়টি ইসির পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দলও মানবে বলে মনে হয় না। 

বর্তমান শাসনামলে গঠিত হলেও ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে আগেই প্রশ্ন তুলে রেখেছে এনসিপি। ইসি পুনর্গঠনের দাবিতে তারা সাংবিধানিক সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছিল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য দাবিতে অনড় থাকেনি। এর মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করেছেন। বর্তমান ইসির অধীনেই এটি অনুষ্ঠিত হবে। এনসিপিও তাদের সিদ্ধান্তে নিবন্ধন পেতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় দলীয় প্রতীক নিয়ে দুই পক্ষে জটিলতা সৃষ্টি না করাই ভালো।

নির্বাচনের বেশি বাকি নেই। ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি বলেছেন, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হলে ‘জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত’ হবে। এর অনেক আগে সেনাপ্রধান বলেছিলেন, নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি করলে ‘স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন’ হবে। গণঅভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, এটা স্বাভাবিক। তাই বলে ‘কাদা ছোড়াছুড়ি’ করেই যাওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। 

সরকার যে নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন করতে শেষ পর্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ– এটা অবশ্য ইতিবাচক। এ প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোয় মতভেদ পরিলক্ষিত নয়। ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রমও শেষদিকে। ইসি এসে গেছে দৃশ্যপটে। এর মধ্যে নতুন একটি দলের প্রতীক নিয়ে মাঠ গরমের সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। এনসিপি বরং পারে গঠনের পর থেকে নিজেদের কার্যক্রম পর্যালোচনায় মনোযোগী হতে। 

ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে এনসিপির শিক্ষার্থী সংগঠন কেন আশানুরূপ ফল পায়নি– দলটির দুশ্চিন্তার বিষয় হওয়া উচিত। গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব প্রদানকারীদের দল হিসেবে তাদের প্রতি নাগরিকদের যে শুভেচ্ছা ছিল, সেটা এখন কমছে। রাজনীতিতে ‘নতুন ধারা’ প্রতিষ্ঠার কথা বললেও পুরোনো ধারাতেই চলেছে কিনা– এ প্রশ্নও নিজেদের করা উচিত। এনসিপির ‘আদর্শগত অবস্থান’ স্পষ্ট করাও জরুরি। শাপলা প্রতীক পেলেও এসব প্রশ্ন তারা কোনোভাবেই এড়াতে পারবে না। 

দলীয় প্রতীক আকর্ষণীয় হলে সেটা নিশ্চয় ইতিবাচক। তবে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেতে তা কমই সহায়ক হয়ে থাকে। নির্বাচনী সাফল্য তো আরও পরের ব্যাপার। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নদীমাতৃক এদেশে কী দারুণ অর্থবহ! অথচ গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে তারা এখন নজিরবিহীন সংকটে নিপতিত। সুতরাং প্রতীক বা মার্কায় কী আসে যায়! 

ইসি প্রদত্ত তালিকা থেকে পছন্দসই একটি প্রতীক বেছে নিয়ে এনসিপি কীভাবে নির্বাচনে লড়বে, সেটাই এখন তাদের দ্রুত স্থির করা উচিত। প্রস্তুতিহীন অবস্থায় আগামী নির্বাচনে না লড়ে এর পরবর্তী নির্বাচনের জন্য নিজেদের বলিষ্ঠ করে তোলাটাও তাদের বিবেচ্য হতে পারে।

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×