ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

মূল্য স্ফীতি

স্বল্পমেয়াদি সমাধান এবং দীর্ঘমেয়াদি চাপ

স্বল্পমেয়াদি সমাধান এবং দীর্ঘমেয়াদি চাপ
×

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩২ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৫ | ১২:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাজারে এখন যেন হাঁসফাঁস অবস্থা। কয়েক বছরের চাপের পর পরিবারগুলো খরচের খাতা মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। চাল, ডাল, তেল আর গ্যাসের বিল একসঙ্গে উঠলে মনে হয় ঘরের ভেতরেই যেন একটা ক্ষুদ্র ব্যাংক চলছে, যেখানে প্রতিদিনই ঘাটতি বাড়ছে। আসল সমস্যা হলো, টাকা ছাপিয়ে সমাধানের চেষ্টা স্বল্প সময়ে একটু অক্সিজেন দিলেও দীর্ঘ পথে সেই ধোঁয়াই চারদিক ঢেকে ফেলে। সেই ধোঁয়াই চোখে লাগে, নীতিনির্ধারণের দিক হারিয়ে যায়, আর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ে।

তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে, সরকার কেন টাকা ছাপে। আয় কম, ব্যয় বেশি, ফলে বাজেট ঘাটতি পোষানো, ধাক্কা সামলানো বা প্রকল্পের বিল পরিশোধে ছাপাখানা সহজ সমাধান বলে মনে হয়। সন্দেহ নেই, এতে তাৎক্ষণিক স্বস্তি মেলে। কিন্তু যখন বাজারে টাকার স্রোত পণ্যের স্রোতের চেয়ে বড় হয়ে যায়, তখন সেই ঘূর্ণি দামের ঘূর্ণিঝড় তৈরি করে, যা মুদ্রাস্ফীতি হয়ে প্রতিদিন আমাদের জীবনে আঘাত হানে।

মূল সংকট আসলে সরবরাহ ও উৎপাদনের সঙ্গে টাকার গতির ভারসাম্যহীনতায়। দোকানের তাক ভরা থাকলেও পরিবহন ব্যয়, জ্বালানির মূল্য সমন্বয়, আমদানির বাড়তি খরচ–সব মিলিয়ে পণ্যের চূড়ান্ত দামে চাপ পড়ে। মজুরি স্থির থাকে, কিন্তু ব্যয়ের বোঝা বাড়ে। ফলে বাস্তব আয় কমে, সঞ্চয় ক্ষয়ে যায়, ঋণের চাপ বেড়ে যায়। ছোট ব্যবসা ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবার তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একই সময়ে বিনিয়োগকারীরাও অনিশ্চয়তায় থাকেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে তারল্য বাড়ালেও আস্থাহীন পরিবেশে কেউ নতুন কারখানা বা বিনিয়োগে হাত দিতে চায় না। এতে কর্মসংস্থান ধীর হয়, উৎপাদন কমে। এখানেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। দাম ঠেকাতে টাকা ঢোকানো হচ্ছে, কিন্তু দাম বাড়ার ভয়েই বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। উন্নয়নের ইঞ্জিনের শব্দ হয়তো জোরে শোনা যায়, কিন্তু গতি কমে যাচ্ছে। 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি কেবল সংখ্যার খেলা নয়; বরং এটি রান্নাঘরের চুলা, বাসা ভাড়া, স্কুল ফি আর হাসপাতালের বিলের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। শহরের মানুষ ভাড়ার চাপে পিষ্ট, গ্রামে চলে জীবনের টানাপোড়েন। খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহনে ধারাবাহিক চাপ থাকলে বাজারের শূন্য থলেটাই ভারী হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র যে ভর্তুকি দিয়ে মানুষকে টিকিয়ে রাখতে চায়, বাজারে ছাড়া অতিরিক্ত টাকা সেই ভর্তুকিকেও গিলে খায়। এই বাস্তবতায় জরুরি হয়ে পড়েছে ধাপে ধাপে পরিকল্পিত ও বাস্তবসম্মত সমাধান।

প্রথমেই রাজস্ব ভিত্তি চওড়া করা প্রয়োজন। যেহেতু করজাল এখনও সরু, তাই প্রতিটি বিক্রয়ে ডিজিটাল রসিদ, কিউআর পেমেন্ট, ই-চালান এবং ছোট ক্রয়ে করছাড় বা ট্যাক্স ক্রেডিটের প্রণোদনা চালু করা দরকার। এতে নগদ লেনদেনের অদৃশ্য স্রোত দৃশ্যমান হবে, ন্যায্য ভ্যাট ও আয়কর বাড়বে, ব্যবসার হিসাব স্বচ্ছ থাকবে এবং ধারনির্ভরতা কমবে। পরিসংখ্যান দেখায়, ভিত্তি চওড়া হলে হার না বাড়িয়েও রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব।

পরবর্তী ধাপ ব্যয়ে শৃঙ্খলা আনা ও অগ্রাধিকারে ছাঁটাই করা। যে প্রকল্প দেরিতে চলছে বা আমদানিনির্ভর বিলাস খাতে ব্যয় বেশি, সেগুলো ধাপে ধাপে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। উৎপাদনশীল খাতে শুল্ক ও পরিবহন ফি সহজ করা উচিত, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় আমদানিতে করকাঠামো 

শক্ত করতে হবে। সাশ্রয় হওয়া অর্থ 
লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, খাদ্য ও জ্বালানির সংরক্ষণ ভান্ডার (বাফার মজুত) এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার স্বল্প সুদের ঋণে ব্যয় করা প্রয়োজন। রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে এখানেই সর্বাধিক সমন্বয় দরকার।

মূল্যস্থিতির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব শুধু সুদের হার নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রত্যাশা ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বচ্ছ যোগাযোগ, নিয়মিত তথ্য প্রকাশ এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা বাজারে আস্থা তৈরি করে। খাদ্যপণ্য ও জ্বালানিতে কৌশলগত মজুত, সময়োচিত আমদানি নীতি এবং কৃষিপণ্যে ঋতুভিত্তিক শুল্ক নমনীয়তা দামের ধাক্কা কোমল করে। মানুষ যদি ভবিষ্যৎ দাম স্থিতিশীল মনে করে, তাহলে আতঙ্কে কেনাকাটা কমে যায়, ফলে বাজারে স্বস্তি আসে।

অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে হলে উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে গতি আনতে হবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নির্ভরযোগ্য জোগান নিশ্চিত করা, 
বন্দর ও কাস্টমসে অপেক্ষার সময় কমানো, মহাসড়ক ও রেলপথে বাধা দূর করা–এসব সরাসরি খরচ কমায়। কৃষিতে বীজ, সার ও সেচে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারে উৎসাহ, নতুন রপ্তানি বাজার খোঁজা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় জোর দিলে আয় বাড়ে, ডলারের চাপ কমে এবং মুদ্রার মান স্থিতিশীল থাকে।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষকে সঙ্গে নেওয়া। নিত্যপণ্যে স্মার্টকার্ড বা ডিজিটাল কুপনের মাধ্যমে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিলে অপচয় কমে এবং প্রকৃত দরিদ্র সুবিধা পায়। শহরে গ্যাস ও বাস ভাড়ার সমন্বয়মূল্য হলে শ্রমজীবীদের জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা প্রোগ্রাম থাকা দরকার। আর্থিক শিক্ষা, ছোট সঞ্চয়পণ্য, ন্যায্য রিটার্ন ও স্বচ্ছ কিস্তি চুক্তি পরিবারকে টিকিয়ে রাখে। ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যান্সে প্রতারণা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা গেলে ক্ষুদ্র আয়ের মানুষ নিরাপদে লেনদেন করতে পারে।

সব শেষে বলা যায়, টাকা ছাপলেই সমস্যার সমাধান–এ ধারণা যত দ্রুত ত্যাগ করা যায় ততই ভালো। স্থিতিশীলতার পথে তিনটি ভিত্তি অপরিহার্য: স্বচ্ছ রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয়ের শৃঙ্খলা, বিশ্বাসযোগ্য মুদ্রানীতি ও প্রত্যাশা ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় গতি। অর্থনীতি আসলে আস্থার বিজ্ঞান। আস্থা ফিরলে দাম শান্ত হয়, বিনিয়োগ ফেরে, চাকরি বাড়ে। তাই সহজ রাস্তার বদলে টেকসই পথ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি। তখন বাজারের ধোঁয়া কেটে গিয়ে টাকার তাপে রান্নাঘরে ফেরে সোনালি ভাতের গন্ধ; দাহ নয়, স্থিতি।

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×